“আজু মাইয়ের পৈতানের সুখ” উপন্যাসের কাহিনীতে দুটি সময় পাশাপাশি চলে। বর্তমান এবং একাত্তর। এই দুই সময়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মূল চরিত্র আজু মাই। কিন্তু আজু মাই কে?
বর্তমানে আজু মাই শিশুদের কাছে ভীতিকর এক নাম। বাচ্চারা তার পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। তাকে ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানা গুজব। আজু মাই নাকি ভূত–প্রেত পোষে, অশরীরী আত্মাদের খাবার জোগায়। এমনকি কচি কচি ছেলেমেয়েদের ধরে এনে তাদের খাওয়ায় বলেও লোকমুখে শোনা যায়। এসব কথাকে আরও ভয়ংকর আর বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে তার সাদা সাদা চুল, দুমড়ে যাওয়া শরীর আর মুখে বার্ধক্যের গভীর ছাপ।
তার ওপর বাচ্চাদের দেখলেই ডাকে–
“শুন শুন ফুল বাবু, মলা খাবু, নজেন্স খাবু? তোক মজা দিম এ্যালা, আয় শুন ক্যানে, শুন শুন….ও…. ফুল বাবু”
কিন্তু যারা যুদ্ধের আগের আজুকে দেখেছে, তারা জানে আজু জুলফিকার আর উজালার আদরের সন্তান। পরপর তিনবার মৃত সন্তান জন্ম দেয়ার পর বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে ঘর আলো করে জুলফিকার–উজালার ঘরে জন্মেছিল সে।
আজুর জীবনে বাবা–মায়ের পর সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল ঘোষাল পরিবার। জুলফিকারের হিন্দু বন্ধু যতীনের বাবা নন্দ ঘোষাল ছিলেন আজুর “বুড়্যা দাদা”, আর যতীনের ছেলে অতীন ছিল তার ভাইয়ের মতো।
বর্তমান অংশে দেখা যায়, এই অতীনই তার দোকান থেকে খাবার দিয়ে আজুকে কোনোভাবে বাঁচিয়ে রাখে। অতীন থাকে তার স্ত্রী নির্মলার সাথে।
এরপর আসে সেই ভাঙন যখন আজু মাইয়ের জীবন এলোমেলো হয়ে গেল।
সারাদেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বুজরক বাগবাগ গ্রামও আক্রান্ত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজাকার আজমসহ আরও কয়েকজন। আজু তাদের হাত থেকে রক্ষা পায় না। সে নির্যাতিত হয় ক্যাম্পে। ফিরে এসে দেখে কিছুই নেই। না পরিবার, না আগের জীবন। অতীনের পরিবারও ধ্বংস হয়ে যায়, অতীন নিজেও নির্যাতনের শিকার হয়।
এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই আজু মাইয়ের ভেতরে জন্ম নেয় এক নীরব প্রতিরোধ আর তা থেকে বুজরক বাগবাগের মাটিকে রক্ষার এক কঠিন মানসিকতা।
স্বাধীনতার পর যখন রাজাকারদের ফেরার কথা নয়, তখন তারা আবারও সমাজে ফিরে আসে। মানুষ যেন যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলে তাদের মেনে নেয়। কিন্তু আজু মাই ভুলে না।
সে শয্যাশায়ী রাজাকার আজমকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয়। রাজাকার আজমের ছেলে শাহেনশাহকে দেখলেই ছড়া কেটে বলে–
‘‘আজাকারের ব্যাটা,
আল্লাহ খোদার নাম নাই,
মইল্লে খাবু ঝাঁটা।’’
পুরো উপন্যাসজুড়ে বীরাঙ্গনা আজু মাইকে লেখিকা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করেছেন। আমার ব্যক্তিগত মত, বেঁচে থাকতে হলে আজু মাইয়ের মতো করেই বাঁচতে হবে। কাউকে পরোয়া না করে, শত্রুকে চোখের সামনে রেখে।
আজু মাই দা হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, একজন নারীকে বাঁচায় রাজাকার শাবক শাহেনশাহর হাত থেকে, আর যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে সেন্টু রাজাকারকে কুপিয়ে ঘোষালদের বাড়ি পুনরুদ্ধার করে।
যুদ্ধের গল্প সবসময়ই বেদনার, কিন্তু এই কাহিনীটা ভিন্ন এক অনুভূতি দেয়। আজু মাইয়ের জন্য কষ্ট হয়, অতীনের জন্য কষ্ট হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জন্য কষ্ট হয় তবুও শেষ পর্যন্ত এক ধরনের গর্ব থেকে যায় এই ভেবে যে আজু মাই হারেনি; বরং বাবা জুলফিকারের শেখানো মাটির প্রতি ভালোবাসা আঁকড়ে সে যুদ্ধের ৪৮ বছর পরেও বেঁচে আছে এ দেশের মাটি রক্ষা করতে।
লেখার ভাষা সবসময়ের মতো চমৎকার। লেখিকা সাদিয়া সুলতানা এই লেখায় এত মেটাফোর ব্যবহার করেছেন যে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এছাড়াও ভাষাগত মাধুর্য এমন যে বর্বর একটা ঘটনাও যখন পড়া হয় সেটা বর্ণনানুযায়ী চিন্তা করলেও অস্বস্তি হয়। যেমন খুবই নিষ্ঠুর একটা ঘটনা যেখানে ফাতিমা নামের একজন সদ্য মা, যাকে ধর্ষণ করে তার ছেলে আবুকে ফুটন্ত ভাতের মাড়ে আছড়ে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। লেখিকার বর্ননা এরকম–
‘‘ফ্যানে ডুবে ছাল–চামড়া উঠে যাওয়া আবু আর মায়ের স্তনে ঠোঁট রাখতে পারেনি। অথচ সেনারা চলে যাওয়ার পরে ফাতিমার স্তনজোড়া থেকে দুধের বন্যা নেমেছে। সিঁদুররাঙা স্তনমুখ থেকে দুধের স্রোত গড়িয়েছে গলগল করে। নিঃসাড় ফাতিমা পড়ে ছিল মেঝেতে, দুধের সাদা–লাল ঢেউ ওর নাভিমূল বেয়ে মাটিতে নেমেছে। বাদামি মাটিতে সাদা মানচিত্র তৈরি হতে হতে সব তরল দুঃখের মতো ভূতলে মিলিয়ে গেছে।
সেই ফাতেমা কাপড় তোলেনি শরীরে।”
আহা! কত সহজেই না এই ৭১ ভুলে গেছে মানুষ! আহা!








