সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে অক্টোবরের কয়েকটি ঘটনা আমাদের সামাজিক বাস্তবতার একটি পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। নারীরা কোথায় খেলবেন, কোথায় গান গাইবেন, কীভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হবেন–এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আসলে কার? একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং একটি ব্যক্তিগত বাউলগানের আসরকে ঘিরে আপত্তি, অভিযোগ ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঘটনা দুটি ভিন্ন, আয়োজনের ধরনও আলাদা। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই আপত্তির কেন্দ্রে ছিলেন নারীরা। একদিকে মাঠে ফুটবল খেলতে চাওয়া কয়েকজন তরুণী, অন্যদিকে গান পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রিত নারী শিল্পী। দুটি ঘটনাতেই নারীর অংশগ্রহণকে ঘিরে অশ্লীলতার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আগেই সেই আশঙ্কা আয়োজন বন্ধের দাবি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ নারীর উপস্থিতি এখানে কেবল একটি সাংস্কৃতিক বা ক্রীড়াবিষয়ক ঘটনা নয়, সামাজিক অনুমোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের নারী ফুটবলারদের মধ্যে একটি প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’ নামে একটি সংগঠনের আপত্তির পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়। আয়োজকদের অভিযোগ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর তাঁরা খেলা আয়োজন থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল এবং আয়োজকেরাই ম্যাচ স্থগিত করেছেন। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্যেও আয়োজন ঘিরে বিরোধের অন্য কারণের উল্লেখ পাওয়া গেছে। ফলে ম্যাচ স্থগিতের দায় নিয়ে পক্ষগুলোর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে এই মতভিন্নতার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট–নারীদের ফুটবল খেলার আয়োজনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আপত্তি উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়নি।
এর কিছুদিন পর একই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে বাউলগানের একটি আসর নিয়েও আপত্তি ওঠে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে নিজের বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে স্থানীয় নারী শিল্পী নীলা ও তানিশার গান পরিবেশনের কথা ছিল। দুই ব্যক্তি থানায় লিখিত আবেদন করে নারীদের গান পরিবেশন নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, এতে এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অভিযোগের পর আয়োজক প্রথমে অনুষ্ঠান বাতিলের কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত ২২ অক্টোবর রাতে সীমিত পরিসরে গানের আসর অনুষ্ঠিত হয় এবং নারী শিল্পীরাও অংশ নেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। এই শেষ তথ্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে আশঙ্কার ভিত্তিতে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি উঠেছিল, বাস্তবে সেই আশঙ্কার সত্যতা পাওয়া যায়নি। সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি দিয়ে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত করার প্রবণতা কতটা যুক্তিসংগত, ঘটনাটি সেই প্রশ্ন সামনে আনে।
বাংলাদেশে নারীর সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। লোকসংগীত, পালাগান, যাত্রা, মঞ্চনাটক থেকে আধুনিক সংগীত–দীর্ঘকাল ধরে নারীরা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পচর্চা করে এসেছেন। অন্যদিকে ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকসসহ নানা খেলায় নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের অর্জন জাতীয় গৌরবের বিষয় হয়ে উঠেছে। অথচ সেই একই সমাজে স্থানীয় পর্যায়ে একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করতেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এখানে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। দেশের হয়ে নারীরা জয়ী হলে তাঁদের সাফল্য উদ্যাপন করা হয়, কিন্তু নিজেদের এলাকায় খেলার মাঠে নামতে চাইলে তাঁদের উপস্থিতিই কখনো কখনো বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। জাতীয় পর্যায়ে নারীর অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া আর স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর স্বাধীন অংশগ্রহণকে মেনে নেওয়া যে এক নয়, এসব ঘটনা তারই উদাহরণ।
নারীর শরীরকে কেন্দ্র করে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস দীর্ঘ। পোশাক, চলাফেরা, উচ্চকণ্ঠে কথা বলা, হাসি, গান কিংবা খেলাধুলা–বিভিন্ন সময়ে এসব আচরণকে শালীনতা ও সামাজিক মর্যাদার ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু শালীনতার ব্যাখ্যা সব সমাজে, সব সময়ে এক রকম নয়। একই আচরণ পুরুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হলেও নারীর ক্ষেত্রে আপত্তিকর বলে বিবেচিত হতে পারে। ফুটবল খেলার জন্য শারীরিক সক্ষমতা, অনুশীলন ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব প্রয়োজন। গান পরিবেশনের জন্য প্রয়োজন শিল্পদক্ষতা, প্রস্তুতি ও প্রকাশের স্বাধীনতা। অথচ এই দুটি ক্ষেত্রেই নারীর যোগ্যতা বা শিল্পমানের পরিবর্তে তাঁর উপস্থিতি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্ন প্রধান হয়ে উঠলে মূল কাজটি আড়ালে চলে যায়। একজন নারী ফুটবলার তখন আর কেবল খেলোয়াড় থাকেন না, একজন নারী শিল্পীও শুধু শিল্পী থাকেন না। তাঁদের পরিচয়কে সামাজিক বিধিনিষেধের আলোকে বিচার করা শুরু হয়।
এখানে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্নও এসেছে। একটি সমাজে মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পছন্দে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কেউ গান শুনতে পছন্দ না–ও করতে পারেন, কোনো ধরনের আয়োজন সম্পর্কে আপত্তিও জানাতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও অপছন্দের সঙ্গে অন্যের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের অধিকারকে পৃথক করে দেখা প্রয়োজন। কোনো আয়োজন আইন লঙ্ঘন করলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাব্য অশ্লীলতা কিংবা অনুমাননির্ভর সামাজিক অস্বস্তিকে ভিত্তি করে আয়োজন বন্ধের দাবি তোলা হলে সেই যুক্তির সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে? আজ নারী ফুটবলের বিরুদ্ধে যে যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল তা অন্য কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে প্রশ্নটি শুধু নারীর অধিকার নয়, সমাজে মতপার্থক্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সহাবস্থানের সুযোগ নিয়েও।
এই ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি উঠলেই তা স্থগিত করা সবচেয়ে সহজ সমাধান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার আশঙ্কায় বারবার আয়োজন বন্ধ হলে ভবিষ্যতে আপত্তি জানানোর মাধ্যমেই অন্যের অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা উৎসাহিত হতে পারে। প্রশাসনের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, একই সঙ্গে নাগরিকদের বৈধ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করা। আয়োজকদের দায়িত্বও রয়েছে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করার। তবে সেই দায়িত্ব পালনের অর্থ নারীদের অংশগ্রহণকে আগেভাগে সমস্যার উৎস হিসেবে ধরে নেওয়া নয়।
নারীর স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই শিক্ষা, চাকরি, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কথা বলি। এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতার একটি মৌলিক দিক হলো নিজের প্রতিভা ও আগ্রহ অনুযায়ী সামাজিক পরিসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ। একজন তরুণী ফুটবল খেলতে চাইবেন, একজন শিল্পী গান গাইতে চাইবেন–এই ইচ্ছাগুলোকে অস্বাভাবিক বা বিশেষ অনুমোদনসাপেক্ষ মনে করার কারণ নেই। তাঁদের অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকার করার অর্থ সবাইকে একই সাংস্কৃতিক পছন্দ গ্রহণ করতে হবে, তা নয়। বরং ভিন্ন পছন্দ ও বিশ্বাসের মানুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই একটি বহুত্ববাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য।
দিরাইয়ের ফুটবল ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু বাউলগানের আসরটি আপত্তি সত্ত্বেও হয়েছে। এই ভিন্ন পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক বাধা সব সময় একইভাবে কাজ করে না এবং প্রতিরোধের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায় না। তবে নারীর গান গাওয়া বা ফুটবল খেলা প্রতিবার বিতর্ক, আলোচনা কিংবা বিশেষ সাহসিকতার ঘটনা হয়ে উঠবে কেন? যে সমাজ নারীর সাফল্যকে নিজের অর্জন বলে উদ্যাপন করে, সেই সমাজেরই দায়িত্ব তাঁর অংশগ্রহণের স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করা। নারীর জন্য মাঠ কিংবা মঞ্চ আলাদা কোনো অনুগ্রহের জায়গা নয়। সেগুলোও সমাজের সাধারণ পরিসর, যেখানে তাঁর উপস্থিতি অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক হওয়ার কথা।










