সাঙ্গু নদীর অপার রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন না, এমন মানুষ পাওয়া ভার। দুই তীরে পাহাড়ের সারি, সমতলে সবুজ ফসলের সমারোহ। বর্ষায় পাহাড় বেয়ে নেমে আসে ছোট–বড় অসংখ্য ছড়া। ছলছল শব্দে ছড়ার চঞ্চল জল এসে মেশে নদীতে। পাহাড়ের ওপরে ভেসে বেড়ায় মেঘ। মনে হয়, চূড়ায় উঠলেই ছোঁয়া যাবে মেঘ। বান্দরবানে এই মনে হওয়া অমূলক নয়। সাঙ্গুর তীরবর্তী পাহাড়চূড়ায় সত্যিই মেঘ জমে, গাছের ফাঁকে আটকে যায়, সেখানেই ঝরে বৃষ্টি হয়ে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি সৌন্দর্যের অম্লান কবিতা সাঙ্গু নদী। মারমা সমপ্রদায়ের কাছে ‘রিগ্রাই থিয়াং’ বা স্বচ্ছ পানির নদী, ব্রিটিশদের দেওয়া নাম ‘সাঙ্গু’। এর আরেক নাম শঙ্খ। কোথাও চপল, কোথাও শান্ত। মিয়ানমার সীমান্তের মদক এলাকার পাহাড়ি ছড়া থেকে সাঙ্গুর জন্ম। থানচি, রুমা, লামা্ত বান্দরবানের দুর্গম উপজেলা পেরিয়ে নদীটি উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে বান্দরবান সদর থেকে হঠাৎ পশ্চিমে বাঁক নেয়। বান্দরবান শহর থেকে দুই মিনিটের হাঁটা দূরত্বে এই নদী। এরপর সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী ও আনোয়ারা হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। ডলু, টংকাবতী, হাঙ্গরসহ কয়েকটি জলধারা এবং শিকলবাহা–চান্দখালী খাল হয়ে একটি শাখা কর্ণফুলীতেও মিলিত হয়েছে।
গবেষণাভেদে কর্ণফুলীর পর চট্টগ্রাম বিভাগের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭০–২৮৭ কিলোমিটার; এর প্রায় ১৭৩ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। গড় প্রস্থ ১১৯ মিটার।
বান্দরবানে সাঙ্গু–তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর ৯০% মারমা সমপ্রদায়ের। মাছ ধরা, কৃষি, নৌ–পরিবহন, এমনকি আধ্যাত্মিক বিশ্বাসেও জড়িয়ে আছে নদীটি। থানচি থেকে মদক পর্যন্ত নৌপথে পণ্য পরিবহন হয়, ইঞ্জিনচালিত সরু নৌকা পাহাড়ি স্রোত ঠেলে এগোয়। বান্দরবান শহর গড়ে উঠেছে সাঙ্গুর তীরে। নদীর পলিসমৃদ্ধ জমিতে ধান–সবজি চাষ হয়। তবে হঠাৎ বন্যা ফসল নষ্ট করলে দারিদ্র্যের ছায়া নামে।
নব্বইয়ের দশকে বান্দরবান থেকে সাঙ্গু নদীপথে দুইবার রুমা যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম, তখন গাড়ির রাস্তা ছিল না, নৌপথই একমাত্র ভরসা। ওই দশকেই আমিলাইশ থেকে খাগরিয়া ইঞ্জিন নৌকায় মামার বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলাম।
বান্দরবান ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর কৃষি, জীবিকা ও যোগাযোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাঙ্গু। একদিকে এটি জীবন ও অর্থনীতির সম্পদ, অন্যদিকে বর্ষার বন্যা, ভাঙন ও পলি জমার কারণে ঝুঁকির উৎসও। সাঙ্গুর উজান আঁকাবাঁকা ও পাহাড়ি; বর্ষায় প্রবল বৃষ্টির পানি নদীকে স্রোতস্বিনী করে তোলে। কয়েক বছর আগে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে স্মরণকালের বন্যায় বান্দরবান সদরসহ আশপাশ তলিয়ে যায়। নদীর বাঁধ ও পাড় ভেঙে সাতকানিয়ার পুরানগড়, বাজালিয়া, নলুয়া, আমিলাইশ ও চরতীসহ গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়। নদীর ৪৮ কিলোমিটার নাব্য থাকলেও বালু ও পাথর উত্তোলনে তলদেশ ভরাট হচ্ছে।
সাঙ্গুর চিত্রকল্প প্রকৃতির রুক্ষতা ও কোমলতার মিশেল। কোথাও খাড়া পাহাড়ের দেয়াল, কোথাও নুড়িপাথরের বিছানা, আবার কোথাও সবুজ চর। রেমাক্রি–থানচির পথে নৌভ্রমণে চোখ জুড়ায় ঝরনা, গুহা আর আদিবাসী গ্রাম। পর্যটকদের জন্য মারমাদের নৌকায় সাঙ্গু ভ্রমণ রোমাঞ্চকর, তবে ঝুঁকিও আছ্তে বর্ষায় খরস্রোত, শুষ্ক মৌসুমে পাথুরে চরে হোঁচট, নৌকাডুবির আশঙ্কা। সমপ্রতি পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।
সাঙ্গুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর জলজ জীববৈচিত্র্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় সাঙ্গুতে ১০৯ প্রজাতির পাখনাযুক্ত মাছ এবং ১৮ প্রজাতির শেলফিশ মোট ১২৭ প্রজাতি নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে কয়েকটি বিপন্ন ও সংকটাপন্ন। অতীতে গভীর জলে ডলফিনের উপস্থিতির তথ্যও আছে, IUCN–এর প্রতিবেদনেও তা লিপিবদ্ধ হয়েছে।
আজ এই ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য পরিবেশগত চাপের মুখে। মোহনা অঞ্চলের সামপ্রতিক গবেষণায় পলি জমা, জলপ্রবাহের পরিবর্তন ও দূষণের কথা উঠে এসেছে। সাঙ্গুকে কেবল পানি প্রবাহের পথ হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যে জীবন্ত সেতু যার বুকে মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জলজ প্রাণের আবাস বহমান।
একসময় সাঙ্গু ছিল মাগুর, রুই, কাতলার অভয়ারণ্য। আজ বালু উত্তোলন, পাথর খনন ও বন উজাড়ে গতিপথ বদলেছে। পাহাড়ি ঢলের পলিতে নাব্যতা হারাচ্ছে। থানচি সড়ক যোগাযোগ বাড়ালেও বৃক্ষনিধনে ভূমিক্ষয় বেড়েছে। জুম চাষও আংশিক দায়ী। চিতাবাঘ, বনমোরগ, হরিণের দেখা এখন বিরল।
তাই সাঙ্গুর টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, বনায়ন, নদী খনন ও পর্যটন নিয়ন্ত্রণই পারে নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে। স্থানীয় সমপ্রদায়ের অংশগ্রহণে ইকো–ট্যুরিজম গড়ে তোলা যায়। নিরাপদ নৌপরিবহন, লাইফগার্ড নিয়োগ ও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ সাঙ্গু শুধু নদী নয় এটি বান্দরবানের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সাক্ষী।
সাঙ্গু বাংলাদেশের ভূগোলের এক জীবন্ত মহাকাব্য। পাহাড়ের গহীন থেকে সাগরে মিশে যাওয়া এই ধারা বহন করে চলেছে মারমা জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের কাহিনি, সংগ্রাম আর স্বপ্ন। নদীটি বাঁচানো মানে একটি সমপ্রদায়ের অস্তিত্ব, একটি অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য ও দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক












