শারদে অকাল বোধন

উত্তম কুমার শর্মা | বৃহস্পতিবার , ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ

বোধন অর্থ জাগরণ। অকাল বোধন মানে অসময়ে জাগরিত করা। শরতে ঘুমন্ত দেবীকে ভক্তি দিয়ে, পূজার মাধ্যমে জাগরিত করে সফলতা লাভ করেছেন রঘুনন্দন অবতার রূপী রাজা শ্রীরাম। সনাতন ধর্মের শাস্ত্র মতে, বেদ, রামায়ণ ও পুরাণে উল্লেখ আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে দেবতাদের দিন হলো মানুষের এক বছরের ছয় মাস, আর রাত্রি হলো বাকি ছয় মাস। এই দিনকে বলা হয় শুক্লপক্ষ, উত্তরায়ণ, আর রাত্রি হলো কৃষ্ণপক্ষ, দক্ষিণায়ন। যা শ্রীমদ্ভগবদ্‌ গীতার অষ্টম অধ্যায়ের ৮.২৪ ও ২৫ শ্লোকে উল্লেখ আছে।

সনাতন ধর্মের শাস্ত্র মতে, পৃথিবীর সৃষ্টি, স্থিতি, লয় হিসাব করে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি নামে চার যুগের নাম রয়েছে। যা বেদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ ও গীতায় বর্ণিত আছে। প্রত্যেক যুগের কথা স্মৃতি, শ্রুতি জ্ঞানের মাধ্যমে আহরণ করে ঋষিগণ বেদ, পুরাণ, উপনিষদ, ভাগবত, গীতার মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

শ্রীশ্রী চণ্ডী কাহিনি মতে, মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবী মাহাত্ম্যে উল্লেখ আছে, সত্য যুগে প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের রাজধানী বলিপুরে (বর্তমানে পশ্চিম বঙ্গের বোলপুর শহর) চন্দ্রবংশীয় সুরথ নামে প্রজাবৎসল, দক্ষ ও জ্ঞানী সুশাসক রাজা ছিলেন। কিন্তু কিছু আত্মীয়–স্বজন, সভাসদ এবং সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতায় রাজ্য দখল করে রাজাকে বনবাসে পাঠিয়ে দেয়। রাজা অসহায় হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণে বর্তমান বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা পাহাড়ে মেধস মুনি নামে একজন ঋষির আশ্রমে আশ্রিত হন। সে বনে তাঁর সাথে সমাধি বৈশ্য নামে পরিবার থেকে বিতাড়িত একজনের পরিচয় হয়। দু‘জনেই ঋষির সাথে আশ্রমবাসী হয়। কিন্তু তাদের মনে শান্তি ছিল না, তাই দু‘জনেই ঋষি মেধসের নিকট জানতে চাইলেন কী করলে তাদের মনে শান্তি আসবে এবং কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাবে। ঋষি মেধসের পরামর্শে তারা দু‘জন নদীর তীরে তিন বছর মা মহামায়ার কঠিন তপস্যার পর মাটির প্রতিমা গড়ে পূজা করলেন। তাদের তপস্যায় ও পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে মা মহামায়া দেবী দুর্গা রূপে দেখা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। দেবী দুর্গার কল্যাণে রাজা সুরথ তার রাজ্য ফিরে পেলেন, সমাধিকে তত্ত্বজ্ঞান দান করে আশ্রমের সেবা করার নির্দেশ দিলেন। সেই সময় ছিল বসন্তকাল যা দেবতাদের দিন, উত্তরায়ণ। এই প্রথম পৃথিবীতে শ্রীশ্রী দুর্গা পূজার প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। ভারতবর্ষে ও বাংলায় ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে এ পূজা উদযাপন করা হয়।

রামায়ণে বর্ণিত মতে, ত্রেতা যুগে অযোধ্যার রাজা রাম পিতৃপ্রতিজ্ঞা পালনে, স্ত্রী সীতা ও ছোট ভাই লক্ষ্মণ সহ বনবাসে গেলেন। একদা সেই অশোক বনে লঙ্কার রাজা রাবণের বোন শূর্পণখা প্রমোদ ভ্রমণে এসে কাঠুরিয়া বেশী সুদর্শন যুবক লক্ষ্মণকে বিয়ে করতে চাইলে, লক্ষ্মণ ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করছেন বললেও মানতে রাজি হলেন না রাজকন্যা শূর্পণখা। তাতে রাজকুমারী অপমান বোধ মনে করে লক্ষ্মণকে আক্রমণ করলেন, সে বনে খণ্ড যুদ্ধে শূর্পণখার নাক কাটা পড়ল। এ খবরে লঙ্কার রাজা রাবণ ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের খুঁজতে অশোক বনে এসে রাম, লক্ষ্মণকে না পেয়ে দেবী সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে গেলেন এবং প্রচার করলেন যুদ্ধ ছাড়া সীতাকে ফেরত দেবেন না। রাবণ ছিল দেবী মহামায়ার বরপ্রাপ্ত অজেয় যোদ্ধা। মহামায়ার আদেশ ব্যতীত রাবণকে হত্যা করা অসম্ভব ছিল। এছাড়াও রাবণ শিবের একনিষ্ঠ উপাসক ছিলেন। সীতা দেবীকে উদ্ধারের জন্য রাম লক্ষ্মণ দুই ভাই, হনুমান ও বানর সেনা নিয়ে লঙ্কা আক্রমণ করলেন। কিন্তু ক্রমে অজেয় রাবণের সাথে যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসল। কারণ মহাযোগী, ধ্যানী রাবণ মহামায়া ও শিবের পরম ভক্ত এবং দেবী দুর্গার বরপ্রাপ্ত ছিলেন। দেবী দুর্গার আদেশ ছাড়া রাবণকে বধ করা সম্ভব নয়। তখন পরম পিতা ব্রহ্মা দৈববলে রামকে দেবী দুর্গার পূজা করতে বললেন এবং রাবণের ভাই বিভীষণের পরামর্শে ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে পূজা করতে হবে। হনুমান ১০৮টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে আনলেন কিন্তু দৈব পরীক্ষায় ১টি পদ্ম কমে গেলে রাম নিজের নীল চক্ষু দান করতে উদ্যত হলে, দেবী দুর্গা প্রসন্ন হয়ে সাক্ষাৎ দিয়ে সীতা উদ্ধার ও রাবণ বধের অনুমতি দান করেন। রাবণকে প্রদেয় বরে উল্লেখ ছিল যে কোনো নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ও অন্যায় আচরণ করলে বর ফলবে না। (উল্লেখ্য যে, রাবণ তপস্বিনী বেদবতী, অপ্সরা রম্ভা, অপ্সরা পুঞ্জিকস্থলাকে লাঞ্ছিত করেন পরিশেষে সীতা দেবীকে অপহরণ)।

অবতার রূপী ভগবান রাম শরৎকালে, দেবতাদের রাত্রিবেলা দক্ষিণায়ন সময়ে নবরাত্রিতে বেলতলায় শিবের আরাধনায় অকাল বোধন বা দেবতাদের জাগরিত করে শ্রীশ্রী দুর্গা মায়ের পূজা শুরু করেন। ভগবান শ্রীরাম কর্তৃক এই পুণ্য তিথিতে শরৎকালে দুর্গা পূজার আয়োজন করেছেন হেতু পরবর্তীতে বঙ্গীয় সমাজ ব্যবস্থায় রাজা ও জমিদারেরা শরৎকালে অকাল বোধনে শারদীয় দুর্গা পূজার প্রচলন করেন।

বাংলার ইতিহাসে ১০৮০ শতকের শেষের দিকে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ তার কুল পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রীর নির্দেশনায় প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। তখন থেকে শুধু রাজারা এবং জমিদারগণ নিজের ও প্রজাদের মঙ্গলের জন্য শরৎকালে শারদীয় দুর্গাপূজা, বসন্তকালে বাসন্তী পূজা আড়ম্বরভাবে করতেন। ১৭৯০ সালে পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় ১২ জন বন্ধু চাঁদা তুলে সর্বপ্রথম বারোয়ারি বা সার্বজনীন দুর্গাপূজা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুরে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্গাপূজা ব্যাপক সাড়া পায়। বর্তমানে শরৎকালে বাঙালি হিন্দুরা ব্যাপক আড়ম্বরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করে থাকে। কোথাও কোথাও নবমী তিথিতে রাবণ বধের অনুষ্ঠান করে রাম নবমী উদযাপন করা হয়। রাবণের ক্ষমতার দম্ভ, নারী নির্যাতন ও আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে রামের জয় মানেই অশুভ শক্তির বিপক্ষে, শুভ শক্তির জয় অনিবার্য।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক ট্রাস্টী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও অধ্যক্ষ, মহাশক্তি সংস্কৃত কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবেলা অবেলায়
পরবর্তী নিবন্ধসাঙ্গুর জীববৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতি