দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

হংকংয়ের টেম্পল স্ট্রিট মার্কেটে বন্ধু স্বপনকে সাথে নিয়ে হাঁটছি। হাঁটছি বললে, ভুল বলা হবে। কারণ এতো মানুষের ভিড়ে হাঁটা যায় না, কখনো গায়ের সাথে গা লাগিয়ে ভেসে থাকছি, কখনো একটু ফাঁকফোকর পেলে কয়েক কদম এগুচ্ছি। এতে করে যতক্ষন না হেঁটেছি, তার থেকে পায়ে বেশি ব্যথা মনে হচ্ছে। খাজনার চেয়ে বাজনা বাড়ার মতো ব্যাপার! এতো এত্তো মানুষের ভিড়ে হাঁটা! না আছে হাঁটার আনন্দ, না আছে ছন্দ। তবুও রাস্তার দুপাশে চোখ বুলিয়ে হাঁটতে খারাপ লাগছিল না। স্বপন বললো, কিছু খাবি, এখানের খাবার কিন্তু খুবই মজার, বিশেষ করে সী ফুড। স্বপনের কথা শুনে রাস্তার দুদিকে চোখ বুললাম, সারি সারি খাবারের দোকান। নাকে টের পেলাম যে, গরম খাবারের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছে। রাস্তার দুই পাশে রকমারি খাবার বিক্রি করা হচ্ছে, ছোট রেস্তোরাঁ আর খোলা জায়গায় সাজানো টেবিল। কোথাও বড় পাত্রে রান্না হচ্ছে সামুদ্রিক খাবার, কোথাও ধোঁয়া ওঠা ভাত পরিবেশন করা হচ্ছে, কোথাও কাঠিতে গাঁথা খাবার আগুনের আঁচে সেঁকা হচ্ছে। এখানের জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে ক্লে–পট রাইস বা মাটির পাত্রে রান্না করা ভাত, ফিশ বল, সিউ মাই, বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক খাবার ও গ্রিল করা স্ন্যাকস। এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের কিছু খাবারও পাওয়া যায় বলে স্বপন জানালো। তবে আমি হাতজোড় করে বললাম, ভাই, এসব খাবো না। তুই শুধু হাঁটতে থাক, আমি দেখতে থাকি।

স্বপন বললো, এসব আমিও খুব একটা খাইনা। খাওয়ার সুযোগও হয়না, তবে খাবারগুলো খুবই টেস্টি এবং হাইজানিক। সে ক্লে–পট রাইসের কথা বলতে গিয়ে বললো, মাটির পাত্রে ভাতের সঙ্গে মাংস বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে রান্না করা হয়। আমাদের ওরশ বিরানীর মতো। তবে পার্থক্য হচ্ছে, এখানে মাটির পাত্রের তলার দিকে ভাতের কিছু অংশ হালকা মচমচে হয়ে যায়। যা এরা পরম তৃপ্তি নিয়ে খায়। অবশ্য, স্বপন কোনদিন সেই ভাত খায়নি বলে জানালো।

সী ফুডের দোকানগুলো যেন আলাদা এক জগৎ। মাছ, চিংড়ি, ঝিনুক ও নানা ধরনের সামুদ্রিক উপাদান সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ খাবার বেছে নিচ্ছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন নিজের অর্ডারের জন্য। টেবিলে বসে যেমন খাওয়া যায়, তেমনি অর্ডার করে পার্সেলও নেয়া যায়। কোন সী ফুড খাবেন সেটি অর্ডার করলে তারা চোখের সামনে রান্না বা গ্রীল করে দেন। খেয়াল করে দেখলাম যে, দোকানিদের ব্যস্ততা চরমে। রাস্তার কোলাহল বা ভীড়ে তাদের তেমন খেয়াল নেই। তারা অর্ডার নিচ্ছেন, খাবার সার্ভ করছেন। পৃথিবীর দেশে দেশে স্ট্রিট ফুড বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে থাইল্যান্ডে স্ট্রিট ফুডের আলাদা কদর দেখেছি। টেম্পল নাইট মার্কেটে ঘুরতে গিয়ে মনে হলো এদের স্ট্রিট ফুডেরও আলাদা চাহিদা রয়েছে। শত শত বিদেশী পর্যটকসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তার পাশের দোকানে বসে পরম তৃপ্তি নিয়ে খাবার খাচ্ছেন। তাদের অনেকেরই চেহারা এবং পোষাকে আভিজাত্য রয়েছে।

আমরা হাঁটছিলাম। কিন্তু একটি জায়গায় এসে আমার চোখ আটকে গেলো। ভবিষ্যৎ জানানোর আশায় বসে আছেন গণক। আমাদের ফুটপাতে বানর, পাখী বা চিঠি নিয়ে বসে থাকাদের মতোই। তবে এখানে ফুটপাতে বসে নেই, চেয়ার টেবিল নিয়ে বসেছেন, কিন্তু পাখী টাকি বা বানর জাতীয় কিছু নেই। কিছু বইপত্র আছে। স্বপন না জানালে বুঝতেই পারতাম না যে, হংকংয়ের মতো আধুনিক একটি শহরে রাস্তায় ভাগ্য গনণা করতে গনক বসে থাকেন!

বাজারের একটি অংশে ফ্লাইওভারের নিচে আলো জ্বালিয়ে বেশ ভাবগম্ভির চেহারা করে বসে আছেন ভাগ্যগণনাকারীরা। কোথাও টেবিলের ওপর রাখা কার্ড, কোথাও চীনা অক্ষরে লেখা কাগজ, কোথাও হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলার আয়োজন। তাদের সামনে বসে আছেন কৌতূহলী মানুষ। কেউ নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চান, কেউ জানতে চান কর্মজীবন কেমন যাবে, কেউ আবার সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের প্রশ্ন নিয়ে হাজির হন।

স্বপন আমাকে টিপ্পনি কেটে বললো, ভাগ্য দেখবি নাকি? আমি হাসলাম। তবে দৃশ্যটি দেখতে দেখতে মনে হলো প্রযুক্তির উৎকর্ষে বিশ্বকে বদলে দেওয়া হংকংয়েও মানুষ ভবিষ্যত জানতে গণকের শরনাপন্ন হন! বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির অগ্রগতি হংকংয়ের মানুষের জীবনকে অনেক বেশি সহজ করে তুলেছে। তবু আগামীকাল কী ঘটবে, জীবনের পরবর্তী বাঁকে কী অপেক্ষা করছে–এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর আধুনিক হংকংয়েও মানুষের হাতে নেই। হয়তো সেই অনিশ্চয়তা থেকেই ভাগ্য গণনাকারীদের সামনে হাত মেলে ধরছেন আধুনিক মানুষেরা! আহা, আসলেই মানুষ শুধু নিজের কাছে নয়, প্রকৃতি ও সময়ের কাছেও অসহায়।

আরো একটু সামনে যেতে বাজারের আরেকটি অংশে চোখে পড়লো স্থানীয় সংগীতশিল্পী বা ক্যান্টনিজ অপেরার পরিবেশনা। কোথাও ঐতিহ্যবাহী সুর, কোথাও ক্যান্টনিজ কিংবা পাশ্চাত্য সংগীতের পরিবেশনা। স্বপন জানালো, এরা নিজের মনের আনন্দে গান করেন, বাজনা বাজান, নাচেন। কারো কাছে কোন টাকা পয়সা চান না, টিকেটও বিক্রি করেন না। তবে কেউ কেউ উপহার হিসেবে টাকা পয়সা দেন। আমি খেয়াল করে দেখলাম যে, কেউ কেউ নয়, অনেকেই টুক টুক করে টাকা পয়সা দিচ্ছেন। একজন শিল্পী নিজের সুরে মগ্ন, আমরাসহ বেশ কিছু শ্রোতা তাকে ঘিরে গান শুনছি। একটি শব্দও বুঝছি না, তবুও শুনতে খারাপ লাগছিল না। শরীরও মনে হয় দোলাচ্ছিলাম। আসলে সুরের কোন বর্ডার নেই, সুর সার্বজনীন।

শিল্পী নিজের মনে গান করছেন, বাজনা বাজাচ্ছেন। কেউ দাঁড়িয়ে শুনছেন, কেউবা পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছেন, আবার কেউবা ক্ষণিকের জন্য দাঁড়াচ্ছেন। আমাদের ছোটবেলায় গ্রামের হাটে জাদু দেখানো এবং তাবিজ বিক্রির যে আয়োজন চলতো, ব্যাপারটি অনেকটা তেমন।

স্বপন আমাকে জানালো যে, টেম্পল স্ট্রিটের নাম এসেছে কাছের টিন হাউ মন্দির থেকে। সমুদ্রের দেবী হিসেবে পূজিত টিন হাউকে ঐতিহ্যগতভাবে জেলে ও নাবিকদের রক্ষাকর্ত্রী বলে মনে করা হয়। হংকংয়ের এই অঞ্চলের সঙ্গে একসময় নৌযান, জেলে ও সমুদ্রনির্ভর জীবনের গভীর সম্পর্ক ছিল। সাগর থেকে মাছ ধরে বিক্রি করা ছিল প্রাচীন এই জনপদের বাসিন্দাদের অন্যতম রুটি রুজির উৎস। সাগরে যাওয়া আসার সময় তারা মন্দিরটিতে পূজো দিয়ে যেতো। ১৮৬০ সালের দিকে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে এবং ১৮৭৮ সালে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ভূমি পুনরুদ্ধার ও নগরায়ণের ফলে যে জায়গাটি একসময় সমুদ্রতীরের কাছাকাছি ছিল, সেটি এখন শহরের ভেতরে চলে এসেছে।

আমার মনে হলো, যে অঞ্চলটিতে একসময় জেলে ও নৌযাননির্ভর মানুষের জীবন আবর্তিত হতো, সেখানে সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আকাশ ছোঁয়া ভবন, দোকান, খাবারের বাজার ও রাতের বিনোদনের কেন্দ্র। সমুদ্র সরে গেছে, শহর বদলে গেছে। নগরায়ন এভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে বহুকিছু গিলে খেয়েছে, খাচ্ছে।

অনেকক্ষন ধরে ঘুরছি, অনেককিছুই দেখা হোলা। মন্দিরের দিকে যাবো কিনা জানতে চাইলো স্বপন। বললাম, পরের বারের জন্য কিছু জমা রাখ, আর হাঁটতে পারছি না। চল, এবার ফেরা যাক। স্বপন আমাকে নিয়ে কোন কোন পথে বাজার থেকে বের হয়ে এলো। বললো, স্ট্রিট ফুড নয়, কোন রেস্টুরেন্টে বসে ডিনার করবো, তারপর তোকে ট্রেনে তুলে দেবো।

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম, রাত প্রায় দশটা বাজতে চলেছে। স্বাভাবিকভাবে বিদেশের জন্য অনেক রাত। হংকংয়ের মানুষ আর্লি ডিনার করে, এতো রাতে রেস্টুরেন্ট খোলা পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলাম। স্বপন বললো, বহু রেস্টুরেন্ট আছে। চল।

স্বপন আমাকে নিয়ে একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয় ঢুকলো। দেখলাম, রেস্তোরাঁয় ভর যৌবন। বহু লোকজন খাওয়া দাওয়া করছেন। আমরা দুজন শুনে একপাশে একটি টেবিল দেখিয়ে দিলেন ওয়েটার। খাবার হিসেবে স্বপন অনেক কিছুর অর্ডার করলো। কিছু খেতে পারলাম, কিছু টেবিলে পড়ে থাকলো।

খাওয়া দাওয়া শেষে খুবই সামান্য পথ হেঁটে আমরা ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। স্বপন বললো, তিন মিনিটের মধ্যে ট্রেন আসবে, পথে ট্রেন পাল্টে পরের যেই ট্রেনটিতে উঠবি সেটির লাস্ট স্টপেজে তোকে নামতে হবে। পারবি, নাকি দিয়ে আসবো? (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাটির কাছে মানুষের শেষ পরাজয়
পরবর্তী নিবন্ধসামাজিক সমপ্রীতি প্রয়োজন