অচেনা গাজা, বিলীন বসতি

তিন বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ

| বৃহস্পতিবার , ৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরায়েলে ঢুকে হামাসের হামলাকে কেন্দ্র করে গাজা ভূখন্ডে ইসরায়েলের শুরু করা সামরিক অভিযানে তিন বছরের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর অবরুদ্ধ এই ফিলিস্তিনি জনপদটির চেহারা এমনভাবে বদলে গেছে যে, তা এখন আর চেনার উপায় নেই। ইসরায়েলের বিমান ও স্থল হামলায় গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি, পাড়া–মহল্লা, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো ও জরুরি সেবা। থমকে গেছে ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। খবর বিডিনিউজের।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের যুদ্ধে গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন ছারখার হয়ে গেছে। বারবার এলাকা খালি করার নির্দেশে গৃহহীন হয়েছেন অগণিত ফিলিস্তিনি, আর প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৪,২৪৫ জন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও তা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় আরও ১,৪৬২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধ গাজার শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনীতিকে একেবারে ধসিয়ে দিয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য পানি, খাবার, আশ্রয় ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার সুযোগ মেলাতে প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রাম করতে হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের।

গাজাবাসীর জন্য কেবল বাসস্থানই বদলায়নি, প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ধরনও পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বাড়িঘর, সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ ও যাতায়াতের যানবাহন, দৈনন্দিন জীবনের এসব মৌলিক উপাদান এখন সিংহভাগ মানুষের জন্যই অতীত। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। বাড়িঘর হারিয়ে বা জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার হয়ে ৬৫ শতাংশ মানুষ এখন তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। এছাড়া অধিকাংশ পরিবারের কাছেই পর্যাপ্ত বিছানা, আলো, রান্নার সরঞ্জাম এবং স্যানিটেশন বা শৌচাগার সুবিধা নেই।

সুপেয় পানির সংকটও চরম রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, আগস্টের শুরুতে ৯১ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে তীব্র পানির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে, যা জুনে ছিল ৮৪ শতাংশ। বিদ্যুৎ সরবরাহের কেন্দ্রীয় গ্রিড বলতে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ফলে হাসপাতালসহ জরুরি সেবা ক্ষেত্র ও বাসা–বাড়িগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট রয়েছে। রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় যাতায়াত, ফোন ও ইন্টারনেট সেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে পানি সংগ্রহ, মোবাইল চার্জ দেওয়া বা রান্নার মতো প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজগুলোও এখন একেকটি জটিল শারীরিক ও মানসিক সংগ্রামের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসা–বাণিজ্য ও স্থানীয় শিল্প কারখানা ধ্বংস হওয়ায় গাজার অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৭৮ শতাংশে।

২০২৫ সালে গাজায় মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) নেমে এসেছে মাত্র ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালের মাত্র ১৭ শতাংশ। এছাড়া, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ছিল ২০২২ সালের মাত্র ৬ শতাংশ এবং নির্মাণ খাত নেমে এসেছে ১ শতাংশে।

সীমান্ত পারাপারে ইসরায়েলি কড়াকড়ির কারণে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সেপ্টেম্বরে গাজায় নিত্যপণ্যের দাম ২০২৩ সালের অক্টোবর পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় গড়ে ২০০ শতাংশ বেশি ছিল। অর্থনৈতিক গবেষক রামী আল–জাইগ আল জাজিরাকে বলেন, এই যুদ্ধ গাজার সমাজকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে মানুষ আবার মৌলিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে আদিম পদ্ধতির কাজের দিকে ঝুঁকছে।

আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার এখন মানবিক ত্রাণ সাহায্য ও ধারের ওপর নির্ভর করছে। বাজারে কাগুজে টাকার তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই–ওয়ালেট ব্যবহার করছে। তিন বছরের যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কয়েক লাখ শিশু টানা তিন বছর ধরে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। যে কটি ভবন টিকে আছে, সেগুলো মূলত বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা ৩ বছর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল।

শ্রেণিকক্ষে ফেরার বদলে অনেক শিশু এখন তাঁবু ও অস্থায়ী শিখন কেন্দ্রে ক্লাস করছে। অন্যদিকে, প্রায় ২ লাখ শিশুর কোনো ধরনের শিক্ষায় প্রবেশাধিকারই নেই। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদে পুরো একটি প্রজন্ম শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরামগড়ে তিন কোটি টাকার মাদকদ্রব্য ধ্বংস করল বিজিবি
পরবর্তী নিবন্ধসাতকানিয়ায় বাসের ধাক্কায় টেক্সির ২ যাত্রী নিহত