বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রাম মহানগরীর পক্ষ থেকে বহুজাতিক অনলাইন খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার একতরফা–বৈষম্যমূলক অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম রেস্তোরাঁ সমিতির পক্ষ থেকে ফুডপান্ডার অনিয়ম ও এক তরফা বৈষম্যমূলক হয়রানি রোধে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির সভাপতি মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন নওশাদ ও সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক। এসময় চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক লিখিত বক্তব্যে অনলাইন খাবার সরবরাহ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অনলাইন ফুড ডেলিভারি খাতের জন্য একটি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করার দাবি জানান। যাতে বহুজাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বৈষম্যের শিকার না হন।
সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের বাইরে নানা ধরনের চার্জ, জটিল হিসাব, অর্ডার বাতিলের লোকসান, অপেক্ষার মাশুল, একতরফা জরিমানা ও রিফান্ডের নামে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ করা হয় অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে।
রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার কাছে খাবার বিক্রির টাকা পেতেও ১৩ দিন বা তার বেশি সময় লাগছে। এতে একদিকে বাড়ছে ব্যবসার খরচ, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে মুনাফা। এমন পরিস্থিতিতে ফুডপান্ডার একতরফা ও অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তাদের দাবি, কমিশনসহ সব ধরনের চার্জ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁগুলোতে ফুডপান্ডার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে অর্ডার গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষ থেকে ফুডপান্ডার অনিয়ম ও এক তরফা বৈষম্যমূলক হয়রানি রোধে যে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে তা হল– কমিশনের বাইরে সব ধরনের অতিরিক্ত চার্জ বাতিল, সহজ ও স্বচ্ছ খাতওয়ারি হিসাব দেওয়া, রেস্তোরাঁর দোষ ছাড়া অর্ডার বাতিল হলে খাবারের সম্পূর্ণ খরচ বহন, রাইডার বিলম্বে খাবার সংগ্রহ করার কারণে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করেন তার খেসারত ও জরিমানা মালিকের ওপর চাপানো বন্ধ করতে হবে, অভিযোগ যাচাই ও রেস্তোরাঁর বক্তব্য না শুনে অর্থ কর্তন বন্ধ এবং সর্বোচ্চ সাতদিনের মধ্যে বিক্রির টাকা পরিশোধ।
দাবি না মানলে ফুডপান্ডা পুরোপুরি বয়কটের হুঁশিয়ারি :
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানিয়েছে, ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ তাদের দাবিগুলো মেনে না নিলে চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁ মালিকেরা সম্মিলিতভাবে এ প্ল্যাটফর্মে অর্ডার গ্রহণ স্থগিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ করার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।
রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার সঙ্গে চুক্তিতে নির্ধারিত কমিশনের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট চার্জ, অপেক্ষার মাশুল, কমিশনের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ট্যাব ফি ও ইন্টারনেট ফিসহ বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়া হয়। ফলে কাগজে–কলমে বিক্রি ভালো দেখালেও সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকছে সামান্য অর্থ। এসব চার্জের বিস্তারিত হিসাবও সহজে বোঝা যায় না বলে দাবি তাদের।
মালিকদের অভিযোগ, মাস শেষে ফুডপান্ডার পাঠানো হিসাব এতটাই জটিল যে কোন খাতে কত টাকা কাটা হয়েছে, তা বুঝতে হিমশিম খেতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিসাবের খাত ও কর্তনের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এতে নিজেদের বিক্রি, কমিশন ও প্রকৃত আয় যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকরা অভিযোগ করে বলেন, ফুডপান্ডার প্রযুক্তিগত সমস্যা কিংবা খাবার সরবরাহের ব্যবস্থাপনায় জটিলতার কারণে অর্ডার বাতিল হলেও এর আর্থিক দায় নিতে হয় রেস্তোরাঁ মালিকদের। একটি অর্ডার পাওয়ার পর খাবার তৈরিতে কাঁচামাল, শ্রম ও সময় ব্যয় হয়। কিন্তু খাবার তৈরি হয়ে যাওয়ার পর অর্ডার বাতিল হলে সেই খাবার অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা সব সময় সম্ভব হয় না। এতে খাবারের পুরো খরচই লোকসানে পরিণত হয়।
তাদের আরও অভিযোগ, সরবরাহকর্মী বা রাইডার দেরিতে খাবার সংগ্রহ করলে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করেন। অথচ এ ধরনের পরিস্থিতিতেও রেস্তোরাঁকে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। যে বিলম্বের জন্য রেস্তোরাঁ দায়ী নয়, তার খেসারতও কেন রেস্তোরাঁ মালিকদের দিতে হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না শুনেই পাওনা টাকা থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, ফুডপান্ডার মাধ্যমে বিক্রি হওয়া খাবারের টাকা পেতে ১৩ দিন বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অথচ রেস্তোরাঁ চালাতে প্রতিদিনই কর্মচারীদের বেতন, দোকানভাড়া, কাঁচামাল কেনা, বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খরচ মেটাতে হয়। বিক্রির টাকা দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে চলতি মূলধনের সংকট তৈরি হয়। এতে নিয়মিত ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম (ফুডি) গুলো মাত্র ১৫ শতাংশ (অল ইনক্লুনিভ) সমন্বিত কমিশনে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান যদি লাভজনক ভাবে ব্যবসা করতে পারে, তবে ফুডপান্ডার ক্ষেত্রে কমিশনের বাইরে এত ধরনের চার্জ কেন থাকবে? তাদের শোষণমূলক ও অতিরিক্ত কমিশন নীতি কেন রেস্তোরাঁ মালিকদের ওপর বলবৎ থাকবে তা প্রশ্ন রাখেন সমিতির নেতারা।
তারা সব চার্জ কমিশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশন নির্ধারণ করার দাবি জানান।












