আরব আমিরাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনিশ্চয়তা

সাইফুল ইসলাম তালুকদার | সোমবার , ২৫ মে, ২০২৬ at ৯:২২ পূর্বাহ্ণ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটুকোম্পানি ভিসা ট্রান্সফার প্রায় বন্ধ থাকায় অসংখ্য শ্রমিক বৈধতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। অনেকে ভিসা নবায়ন করতে না পেরে জরিমানার আতঙ্কে আছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে দেশে ফিরে যাচ্ছেন। এটি শুধু একজন শ্রমিকের সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, তাদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিভিন্ন সময়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, কূটনৈতিক আলোচনা ও আশ্বাস মিললেও বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। প্রবাসীদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পরপরই সফর ও বৈঠকের খবর শোনা গেলেও সাধারণ শ্রমিকদের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। ফলে প্রবাসীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।

একসময় ভিজিট ভিসার মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশি আরব আমিরাতে এসে নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কাজের সুযোগ তৈরি করতেন। তারা কঠোর পরিশ্রম করে নির্মাণ, পরিবহন, সেবা, ব্যবসা ও বিভিন্ন পেশাগত খাতে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এখন সেই পথ প্রায় বন্ধ। নতুন শ্রমিকরা সহজে আসতে পারছেন না, আবার বর্তমানে কর্মরতরাও কোম্পানি পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে একজন দক্ষ কর্মী ভালো বেতন, নিরাপদ পরিবেশ বা উন্নত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেখানে যেতে পারছেন না।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো ভিসা ট্রান্সফার ও নবায়ন জটিলতা। কোনো শ্রমিক চাকরি হারালে বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে বৈধভাবে নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারছেন না। এতে তারা অবৈধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। একজন শ্রমিক অবৈধ হয়ে গেলে শুধু তার কর্মজীবন নয়, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। অনেকে বছরের পর বছর কষ্ট করে গড়ে তোলা জীবনের স্থিতি হারিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন।

এই সংকটের প্রভাব শুধু প্রবাসীদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে আরব আমিরাত থেকে আসা বিপুল রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। দেশের লাখো পরিবার প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামের বাড়িতে বাবামায়ের চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের ব্যয়সবকিছুই এই আয়ের মাধ্যমে চলে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়ও প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অথচ তারাই আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

আরব আমিরাতে অবস্থানরত প্রবাসী ব্যবসায়ীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নতুন শ্রমিক না আসা এবং ট্রান্সফার জটিলতার কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাজারে বাংলাদেশিদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং অন্য দেশের শ্রমিকরা সুযোগ গ্রহণ করছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে বিশাল এই শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই বাস্তবতায় সরকারের আরও কার্যকর ও দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে ভিসা নবায়ন ও কোম্পানিটুকোম্পানি ট্রান্সফারের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ভিসা চালুর আগে বর্তমানে অবস্থানরত শ্রমিকদের বৈধতা রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

প্রবাসীরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তারা শুধু চান রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াক, তাদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শুনুক এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের উদ্যোগ নিক। কারণ প্রবাসীরা দেশের বোঝা নন, তারা দেশের সম্পদ। তাদের শ্রম, ত্যাগ ও অর্জিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। তাই তাদের নিরাপত্তা, বৈধতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ।

লেখক : সভাপতি, প্রবাসী সাংবাদিক সমিতি (প্রসাস),সংযুক্ত আরব আমিরাত

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুশিক্ষার দর্পণ পরিবার ও সমাজ
পরবর্তী নিবন্ধশিখন ঘাটতির ভার নিয়ে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে শিক্ষার্থীরা!