টানা ৩০ ঘণ্টার অবরুদ্ধ দশা এবং চুয়েট ক্যাম্পাসে উত্তেজনার পর উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে উদ্ধার করেছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম চুয়েটে পৌঁছান এবং উত্তেজনার মুখে তাকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বের করে আনেন। পরে চুয়েটে আর কখনো না ফেরার শর্ত ও দাবির মুখে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে স্থানান্তরিত করা হয় অসুস্থ উপাচার্যকে। এদিন রাত ৮টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চুয়েটে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা জানান, সাবেক উপাচার্য ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে তাদের ২২ দিন ধরে চলা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে উপেক্ষা করে গত ১২ অক্টোবর গোপনে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টার মধ্যে তাকে ভবন ত্যাগের আলটিমেটাম দিলেও তিনি তা শোনেননি।
বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, উপাচার্য অবস্থান নেওয়ার পরপর চুয়েটের বাস ও শিক্ষার্থীদের ওপর দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটে, যার পেছনে উপাচার্যের ইন্ধন রয়েছে বলে তাদের দাবি। তারা এসব হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদমাধ্যমে পানি ও গ্যাসের সংযোগ বন্ধের খবর অস্বীকার করে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা জানান, কেবল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। অবরুদ্ধদের নিয়মিত খাবার, পানি ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। চুয়েট মেডিকেল ও এভারকেয়ার হাসপাতালের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হয়।
দিনভর উপাচার্যের শারীরিক অবস্থা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়েও একাধিক নাটকীয়তা চলে। গতকাল দুপুরে চুয়েট চিকিৎসাকেন্দ্র এবং রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা ভবনের ভেতরে গিয়ে দুই দফায় উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এতে রক্তচাপের তারতম্য ও শারীরিক অসুস্থতার চিত্র উঠে আসে।
এর আগে সকালে দরজার অন্তরাল থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে উপাচার্য জানান, তিনি অসুস্থ বোধ করছেন এবং প্রশাসনের সহায়তায় একটি সুন্দর সমাধান প্রত্যাশা করছেন। এভাবে দিনভর অচলাবস্থা চলার পর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক চুয়েট ক্যাম্পাসে পৌঁছান এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে উপাচার্য কার্যালয়ের তালা খোলা হলে শিক্ষার্থীরা মাইকে স্পষ্ট ঘোষণা দেন, পুনরায় চুয়েট ক্যাম্পাসে না ফেরার অঙ্গীকার ও দাবির ভিত্তিতেই কেবল তাকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপাচার্যের নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসাকে প্রাধান্য দিয়ে ডিসি ও এসপির সরাসরি নজরদারিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে উপাচার্যকে অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
উদ্ধার অভিযান শেষে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় উপাচার্য শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাই দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে যৌথ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, একজন প্রবীণ শিক্ষকের আকুল আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের দাবিসমূহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছানো হবে।
এদিকে চুয়েটের ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে গতকাল ঢাকার শাহবাগ মোড়ে চুয়েটের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
উল্লেখ্য, ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই অপসারণকে অন্যায্য আখ্যা দিয়ে এবং অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্নিয়োগের এক দফা দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা কমপ্লিট শাটডাউন এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা–কর্মচারীরা সর্বাত্মক অসহযোগ ও কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে।












