সামপ্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগে আমার নিজের এলাকায়ও একই দিন ২ তরুণ আত্মহত্যা করে। যা গোটা ইউনিয়ন তথা পুরো এলাকা জুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক নানা অসন্তোষ এর কারণে আত্মহত্যা বাড়ছে। বিশেষ করে তথাকথিত প্রেমঘটিত বিষয়ই এই আত্মহত্যার মূলে! তাছাড়া, পরিবারে কারো সাথে মনোমালিন্য, অপমান, অপবাদ –এসব কারণেও আত্মহননের পথ বেছে নেয় মানুষ। এখন তো মা, বাবা কিছু বললেই বা শাসন করলে ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যার মতো গর্হিত কাজ করতে দ্বিধা করছে না। কেন এমন হচ্ছে তা ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১৩,০০০ থেকে ২০,০০০ মানুষ আত্মহত্যা করে, যার অর্থ হলো প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৫৬ জন প্রাণ হারান। স্থানীয় জরিপ ও পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী, জেলাওয়ারি আত্মহত্যার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যশোর, ঢাকা এবং কুমিল্লায়। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ও তরুণদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। পৃথিবীতে মৃত্যুর চতুর্থ কারণ আত্মহত্যা। আত্মহত্যার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অভিমান। যা বিভিন্ন সময়ে খবরে উঠে এসেছে। আবার যৌন নির্যাতনের কথা কাউকে বলতে না পারার লজ্জায় আত্মহত্যার ঘটনাও কম নয়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে; যা রীতিমতো ভয়াবহ। আর স্কুলকলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে মাদরাসা পড়ুয়াদের ভেতর এ হার অনেক কম। কারণ ইসলামী জীবনাচার। শুধু তাই নয়, আমাদের প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের মধ্যে যেসব পরিবারে ধর্মীয় রীতি মেনে চলার নিয়ম রয়েছে তাদের ভেতরেও আত্মহত্যার প্রবণতা কম। অর্থাৎ ধর্মীয় অনুশাসন আত্মহননের চিন্তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যৌথপরিবারে এ প্রবণতা একক ছোট পরিবারের তুলনায় অনেকাংশে কম। অপরদিকে, যে সব পরিবারে ধর্মীয় আচার–আচরণের রীতি চালু আছে, সে সব পরিবারেও এ প্রবণতা কম দেখা যায়। বস্তুত আত্মহত্যা একটি বিধ্বংসী প্রবণতা– যা একটি পরিবার ও সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পরিবারগুলো তাদের সন্তান–সন্ততি, উঠতি বয়সী স্কুলপড়ুয়াদের মানসিক চিন্তা, চেতনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার। প্রয়োজন তাদের সময় দেয়া, মান–অভিমান সম্পর্কে সজাগ সতর্ক থাকা। তাদের চাহিদা, বয়োসন্ধিক্ষণের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার বাড়ানো এবং বাস্তবতার নিরিখে সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। আত্মহনন কোন সমাধান নয় বরং পরিবার ও সমাজে তা আশঙ্কা জাগায়। অন্য পরিবার কিংবা সমাজে এটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়ায়। মানুষের মাঝে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা সুদৃঢ় হলে আত্মহত্যার মতো নিন্দনীয় কাজ কখনো সংঘটিত হওয়ার কথা নয়। আত্মহত্যার ব্যাপারে ইসলামে কঠোর শাস্তির কথা বলা আছে। আত্মহত্যা কবীরা গুনাহ। এই মহাপাপের ভাবনা থেকে মুমিনকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। যে ব্যক্তি যেভাবে আত্মহত্যা করবে জাহান্নামে সে সেই পদ্ধতিতেই শাস্তি ভোগ করবে। সেজন্য আত্মহত্যার প্রবণতা কিংবা আত্মহননের পথ থেকে যুব সমাজ তথা মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনোভাবেই যেন তাদেরকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে না হয় সেজন্য প্রয়োজনে কাউন্সেলিং করতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে আবার নিজের জীবনকে নিজেই শেষ করে দেওয়া মনুষ্যত্বের ব্যর্থতারই নামান্তর। যে কোন সমস্যাকে ধৈর্য ও চিন্তার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সেটা কোনভাবেই আত্মহত্যার মাধ্যমে নয়। তাই আমাদের সবাইকে এই আত্মহত্যা, আত্মহননের মতো কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য কোন উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে।











