একুশে পদক প্রাপ্ত ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর নামে রাউজানের নোয়াজিশপুরে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি কেন্দ্র সংগ্রহশালাটি লতাপাতায় ঢেকে আছে প্রায় অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে। এই প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে সাংষ্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় যাদুঘর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, জাতীয় যাদুঘর কর্তৃপক্ষ স্মৃতি কেন্দ্র সংগ্রহশালার দ্বিতল ভবনটি নির্মাণ সম্পন্ন করেছিল ২০১৯ সালে। সেই থেকে এটি পড়ে রয়েছে তালাবদ্ধ অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে। স্থানীয়রা বলেছে ভবনের ভেতর কি আছে এলাকার কেউ দেখার সুযোগ হয়নি। শোনা যাচ্ছে ইতিমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে চুরি হয়েছে সব সিলিং ফ্যান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি যে জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে সেই জায়গাটি রেজিস্ট্রিমূলে যাদুঘর কর্তৃপক্ষকে দান করেছেন গবেষক আবদুল হক পরিবারের সদস্যরা। এই ভবনটি নির্মাণে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ খরচ করেছে দুই কোটি টাকার বেশি।
স্থানীয়রা বলেছেন, আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একুশে পদক প্রাপ্ত একজন গুণী ব্যক্তি। খ্যাতনামা এই ইতিহাসবিদের নামে প্রতিষ্ঠা করা স্মৃতি কেন্দ্র ও সংগ্রহশালা ভবনটি কেন এত বছর বন্ধ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে তা কেউ জানে না। কর্তৃপক্ষের কাছে সচেতন ব্যক্তিবর্গের দাবি অবিলম্বে এই প্রতিষ্ঠানটিতে জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র বরাদ্দ দিয়ে এটি উন্মুক্ত করে দেয়া হউক সর্বসাধারণের জন্য।
সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার নোয়াজিশপুর ইউনিয়ন পরিষদের কিছুটা পশ্চিমে ২৬ শতক জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত আছে গবেষকের নামে প্রতিষ্ঠিত সংগ্রহশালার দ্বিতল ভবনটি। সামনের দিকে নির্মিত প্রবেশ পথের প্রধান ফটকের দেওয়ালে সাঁটানো আছে সাংষ্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও যাদুঘর বিভাগের নামে নামফলক। ভবনটি রয়েছে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। দেখাশোনার জন্য কোনো লোক না থাকায় চারপাশ ঢেকে আছে লতাপাতায়। এই প্রতিষ্ঠানটি এভাবে ফেলে রাখার কারণ জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় যাদুঘর কর্তৃপক্ষের সাথে। জাতীয় যাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবের সরকারি ফোন নম্বরে বারবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। আরো দুই কর্মকর্তার সাথে এই নিয়ে কথা বললে তারা এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান।
এ বিষয়ে গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর সন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ড. মনজুর উল আমিন চৌধুরী আজাদীকে বলেন, সাংষ্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ একুশে পদকে ভূষিত গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর নামে রাউজানে একটি স্মৃতি কেন্দ্র ও সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার কথা জানালে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে যাদুঘর কর্তৃপক্ষের নামে ২৬ শতক জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। সেই জায়গায় তারা দ্বিতল ভবন নির্মাণ করে দিয়ে চলে যাওয়ার পর আর কোনো খবর নেয়নি। গবেষকপুত্র জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ দেয়ার সহায়তা পেতে তিনি মন্ত্রণালয় ও যাদুঘর কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে আসছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রতিষ্ঠানটি সচল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
উল্লেখ্য, ইতিহাসবিদ গবেষক আবদুল হক চৌধুরীকে ২০২১ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। রাউজানে নোয়াজিশপুর গ্রামে ১৯২২ সালের ২৪ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী এই কৃতী সন্তান ‘চন্দ্রাবতী’ কাব্যের রচয়িতা কবি কোরেশী মাগনের সপ্তম অধস্তন পুরুষ। গবেষক আবদুল হক চৌধুরী নোয়াজিশপুরের তৎকালীন প্রয়াত প্রকৌশলী দানশীল ব্যক্তি আলহাজ্ব সরফুদ্দীন ও মাতা রাউজান থানার ডাবুয়া গ্রামের প্রাচীন জমিদার দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর তৃতীয় অধস্তন পুরুষ আলহাজ্ব ইসমাইল চৌধুরীর একমাত্র কন্যা মোমেনা খাতুন চৌধুরী। ১৯৯৪ সালের ২৬ অক্টোবর ৭২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই ইতিহাসবিদের প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে একাধিক খণ্ডে সংস্করণে প্রকাশিত চট্টগ্রামের ইতিহাস, চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি, শহর চট্টগ্রামের ইতিকথা, সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা। এছাড়া রয়েছে আরো অনেক গ্রন্থ।











