সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সংহতি ও বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ

জহিরুল ইসলাম জহির | শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর, আমাদের দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠে। শিল্প–কল–কারখানাগুলোর উৎপাদনশীলতা স্বাধীনতার পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে আসেনি। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মূল্যের সাহায্যের প্রবাহ সত্ত্বেও, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র ঘাটতি ছিল। ১৯৭৪ সালে, খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা সত্ত্বেও এক ভয়াবহ বন্যার পর, দুর্ভিক্ষ শুরু হয় যার ফলে প্রায় দশ লক্ষ লোক মারা যায়। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পরিস্থিতি বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে সংবিধান সংশোধন করেন এবং স্বৈরশাসনকে ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ করেন। বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করেন। বাকশাল তথা একদলীয় শাসনের কবলে পড়ে প্রিয় স্বদেশ।

সাংবিধানিক সংশোধনীর আট মাস পর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরের দিকে এক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব তার পরিবারের সদস্যদের সাথে নিহত হন, যা দেশকে আরও গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়। আওয়ামী লীগ তার সহকর্মীদের একটি অংশ, খুনিদের সমর্থনে, তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ ১৯৭৫ সালের আগস্টের ঘটনাবলির কারণে প্রায় ভেঙে পড়ে। শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত কিছু মধ্যম সারির মুক্তিযোদ্ধা অফিসার খন্দকার মোশতাক আহমাদের অভিভাবকত্বে যেভাবে সরকার চালাচ্ছিল তা সিনিয়র অফিসারদের অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। অনেকে, বিশেষ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’র সদস্যরা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের (অব.)-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে বিরাজমান উত্তপ্ত ও অস্থির অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে তৈরি হচ্ছিল। সাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা ব্রিগেডের সহায়তায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ৭ নভেম্বরের সিপাহি–জনতার বিপ্লব তাঁকে সেনাপ্রধানের পদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।” অন্যদিকে, খালেদ মোশাররফ ও তাঁর দুজন সহকর্মী কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দার ৭ নভেম্বর সূর্য ওঠার আগে সেনাদের হাতে নিহত হন। ১৯৭৫ সালে মর্মান্তিক এক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছিল। দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করে। তিনটি সেনা–অভ্যুত্থান আর ঘাত–প্রতিঘাতে দেশে এক অনিশ্চয়তা নেমে আসে। সেই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে আবির্ভাব ঘটে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আত্মপ্রকাশ ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে। সিপাহী–জনতার বিপ্লব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দুতে নিয়ে আসে। সিপাহী–জনতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দুতে টেনে এনে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে অপবিত্র ও অধীনস্থ করার ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দেয়। সিপাহী–জনতার বিপ্লব জিয়াউর রহমানকে জনমানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পদচারণা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল বিএনপি‘র। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে হত্যা করে কিছু উচ্ছৃঙ্খল, উচ্চাভিলাষী অফিসার। শহীদ জিয়া স্বল্প সময়ে দেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বাংলাদেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে জিয়া ইতিহাসে নিজের অক্ষয় স্থান নিশ্চিত করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, সময়োপযোগী গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ এসব বহুমাত্রিক সাফল্যের কথা সুবিদিত এবং বহুল চর্চিত। শহীদ জিয়া ছিলেন মাটি ও মানুষের নেতা। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’– ছিল জিয়ার বিশ্বাস ও ধ্যান। তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। তিনি থাকবেন দেশপ্রেমিক বিবেকবান প্রতিটি মানুষের অন্তরে এক জীবন্ত প্রত্যয় হিসেবে। লেখক: সহ– দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅশ্বিনীকুমার দত্ত : স্বদেশি আন্দোলনের অগ্রদূত
পরবর্তী নিবন্ধ৭ই নভেম্বর: বাংলাদেশের রাজনীতিক অঙ্গনে অবিস্মরণীয় দিন