অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া : অ্যান কারসনের সাথে কথোপকথন

| শুক্রবার , ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

দু’হাজার তেইশের অক্টোবরে, লেখক কেট ডোয়ার সদ্য নোবেলজয়ী কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক অ্যান কারসনের সাথে এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় বসেছিলেন। আলাপচারিতার মূল সূত্রপাত ছিল, কারসনের প্রকাশিতব্য কাব্য সংকলন Wrong Norma–কে ঘিরে (২০২৪–এ প্রকাশিত)। কিন্তু সেই আলাপচারিতা খুব দ্রুতই প্রাসঙ্গিক সূত্র ছাড়িয়ে নানান বিষয়ে আলোকপাত করে, এবং পাঠক হিসাবে আমরা অ্যান কারসনের স্বরূপও বুঝতে শুরু করি। এই আলাপচারিতা শুরুর আগে কারসন ডোয়ারকে বলেছিলেন, “আমার আসলে তেমন কিছু বলার নেই।” অথচ, ঘণ্টাখানেক স্থায়ী সেই কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আমরা আলোচনার অনেক বিষয়ই খুঁজে পাব। আলাপচারিতাটি দ্য প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত হয় ১৭ এপ্রিল ২০২৪।

অনুবাদ করেছেন মাহমুদ আলম সৈকত

কেট ডোয়ার: আপনার কাব্য সংকলন Wrong Norma–র শিরোনামে যে ভুল বা ত্রুটির কথা বলা হয়েছে, সে–বিষয়ে কিছু বলুন।

অ্যান কারসন: আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, “কানাডিয়ানরা আমেরিকানদের চেয়ে কীভাবে আলাদা?” আমি বলি, “কানাডিয়ানদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে: তারা বিনয়ী, কিন্তু ভুলভাল।” সবসময়ই, তারা একদিকে যেমন বিনয়ী, তেমনি বেজায় ত্রুটিযুক্ত। শিরোনামে ‘ভুল’ শব্দটি রেখেছি ওই কানাডিয়ান স্বভাবের কারণেই। তাছাড়া, অ্যাকাডেমিক জীবনে সবসময়ই আমাদের একটা অনুভূতি কাজ করে যে, আপনি ভুল করছেন বা ভুল করার দ্বারপ্রান্তে আছেন, আর এটা নিয়ে আপনাকে দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয়, কারণ চারপাশের সবকিছুই খুব বিচারপ্রবণ বা সমালোচনামূলক এবং অনুক্রমিক। মোটামোটি শক্তপোক্ত সম্মান পাওয়াটা নির্ভর করে, কথা বলার সময় প্রতিবারই যেন আপনার বক্তব্য ‘ভুল’ না হয়, সেটার ওপর। তাই এই মানসিকতাটাকে আমি ভেঙে দিতে চেয়েছি।

সিমন ওয়েল তাঁর একটি প্রবন্ধে ‘স্ববিরোধিতা’ প্রসঙ্গে বলার সময় এরকমই কিছু বলেছিলেন; কারণ দার্শনিক পাঠগুলোর বিরোধাভাস মানুষকে খুব বিভ্রান্ত করে তোলে, আর সিমন এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতেই অভ্যস্ত। তিনি বলেন, এটি দারুণ এক মানসিক প্রক্রিয়া, কারণ এটি মনকে শিথিল করে দেয়। আর মন একবার শিথিল হয়ে গেলে, আপনি অন্যান্য বিষয় নিয়ে বা আরও ব্যাপক কোনো বিষয় কিংবা আগেকার কোনও একটি ভাবনায় যে ডুবে ছিলেন, তারও গভীরে থাকা কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে পারেন। হঠাৎ করেই যেন এক ভিন্ন দৃশ্যপট আপনার চোখের সামনে হাজির হয়। আর আমার মনে হয়, ‘ভুল’ হওয়া বিষয়টিই সেই শিথিলতাকে সম্ভব করে তোলে। হতেই পারে, আমি আজ ‘ভুল’ হওয়া প্রসঙ্গে যে কথাটা বলছি, আগামীকাল হয়তো এ–প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু বলতে পারি। মানুষ তো আসলে এক একটি প্রিজম বা আলোক–বিশ্লেষক যন্ত্রের মতো; ফলে প্রতি দিন ধারণাগুলো এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠে।

কেট ডোয়ার: Eros the Bittersweet পড়ার সময়, ‘বন্ধু এবং প্রেমিক– প্রেমিকারা নাকি একই স্বরে কথা বলে’, এরকম একটা প্রবাদের কথা মাথায় ঘুরত। জানি না এটা কতটা সত্য, আমার মনে হয় প্রত্যেকেই আসলে নিজস্ব স্বরে কথা বলে এবং যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত এক ধরনের অনুবাদ–প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

কারসন: সত্যি বলতে, আমার মনে হয় না কেউ কখনও নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে যে, সামনের জন কথা বলার সময় ঠিক কী বোঝাতে চাইছে। এটা শুধু অনুবাদই নয় বরং তারও অধিক কিছু; অনেকটা নিজেকে অন্ধকারে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো। ভাষা অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও একান্ত নিজস্ব একটি বিষয়। খুবই উইয়ার্ড কিছু। আপনি চাইলে এটাকে অনুবাদ হিসেবে ভাবতে পারেন, তবে সেটা হয়তো এক ধরনের কোমল বা মার্জিত রূপক মাত্র। বাস্তবতা সম্ভবত এর চেয়ে অনেকবেশি হতাশাজনক। কিন্তু মানুষ হিসেবে কথা বলার যে চেষ্টা, সেটি আসলে প্রতিটি বাক্যের মাধ্যমে সেই হতাশা কাটিয়ে ওঠারই এক নিরন্তর চেষ্টা।

কেট ডোয়ার: বিষয়টি অনেকটা এরকম, ধরা যাক একটি ভাষায় কোনো ভাব যেভাবে প্রকাশিত হয়, তা হয়তো অন্য ভাষায় হুবহু অনুবাদ করা সম্ভব নয়। মূল রচনা এবং অনুবাদের মধ্যবর্তী যে পরিসর, একজন অনুবাদক ঠিক সেই জায়গাটিতে অবস্থান করেন, সেখানে আসলে কী ঘটে?

কারসন: আমি বিষয়টিকে একটা খাদের মতো মনে করি, সমান্তরাল দুটি রাস্তা বা দুটি দেশের মাঝখানে থাকা কোনো খাদ। একজন অনুবাদক অনুবাদ করার সময় এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছান, যখন তাঁর মগজের সূক্ষ্ম ঝিল্লিতে একই সঙ্গে দুটি ভাষা ভেসে বেড়াচ্ছে, তখনকার সেই পরিস্থিতিটি আমার কাছে সবসময়ই আকর্ষণীয় মনে হয়। তাঁরা এমন কিছু বলেন যা ঠিক হুবহু সমতুল্য নয় বটে, অথচ দুটি ভাষাই সেখানে মূর্ত থাকে। কোনো কোনো লেখক, এমিলি ডিকিনসন এক্ষেত্রে অনন্য উদাহরণ, তাঁদের স্বীয় ভাষাভঙ্গীর ভেতরেই সেই খাদ বা ব্যবধানটিকে কাজে লাগান। অর্থাৎ, তিনি অন্য কোনো ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন না; তিনি আসলে নিজেকেই অনুবাদ করছেন। তিনি হয়তো কিছু পঙ্‌ক্তি বা শব্দ লেখেন, তারপর সেগুলো কেটে অন্য কোনো শব্দ বসান; কিংবা পাশে তৃতীয় কোনো শব্দ লেখেন, অথবা কাগজটি উল্টে পুরো বিষয়টিরই ভিন্ন একটি সংস্করণ তৈরি করেন। আর এসব মিলিয়েই কবিতাটি গড়ে ওঠে। এরকম ভাসমান, অগোছালো, অমীমাংসিত সামগ্রিক রূপটি নিয়েই সেই কবিতার গড়ে ওঠা। মানসিক অবস্থার দিক থেকে এটি সত্যিই এক অদ্ভুত ব্যাপার।

অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে ধরা দেয়; কারণ আপনার সামনে একটি মূল পাঠ্য থাকে, যাতে হয়তো কিছু স্পষ্ট ভুলও থাকতে পারে। আবার পৃষ্ঠার নিচে হয়তো পাঠান্তরের উল্লেখও থাকে অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য গবেষকরা মূল পাঠ্যের কোনো অংশকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করে সেটিকে আরও নির্ভুল বা অর্থবহ করার জন্য যেসব বিকল্প প্রস্তাব করেছেন, সে–সব। ফলে একই বিষয়কে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন সব সম্ভাবনা আপনার মনে ঘুরে বেড়াতে থাকে। আর এসব কিছুই যেন একসাথে মিলেমিশে সেই কবিতাটিকে গড়ে তোলে। এই বিষয়টিকে ঠিক কীভাবে সামলাব, সেটা আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি। গ্রিক ভাষায় যেমন মূল কবিতা এবং তার নিচে ইংরেজিতে বিভিন্ন পাঠান্তর দেওয়া থাকে, সব মিলিয়ে সেই বিষয়টি বেশ চমৎকার; বিশেষ করে মূল রচয়িতা আসলে কী বলেছিলেন, তা নিয়ে নানা সম্ভাবনার এমন সহাবস্থান এক অনন্য অনুভূতি জাগায়।

বইয়ের পাতায় বা যাকে সচরাচর ‘অমুক বিষয়ের অনুবাদ’ বলা হয়, তার মাধ্যমে সেই সৌন্দর্যের কথা অধিকাংশ সময়ই ঠিকঠাক প্রকাশ করা যায় না। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিন্যাস বা কাঠামো নেই। কম্পিউটারে হয়তো লিঙ্ক বা পার্শ্ব–পাঠ্য ব্যবহার করে কিছুটা করা সম্ভব; কিন্তু বাস্তবে কেউ ওই সব লিঙ্ক ঘেঁটে দেখতে আগ্রহী হয় না, আর পড়ার অভিজ্ঞতাটাও সবার ঠিক একরকম হয় না। একজন গবেষক বা পণ্ডিত যখন মূল ভাষা ও পাঠান্তরসহ পৃষ্ঠাটির দিকে তাকান এবং সবকিছু মনের মধ্যে ভেসে ওঠে, তখন তা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে হয়, এর সূক্ষ্মতর দিকগুলো ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

কেট ডোয়ার: একেবারে শূন্য থেকে নতুন কিছু সৃষ্টির বিষয়টি কেমন? সেই অভিজ্ঞতাও কি একইভাবে স্থানিক বা পরিসর–নির্ভর?

কারসন: আমি বিষয়টিকে দেখি, কোনো কিছু হঠাৎ করে মনে এল, সেই ভাবনাটি যদি আকর্ষণীয় মনে হয়, তবেই তা নিয়ে কাজ শুরু করলাম, এভাবে। অনেকটা কোনো কিছুর পিছু ধাওয়া করার মতো; যেমন ধরুন, আপনার বাড়ির আঙিনা দিয়ে একটি শিয়াল দৌড়ে গেল আর আপনি ঠিক করলেন তার পিছু নেবেন। আপনি হয়তো দেখতে চাইবেন শিয়ালটি কোথায় গিয়ে পৌঁছায় বা তার আস্তানা কোথায়। বিষয়টি শুধুই কোনো পথের বা চিহ্নের অনুসরণ করার মতো।

কেট ডোয়ার: Wrong Norma–র গুঢ় বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে সেই শিয়াল। লেখার সময় কি তার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ বা অনুভূতি আপনার মনে ছিল, নাকি তা প্রতিদিন বদলে যেত?

কারসন: আমি তখন র‌্যাগনার কিয়ারটানসন (Ragnar Kjartansson & The All Star Band)-এর ‘দ্য ভিজিটরস’ লং প্লে’র জন্য ‘লাইনার নোটস’ বা পরিচিতিমূলক লেখা তৈরি করছিলাম এবং একই সঙ্গে ছবিও আঁকছিলাম। ছবি আঁকার সময় একটা শিয়াল সেখানে হাজির হলো, সুন্দর দেখতে এক শিয়াল। আমার মনে হলো, শিয়ালটাকে কোথাও একটা জায়গা দিতেই হবে, তাই আমি ‘ভিজিটরস’ লেখাটিতে তাকে জুড়ে নিলাম। ওই শিয়ালটি কোথা থেকে এসেছিল, সেটা আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নি। শিয়ালটা হুট করেই নিজে থেকে চলে এসেছিল; আর মনে হলো, তাকে নিয়ে কিছু একটা করা দরকার।

কেট ডোয়ার: আপনার ক্ষেত্রে, সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর উপায় কী?

কারসন: কখনও কখনও আমি যা লিখি, তা আসলে কেবল আলোর গতি–প্রকৃতি নিয়েই লেখা। মনে হয়, আলো আর আমার মধ্যে যেন আগে থেকেই একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে আছে। এই নোটবুকে (যা হয়তো কখনোই কেউ পড়বে না) লিখে রাখতে হবে আজকের আলোটা ঠিক কেমন, আর তার জন্য বেছে নিতে হবে একদম সঠিক শব্দগুলো। সেই চুক্তির স্বরূপ কী, তা আমি জানি না। তবে মনে হয়, আমার অন্য সব লেখার মূলে ওই বিষয়টিই কাজ করে। আলোর প্রসঙ্গ শেষ হলে আমরা হয়তো আমার মা, রাতের খাবার কিংবা প্রুস্তের অনুবাদ–তত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে পারি। কিন্তু মূল বিষয়টি তখন পেরিয়ে গেছে; আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ওই আলোটাই। কেন এমনটা হয়, বা সেই চুক্তির উৎস কী, সেটা আমার কাছে আজও এক রহস্য।

কেট ডোয়ার: ‘স্নো’ লেখাটিতে আপনি এক পূর্বানুমানের বা অনুভূতির কথা বলেছেন, যার কেন্দ্রে ছিল হোটেলের এক নাইট ক্লার্ক। ঘটনাটি ঘটেছিল আপনার মায়ের মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে। আপনি তখন ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এমন অভিজ্ঞতা কি আপনার সঙ্গে প্রায়ই ঘটে?

কারসন: একবারই হয়েছিল। গ্রিক পুরাণে দেবতা হার্মিসকে বলা হয় ‘সাইকোপম্প’; এর অর্থ হলো, কেউ যখন মৃত্যুর মুখে থাকে, তখন তিনি তার কাছে যান এবং তার আত্মাকে পাতালপুরীতে নিয়ে যান। তাই হোটেলের সেই বেলবয়কে আমি একরকম ওই চরিত্রের সাথেই মিলিয়ে ফেলেছিলাম। তবে কারি (রবার্ট কারি, কারসনের বর) আর আমি যখন তার বাবার শেষকৃত্যে যাচ্ছিলাম, তখন মিশিগানের এক জনমানবহীন এলাকায় আমরা এক পথচারীকে গাড়িতে তুলে নিয়েছিলাম। সে কোথা থেকে এল, কে জানে! চারপাশে শুধু ফাঁকা প্রান্তর, আর তার মাঝেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে এক লোক, পরনে ঝকঝকে পরিষ্কার নীল স্যুট। তার স্যুট এবং শার্ট, দুটোই ছিল নীল রঙের। দেখে মনে হচ্ছিল যেন ইস্ত্রি করা পরিপাটি; গাড়িতে ওঠার সাথে সাথেই গাড়ির ভেতরটা লন্ড্রির সুবাসে ভরে উঠল, লোকটা এতটাই পরিচ্ছন্ন ছিল। আমরা তার সাথে টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সে কোনো কথা বলতে নারাজ। ওই রাস্তা ধরে আরও তিনটি শহর পেরিয়ে এক পাবলিক লাইব্রেরিতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে রাজি হয়নি। এরপর আমরা তাকে সেই লাইব্রেরির সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে নিজেদের পথে এগিয়ে গেলাম। লোকটা ছিল আসলে এক ‘সাইকোপম্প’ কারণ তখনো আমরা জানতাম না যে কারির বাবা মারা গেছেন। কিংবা বলা ভালো, তিনি তখনো মারা যাননি; ঠিক সেই দিনই তিনি মারা গিয়েছিলেন। আমরা ধরে নিলাম, লোকটা ছিল এমন এক সংকেতের মতো যা জানান দেয় যে কেউ পরলোকে পাড়ি জমাচ্ছে। অর্থাৎ, এমনটা সত্যিই ঘটে। তবে সচরাচর ঘটে, তা বলব না।

কেট ডোয়ার: দীর্ঘ সময় ধরে আপনি ও কারি মিলে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ‘আর্টিস্টিক কোলাবরেশন’ বিষয়ক একটি ক্লাস নিতেন, যার নাম ছিল ‘দ্য ইগো সার্কাস’। শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপনারা কী ধরনের অনুশীলন বা কাজ করাতেন?

কারসন: ‘একটা কিছু পোড়াও, তারপর সেই ছাই ব্যবহার করো’, এটি ছিল কাজের একটি নির্দেশ বা ‘প্রম্পট’। ‘কোনো সরাইখানাকে নতুন রূপ দাও’, এটি আরেকটি প্রম্পট। মাঝেমধ্যে আমরা তাদের কেবল তিনটি শব্দ দিতাম, যেমন নৌ–ভ্রমণ, মাখন, মৃত্যু। এরপর তারা সেসব নিয়ে নানা কিছু তৈরি করত। এমন নয় যে আমরা তাদের জন্য লেখালেখিটাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছিলাম, তবে তারা সবসময়ই লেখার বিষয়টি নিয়ে আসত। অবশ্য আমরা তাদের অন্যান্য দক্ষতা কাজে লাগাতে উৎসাহিত করতাম। এবং তারা প্রায়শই এমন সব দক্ষতার সন্ধান পেত যে, তারা এটি করতে সক্ষম সেটা আগে জানতই না।

কেট ডোয়ার: লেখালেখি ছাড়া অন্য কোনো দক্ষতা কি আপনার লিখন প্রক্রিয়ার অংশ?

কারসন: আঁকাবুকি ও চিত্রকর্ম। সাঁতারের কথাও বলব। গুছিয়ে রাখা, আমি বেশ ভালো গুছিয়ে রাখতে পারি।

কেট ডোয়ার: লেখালেখিতে সাঁতার কীভাবে ভূমিকা রাখে?

কারসন: এটি আমাকে বিষন্ন–খিটখিটে মেজাজ থেকে দূরে রাখে। মাঝেমধ্যে আমি সুইমিং পুলে থাকা অবস্থায় চিন্তাভাবনা করি। অবশ্য সেটা খুব একটা ভালো বুদ্ধি নয় যদিও। পুলে থাকাকালীন মাথায় আসা ভাবনাগুলো অনেকটা স্বপ্নের মতো। হয়তো এমন কোনো বাক্য মাথায় এল যা বাস্তবতা বিষয়ক আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে; আপনি ঝিমুনি–ভাব নিয়ে উঠে সেটা লিখে রাখলেন, পরদিন সকালে উঠে দেখলেন লেখাটা মূলত ‘চলুন কলা কেনা যাক’ বা এমন কোনো সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক কথা। তাছাড়া, আমি জল ভালোবাসি। কিছু মানুষের জলের কাছাকাছি থাকাটা প্রয়োজন।

কেট ডোয়ার: আপনি এবং কারি দুজনেই জন কেজের ভক্ত; জন কেজ শিল্পকলা থেকে ‘অহং’ বা ‘আমিত্ব–বোধ’ মুছে ফেলার কথা বলেন। আপনার দু’হাজার ষোল সালের সংকলন ‘ফ্লোট’–এর শুরুতে জন কেজের যে উদ্ধৃতিটি রেখেছেন, ‘প্রতিটি অস্তিত্বই সেই শূন্যতার উদযাপন, যা তাকে ধারণ করে রাখে’–কথাটা আমাকে এখনও ভাবাচ্ছে।

কারসন: লেখকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ প্রাসঙ্গিক। কারণ তাঁদের মধ্যে স্মৃতি ও পছন্দ বা ভাল লাগা না লাগার এক বিশাল ভাণ্ডার জমে থাকে, যাকে তাঁরা নিজেদের আত্মজীবনী বলেন এবং লেখার সময় তাঁরা অবিরাম সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি বা পুনর্ব্যবহার করতে থাকেন। এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসাটা জরুরি।

কেট ডোয়ার: লেখালেখির জগতে, বিশেষ করে মাস্টার অফ ফাইন আর্টস কার্যক্রম ঘিরে, চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি বা আখ্যানের গঠনশৈলীর মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়। লেখার কারিগরি দিক বা ক্রাফটের বিষয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

কারসন: কখনোই না। আমি ওসব নিয়ে ভাবিই না। আমার মনে হয় মানুষের উচিত এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করা। বরং এমন কোনো একটি বিষয় নিয়ে ভাবা এবং সেটিকে অনুসরণ করে বিষয়টির এমন এক স্তরে পৌঁছানো যেখানে তা সত্য এবং মূর্ত হয়ে ওঠে।

কেট ডোয়ার: আমার আশঙ্কা হয়, শুধু আমেরিকার কথাই যদি বলি, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। একজন চিন্তাবিদ বা শিক্ষক হিসেবে আপনি কি বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন?

কারসন: ঠিক এই বিষয়টিই আমাকে ‘দ্বিধা’ বা ‘দ্বিধাগ্রস্ততা’ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শিক্ষকতা জীবনের শেষ কয়েক বছরে আমি কিছুটা সময় প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখাতাম আর বাকি সময়টা লেখালেখি করতাম। আমি যখন ছাত্র ছিলাম, তখন প্রাচীন গ্রিক শেখার পদ্ধতিটা ছিল এরকম– মূল পাঠ্য বা টেক্সটটি দেখে অজানা শব্দগুলো খুঁজে বের করা এবং অভিধানে সেগুলোর অর্থ খুঁজে দেখা। এরপর অর্থটা বুঝে নিয়ে তা লিখে রাখা। অভিধানে শব্দ খোঁজার প্রক্রিয়াটিতে বেশ সময় লাগে। আর এই সময়ের মধ্যে এক ধরণের ধ্যানমগ্নতা বা চিন্তার স্থবিরতা কাজ করে; একে ঠিক ‘চিন্তাহীনতা’ বলা যায় না, কারণ মনে একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হতে থাকে এবং সঠিক সংজ্ঞার খোঁজে পৃষ্ঠা ওল্টানোর সময় সেই প্রশ্নের রেশটুকু বজায় থাকে, অথচ তখনও আপনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বা ভাবনায় পৌঁছাতে পারেননি। দিনের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সময় ও মানসিক অবস্থা। এটি অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ ওই বিরতি বা মধ্যবর্তী সময়ে শব্দগুলোকে ঘিরে আপনার চিন্তভাবনা ও অনুভূতির জগতে নানা পরিবর্তন ঘটে। আমি একে ‘দ্বিধা’ বলি।

আজকাল মানুষের কম্পিউটারে পুরো পাঠ্যটিই থাকে; কোনো অজানা শব্দ পেলে তারা কেবল একটি বোতাম চাপে আর কম্পিউটারে থাকা অভিধানটি তৎক্ষণাৎ সেই শব্দের অর্থ জানিয়ে দেয়। সাধারণত কম্পিউটার ওই অনুচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক অর্থটিই বেছে দেয়, ফলে আপনি শব্দটির ইতিহাস বা এর অন্যান্য সম্ভাব্য অর্থের জগতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগটুকুও পান না।

সেই মধ্যবর্তী সময় বা বিরতিটুকু হারিয়ে যাওয়ার ফলে ভাষার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এটি চিন্তার পথে মস্তিষ্ককে এক ধরণের বিশ্রাম দেয়, কারণ তখন আপনি পুরোপুরি চিন্তার জগতে প্রবেশ করেননি। এক অর্থে এটি ‘গরহাজির উপস্থিতি’র মতো; তবে মরমী সাধকরা ঈশ্বর সম্পর্কে যে ‘অনবগত মেঘ’–এর কথা বলে থাকে, যেখানে ঈশ্বরকে ‘ঈশ্বর বলে কিছু নেই’ হিসেবে দেখা হয় এবং তাঁর সম্পর্কে কোনো কথা বলা বারণ (কারণ কিছু বললে ঈশ্বরকে নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়) করা হয়, বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। এটি বরং জানার পথে এক ধাপ; এক ধরণের আস্থার ওপর ভর করে ঝুলে থাকার মতন অবস্থা। সেই অভিজ্ঞতা লাভের হারিয়ে যাওয়াটা আমাকে ব্যথিত করে।

কেট ডোয়ার: আপনি কি মনে করেন যে, আমরা কীভাবে মনোযোগ দিই তার সাথে সময়ের অভিজ্ঞতার কোনো সম্পর্ক আছে? আপনার কি মনে হয়, যিনি প্রচুর বই পড়েন আর যিনি সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাঁদের সময়ের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন?

কারসন: কথাটার মধ্যে যেন একটা বিচার বা মূল্যায়ন লুকিয়ে আছে। আমি ঠিক নিশ্চিত নই। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, আমরা আসলে সময়কে থামিয়ে দেওয়ার উপায় খুঁজি। এটা কেবল তখনই সম্ভব যখন আমরা কোনো কিছুতে পুরোপুরি মনোযোগ দিই; আর ঠিক সে–কারণেই আমরা সেই মুহূর্তগুলোর খোঁজ করি। আমার মনে হয়, নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখার সময় এমনটা ঘটতে পারে। কিংবা আপনি যখন আপনার সেরা কবিতাটি লেখার সময় গভীর মনোযোগে ডুবে থাকেন, তখনও। দুটোর ক্ষেত্রেই এমন এক গভীর মনোযোগ তৈরি হতে পারে যার ভেতর আপনি প্রবেশ করতে পারেন, হারিয়ে যেতে পারেন। সময় নিয়ে আমার একমাত্র আগ্রহ হলো একে থামিয়ে দেওয়ার উপায় খোঁজা। কারণ সময় যখন থামে না, তখন একঘেয়েমি গ্রাস করে।

আপনি সময়ের বয়ে চলা দেখছেন, অথচ সেই সময়ের মধ্যে এমন কিছু ঘটছে না যা তাকে পূর্ণতা দিতে পারে, যা আপনাকে দুঃখ–কষ্ট থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে। একঘেয়েমি আর ওই অন্য অবস্থাটি, হয়তো অমরত্ব বা সময়কে ভুলে থাকার মতোন মাঝামাঝি কোনো অবস্থান আমি খুব একটা দেখি না। সময়ের গণ্ডির বাইরে থাকা, ওই অন্য অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া, ব্যাপারটা দারুণ উপভোগ্য। এতটাই উপভোগ্য যে, তখন সময়ের কথা ভাবার বা দুশ্চিন্তা করার কথা আপনি ভুলেই যাবেন।

কেট ডোয়ার: আপনি কি একটানা দীর্ঘ সময় ধরে এরকম অবস্থায় থাকেন?

কারসন: কপাল ভালো হলে হয়তো কয়েক মিনিট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅ্যান কারসনের দুটি কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রতিভা বিকাশে লিওদের বহুমুখী উদ্যোগ