আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। আর মৃত্যুর মাধ্যমেই দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি আসে এবং আখিরাতের অনন্ত–অসীম জীবনের সূচনা হয়। মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য। কিন্তু কখন, কোথায় এবং কী অবস্থায় মৃত্যু আসবে, তা একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় কামনা শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, বরং এমন মৃত্যু, যার মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং যা আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার সূচনা হয়। তাই একজন ঈমানদার বান্দা সব সময় আল্লাহর কাছে হুসনুল খাতিমাহ বা উত্তম পরিণতি কামনা করেন। কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ আমাদের শিখিয়েছে, মৃত্যুর সময়ের চেয়ে মৃত্যুর অবস্থা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই আসুন, আল্লাহর কাছে এমন কিছু বিষয় প্রার্থনা করি, যা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্য কল্যাণকর।
মৃত্যু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় নয়; সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো সৎ আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করা, তওবা না করে মৃত্যুবরণ করা, অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত না করে মৃত্যুবরণ করা, ইসলামের ওপর জীবন পরিচালিত না করে মৃত্যুবরণ করা। সর্বোপরি, এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা, যে অবস্থায় আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট থাকেন। বাহ্যিক মৃত্যু কিংবা জীবনাবসান কোনো চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি নয়। মূল ভীতি ও বিপর্যয় লুকিয়ে থাকে মানুষের আমল, নিয়ত এবং তার রবের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কোন বিষয়গুলো মৃত্যুকে প্রকৃত অর্থেই ভীতিপ্রদ করে তোলে।
১. সৎ আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করা: খালি হাতে রবের দরবারে উপস্থিত হওয়া একজন বান্দার জন্য সবচেয়ে বড় শূন্যতা। মৃত্যুর পর সৎ আমলই হয় মানুষের একমাত্র সঙ্গী। ২. তওবা না করে বিদায় নেওয়া: জীবন থাকতে পাপের অনুশোচনায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা না চেয়ে হঠাৎ চলে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, তওবা ছাড়া গুনাহের বোঝা নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে। ৩. অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত না রাখা: হৃদয়ে ঈমানের আলো না রেখে আল্লাহকে ভুলে দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা মহাক্ষতির শামিল। ৪. ইসলামের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করা: পুরো জীবন নিজের খেয়ালখুশিমতো চালিয়ে শেষ মুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
৫. আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিয়ে বিদায় নেওয়া: একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে না যে, তার স্রষ্টা ও প্রতিপালক তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হলো। ইসলামি চিন্তাবিদ ও ওলামাদের মতে, নিয়মিত কিছু আমল ও অভ্যাসের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে ঈমানি মৃত্যু লাভ করা সম্ভব। তা হলো– ১. ঈমানের ওপর মৃত্যুর গুরুত্ব: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিনদের সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা খাঁটি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করে। কোরআনে এসেছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত, তেমনিভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০২), ২. তওবার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব: মৃত্যুর আগে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা আন–নূর, আয়াত ৩১), ৩. বান্দার শেষ পরিণতির গুরুত্ব: মানুষের জীবনের শেষ সময়টি কতটা মূল্যবান, সে সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই মানুষের যাবতীয় আমলের মূল্যায়ন নির্ভর করে তার শেষ পরিণতির ওপর।” আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা এই দুনিয়া নয়, বরং আখিরাত। তাই মৃত্যুর রূপ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে মুমিনের প্রতিটি মুহূর্তের ভাবনা হওয়া উচিত মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে।
যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে অটল থাকে, পবিত্র জীবনযাপন করে, মৃত্যুকে স্মরণ করে, দান–সদকা করে, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং নিয়মিত দোয়া করে, তার জন্য ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু লাভের আশা করা যায়। কারণ, ‘হুসনুল খাতিমাহ’ তথা ‘সুন্দর মৃত্যু’ আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ তাআলা বলেন– উচ্চারণ: রব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরাও ওয়া তাওয়াফ্ফানা মুসলিমিন। অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ওপর ধৈর্য বর্ষণ করুন এবং আমাদের মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করান। (সুরা আল–আ‘রাফ, আয়াত ১২৬)
মৃত্যুর সময় আমাদের হাতে নেই, কিন্তু মৃত্যুর প্রস্তুতি আমাদের হাতেই রয়েছে। তাই সময়, স্থান বা বিশেষ পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের ঈমান, আমল, তওবা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক। ‘হুসনুল খাতিমাহ’ অর্থাৎ ‘ঈমানের সঙ্গে সুন্দর মৃত্যু’ প্রত্যেক মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। দুনিয়ার যাত্রা যত দীর্ঘই হোক, শেষ মুহূর্তটাই বান্দার প্রকৃত সফলতা বা ব্যর্থতার পরিচয়। তাই কোরআন, সুন্নাহ এবং সালাফদের জীবন থেকে এমন কিছু আমলের শিক্ষা পাওয়া যায়, যেগুলো মানুষকে সঠিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষত কুদৃষ্টি, হারাম উপার্জন, হারাম সম্পর্ক ও গোপন পাপ্ত এসব কাজ মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। এগুলোতে লিপ্ত থাকলে মৃত্যুর সময় তা অন্ধকার ডেকে আনতে পারে। তাই গুনাহ থেকে দূরে থাকা হুসনুল খাতিমাহ লাভের একটি শক্ত ভিত্তি। দান–সদকা করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা দীর্ঘ হায়াত লাভ ও কল্যাণকর পরিণতির অন্যতম মাধ্যম। নবীজি (সা.) বলেছেন, সদকা আল্লাহ তাআলার ক্রোধ প্রশমিত করে এবং খারাপ মৃত্যু থেকে রক্ষা করে। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। এই দুটি আমল মানুষের জীবনে বরকত আনে এবং কল্যাণ লাভের পথ সুগম করে।
আসুন, আমরা প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করি, “হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানের সঙ্গে জীবন দান করুন, ঈমানের ওপর মৃত্যু দান করুন, নেক আমলের তাওফিক দিন, মৃত্যুর সময় আমাদের জিহ্বায় কালিমা জারি রাখুন এবং আমাদের হুসনুল খাতিমাহ নসিব করুন।” আমিন। লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।












