মামদো ভূতের মন খারাপ। গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে গিয়ে সে পাতায় বসে দুলতে লাগলো। পাশের আমগাছ থেকে দেখলো গেছো ভূত। কী ব্যাপার? ঘুরতে না গিয়ে এমন মন খারাপ করে দুলছো কেন?
বিরক্ত হয়ে বললো মামদো, মন খারাপ হবে না? ফুল ভূত বলছে, ওদের বাড়ি আর না যেতে।
কেন! কী ঝামেলা?
ফুল ভূতের বাড়িতে তো আগে কেউ থাকতো না। এখন অনিক এসেছে। ওর আত্মীয়–স্বজনে ঘর ভরে গেছে। আমি একটু আগে দেখে এলাম ওখানে বাতি জ্বলছে। সত্যিই লোকজন কথাবার্তা বলছে। ফুল ভূত নিজেও উঠোনের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
ও! এই কথা! আচ্ছা ওখানে বাচ্চা–কাচ্চা আছে?
নারকেল গাছের চিকন পাতা দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে মামদো বললো, এত্তগুলা!
গেছো ভূতের চোখ ঝলমল করে উঠলো। হুররে! মামদো ভূত! উপায় পাওয়া গেছে!
কী উপায়?
বাচ্চাগুলোকে ভয় দেখালে বাড়ির লোকজন পালিয়ে যাবে।
বাহ! দারুণ বুদ্ধি তো! তাহলে আর দেরি কেন? চলো। নাকি সুরে গেছো ভূত ডাক দিলো।
ভূতেরা সবাই কে কোথায় আছো? এক্ষুণি চলে এসো তালগাছে। পুকুর থেকে উঠে এলো মেছো ভূত। জবা গাছের ঝোপ থেকে এলো ফুল ভূত। ইশকুল থেকে এলো স্যার ভূত। গেছো ভূতও লাফিয়ে আসলো তালগাছে।
মেছো ভূত বললো, এক কাজ করি। আমি বাচ্চাগুলোকে ডেকে নিয়ে ওদিকের টিলায় নিয়ে লুকিয়ে রাখি।
ফুল ভূত বললো, আমি ফুলের গন্ধ শুকিয়ে ওদের বেঁহুশ করে রাখি।
গেছো ভূত বললো, আমগাছে তুলে বেঁধে রাখলেই তো হয়।
মামদো ভূত বললো, আমি সারা ঘরে ঘুরবো। ওরা যেদিকে তাকাবে আমাকে দেখবে। তখন ভয়ে পালাবে। স্যার ভূত চুপচাপ শুনছিলো ওদের কথা। এবার বললো, ভূতের নামে এমনিতেই বদনাম। তোমাদের বুদ্ধিগুলো একটাও আমার পছন্দ হয়নি।
কেন? কেন? সবাই একসঙ্গে জিগ্যেস করলো।
আমরা ওদের ভয় দেখাবো কেন? ওদের সাথে বন্ধুত্বও তো করতে পারি।
ভূতের সাথে মানুষের বন্ধুত্ব! স্যার ভূতও সব কী আজগুবি কথা বলে! সবাই হিহি করে হাসতে লাগলো।
কিন্তু স্যার ভূত ওদের হাসিটা যেন শুনলোই ন। বললো, চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। দেখো! কাল আমি ঠি–ক ওদের সাথে বন্ধুত্ব করবো। তোমরা কিন্তু এরমধ্যে কেউ ওদের ভয় দেখাবে না। পরদিন বাচ্চারা ইশকুলে আসলো। স্যার ভূত মানুষের রূপ ধরে টিফিন ছুটিতে ওদের সাথে খেললো। খুব দৌড়াদৌড়ি করলো। নতুন বন্ধু পেয়ে বাচ্চারা তো খুব খুশি। এভাবে কয়েকদিন কাটলো। প্রতি রাতে তালগাছে মিটিং হয়।
তুমি তো বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছো বাচ্চাদের সঙ্গে। মামদো ভূত গম্ভীর মুখে বললো।
স্যার ভূত হেসে বললো, বলেছিনা বন্ধুত্ব হবে?
ইশ! ওরা জানে নাকি তুমি ভূত! শুনলেই পালাবে। মেছো ভূতের কথা শুনে স্যার ভূত বললো,
পালাবে কেনো! কয়েকদিন পর ওরা ঠিক ঠিক আমার বন্ধু হবে। দেখো!
আর আমরা? ফুল ভূত বললো।
কাল বিকেলে ওরা স্কুলে মাঠে খেলতে আসবে৷ ওই সময় তোমরা দলবেঁধে যাবে। আমি বলবো তোমরা আমার বন্ধু। দেখবে, ওরা তোমাদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব করেছে। স্যার ভূতের কথায় সবাই রাজি হলো।
পরদিন স্কুলের মাঠে ভূতেরা সবাই মানুষের রুপ ধরে গেলো। স্যার ভূত সবাইকে বাচ্চাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। নতুন আরো বন্ধু পেয়ে বাচারা তো মহা খুশি। দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো।
একদিন হঠাৎ খেলতে গিয়ে অনিক পুকুরের পানিতে পড়ে গেলো। সে সাঁতার জানে না। তাই পানিতে ডুবে যাচ্ছে। সেদিন অন্য বন্ধুরা কেউ আসেনি। ভূতেরা পড়লো মহা মুশকিলে। ওরা চুপিচুপি বলতে লাগলো। পানিতে নামলেই তো মেছো ভূত মাছের মতো হয়ে যাবে। ফুল ভূত ফুলের মতো। গাছ ভূত গাছের মতো হয়ে যাবে। ভূতেরা বললো, এ তো মহা সমস্যা! স্যার ভূত বললো, কোনো সমস্যা নয়। আমি নামবো। শুনে চমকে উঠলো সবাই। বললো, পুকুরের পানি তো অনেক গভীর। ওই পানিতে নামতে হলে তো তোমাকে লম্বা হতে হবে। তখন তো অনিক বুঝে যাবে। স্যার ভূত বললো, যা হয় পরে দেখা যাবে। আগে অনিককে বাঁচাই। বলেই পানিতে লাফ দিলো। অনিককে পানি থেকে তুলে আনলো। তার পেট থেকে পানি বের করে সুস্থ করে তুললো। কিন্তু সুস্থ হতেই ভয়ে তার চোখমুখ নীল হয়ে গেলো। বললো, তুমি কে? আমি দেখেছি তুমি পানিতে হাঁটছিলে! আমার ভীষণ ভয় করছে। মা গো! অনিকের কান্না দেখে মামদো ভূত বললো, ভয় পেয়ো না ছোট্ট বন্ধু। আমরা ভূত। তোমাদের মতো আমরাও সবাই বন্ধু। তোমাদের ঘরটা ছিল আমাদের থাকার ঘর। খেলার ঘর। কিন্তু তোমরা এখন বাড়িতে থাকো। তাই আমরা সব বন্ধু আর একসঙ্গে থাকতে পারছি না। আমাদের অনেক কষ্ট। আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি করব না। শুধু তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য আমরা মানুষের মতো হয়েছি। এবার অনিকের মনে একটু সাহস এলো। বললো,
তা–ও ঠিক। যদি সত্যি সত্যি খারাপ হতে তাহলে তো আমাকে পানি থেকে তুলে বাঁচাতে না। পেট থেকে পানি বের করে সুস্থ করতে না। কাশতে কাশতে অনিক বললো,
আচ্ছা ঠিক আছে। আজ থেকে আমরা সবাই বন্ধুর মতো থাকবো। কিন্তু তোমরা যে ভূত সেটা কাউকে বলবো না। শুনে তো ভূতেদের সে কী আনন্দ! ফুল ভূত অনিককে বাতাসের সঙ্গে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আবার নিয়ে এসে স্কুলের মাঠে রাখে। গেছো ভূত আশপাশের গ্রাম ঘুরিয়ে এক মিনিটের মধ্যে নিয়ে আসে। অনিকও ভারী মজা পেলো। হাসতে হাসতে বললো, অনিকের ভূত বন্ধু!










