ষাটের দশকের পৃথিবী। গানের জগতে বিস্ময়কর উত্থান হলো একটি সংগীত দলের। নাম, দি বিটলস্। ইংল্যান্ডের লিভারপুলের এই সংগীতের দলটি সংগীত ভুবনে আজও নস্টালজিক হয়ে আছে। সময়ের আবর্তে এই দলটি আজ আর নেই। যাঁরা ছিলেন এই দলে, তাঁরাও নেই। কিন্তু কী অদ্ভুত, দি বিটলস্–এর গানের কথা বললেই উন্মাদনায় ভাসে আজও সংগীতানুরাগীরা। ষাট ও সত্তর দশকে তো “বিটলম্যানিয়া”–য় আক্রান্ত হয়েছিল সারাবিশ্ব। সেই ঝাঁকড়া চুলের জন লেনন, জর্জ হ্যারিসন, পল ম্যাককার্টনি, রিঙ্গো স্টার। “দি বিটলস” বৃটেনের সংগীত দল হলেও আমেরিকানদের মন জয় করে নিয়েছিল গানে– স্টাইলে–চলনে–বলনে। সে এক উত্তাল ঢেউয়ে “দি বিটলস্” ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বহুদূর।
সারা বিশ্বেই “দি বিটলস” নিয়ে বহু ভাষায় বই লেখা হয়েছে। নিবন্ধ–প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। এই দলের সাথে যুক্ত সংগীত শিল্পীদের নিয়ে আলাদা লেখা হয়েছে। লিভারপুলের সংগীতের এই দলটিকে নিয়ে কেন এতো মাতামাতি? এই প্রজন্মের কাছে প্রশ্ন জাগতে পারে.. যারা সবে সংগীতের দল গড়েছে। কিংবা গান শুনতে পছন্দ করছেন। এমন অবস্থানে যারা আছেন, কিংবা বিটলস সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য একটি প্রয়োজন এমন বইয়ের, যা পাঠে সবই জানা যাবে। এমনই এক বই লিখেছেন সুহৃদ স্বাগত– “The Beatles : পৃথবীকে যারা বলেছিল গান গাইতে”।
সুহৃদ স্বাগতও একজন গান পাগল। গান নিয়ে ভাবেন। গবেষণা করেছেন। বিটলস–কে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই একখানা বই–ই লিখে ফেললেন। কেন বিটলস? এমন প্রশ্ন আমার মনে জেগেছিল। উত্তরও পেলাম ভূমিকায়। সুহৃদ স্বাগত লিখেছেন: “বিটলস্–এর গান ভাবতে শেখায়। অতীত কত সুন্দর তা বুঝতে শেখায় এবং পৃথিবী থেকে কীভাবে আমরা সমস্ত সৌন্দর্য শুষে নিয়ে তাকে এক নির্মম, যান্ত্রিকতায় পরিণত করছি তা অনুধাবন করতে শেখায়।” একজন সংগীতপ্রেমী কতোটা আত্মস্থ করলে পর এমন উদারচিন্তায় নিজের কথা বলতে পারেন। ষাটের দশকে গড়ে ওঠা ‘দি বিটলস্’–এর গানের কথা, সুর ও গায়কী অসাধারণ অনুভূতি এনে দেয় বলেই আজও সারাবিশ্বে এর ব্যাপক আলোচনা।
১৯৬০ সালে গড়ে ওঠা ‘দি বিটলস্‘ কীভাবে এত পরিবর্তন ও প্রভাব রেখেছিল, সেই বিষয়ে সুহৃদ লিখেছেন: “গত ছয় দশক ধরে বিটলস্ সামষ্টিক, জাতিগত এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোটি মানুষের মনে তাদের গান নিয়ে জায়গা করে আছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক ঝড়ো সময়ে তাদের উত্থান। তাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটিশ এবং ইউরোপীয় সমাজ থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকার হিপ্পি আন্দোলনকেও এই ব্যান্ড প্রভাবিত করতে পেরেছিল তাদের দর্শন এবং সাবলীল জীবনবোধ দিয়ে। আধুনিক মিউজিক ভিডিও নিয়ে কাজ করা প্রথম ব্যান্ড বিটলস্। গানের ভিডিওচিত্র তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে বহুগুণে সাহায্য করেছিল।” (পৃ: ৩৪)
“The Beatles : পৃথিবীকে যারা বলেছিল গান গাইতে”– এই বইটি বাংলাদেশে প্রকাশিত গানের দল প্রকাশিত প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র বই। খুব যত্ন ও নিষ্ঠার সাথে তথ্য সংগ্রহ করেছেন লেখক সুহৃদ স্বাগত। তার বিটলস্–এর প্রতি ভালোলাগা, সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার কারণগুলো যেমন বিশ্লেষণ করেছেন, তেমনি দলের সাথে যুক্ত সদস্যদের জীবনের নানান দিক নিয়ে লিখেছেন। আর তাই ব্যাপক পরিসরে বিটলস্–কে জানার সুযোগ হয়ে ওঠে এই বই পাঠে।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও গায়ক নকীব খান আমায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: “গানের Lyrical Value যত সমৃদ্ধ হবে, মানুষের মনে তা গেঁথে থাকবে দীর্ঘসময়।” The Beatles নিয়ে এই বইটি পাঠ করতে গিয়ে নকীব খানের এই কথার সত্যতা খুঁজে পেলাম। ১৯৬৪ সালে পল ম্যাককার্টনির লেখা গান:
I give her all my love
That’s all I do
And if you saw my love
You’d love her too.
I love her
She gives me everything
And tenderly
The kiss my lover brings
She brings to me.
And love her ( সংক্ষিপ্ত)
And love her গানটি পল লিখেছেন তাঁর প্রেমিকা জেন অ্যাশারের বাড়ির ছোট্ট মিউজিক রুমে বসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, গানটি তার প্রেমিকাকে নিয়ে লেখেননি পল। শাশ্বত প্রেম নিয়েই লেখা এই গান। কিন্তু বিটলস্ এর কালজয়ী গানের তালিকায় এটি স্থান লাভ করেছে।
তেমন আরেকটি তুমুল জনপ্রিয় গান–Yesterday
Yesterday all my troubles seemed so far away
Now it looks as though they’re here to say
Oh, I believe in yesterday.
Suddenly, I’m not half the man I used to be
There’s a shadow hanging over me
Oh, yesterday came suddenly.
Why she had to go
I don’t know, she wouldn’t say
I said something wrong
Now I long for yesterday.. (সংক্ষিপ্ত)
বলা হয়ে থাকে পল ম্যাককার্টনির লেখা, সুরে ও গাওয়া এই গানটি স্বপ্ন থেকে পাওয়া একটি সুরের উপর তৈরি। এই গানটির কথা এতো সমৃদ্ধ যে, কালজয়ী হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে লেখক সুহৃদ স্বাগত লিখেছেন: “বিটলস্–এর গানের কথা সহজ, সরল এবং স্পষ্ট। এখানে দুর্বোধ্যতার কোনো বিষয় নেই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে লেখায় গভীরতা নেই। সহজ, সৃষ্টিশীল, প্রবল ভাবাবেগ এবং গভীর জীবনবোধের এক অনন্য সমন্বয় বিটলস্–এর গানে পাওয়া যায়।” (পৃ:৩৯)
একটি দলে জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, জর্জ হ্যারিসন এবং রিঙ্গো স্টারের মতো সংগীতজ্ঞরা থাকলে, দল কী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো-The Beatles। এই প্রসঙ্গে লেখকের পর্যবেক্ষণ উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছেন: “তারুণ্য তার প্রাণশক্তির পরিপূর্ণতা দিয়ে যখন বিশ্বজয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সকল সামাজিক আগাছা, অবিমৃষ্যকারীতাকে এক হাত দেখে নেবে বলে শপথ নিয়েছে–সেই সময়টাতেই দ্য বিটলস্ এর আবির্ভাব ঘটলো বিশ্বমঞ্চে। পঞ্চাশের দশকে অর্থাৎ এখন থেকে সাত দশক আগের কথা বলছি। সংস্কৃতি, ফ্যাশন বা কোনো স্বতন্ত্র বাহ্যিক স্টাইলে নিজেদের মেলে ধরার মতো উপাদান তারুণ্যের হাতে ছিল না।” ( পৃ:৪৩)
এলোমেলো করে দিয়ে সারাবিশ্বকে নতুনভাবে তারুণ্যের জয়গানে সাজালো তারা। লেখক সুহৃদ আরো লিখেছেন: “তারুণ্য তার নিজের মতো, নিজস্ব ধারায় জীবনকে উপভোগ করতে শেখে। স্থবিরতা ভেঙ্গে নতুনত্ব আনতে পারে সে তার নিজের শক্তিতে। ষাটের দশকের এই তারুণ্যে গানে, ফ্যাশনে, ছন্দে এক নতুন হাওয়া বয়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া যেতে থাকে লিভারপুলের আকাশ জুড়ে। মহাযুদ্ধের ভয়াবহতার রেশ ইউরোপ তখন কাটিয়ে উঠতে লড়ছে, তবুও সেই লড়াইতে কেউ ক্লান্ত নয়। কোন অজানা উৎস থেকে পাওয়া প্রাণশক্তিতে সে প্রস্তুত হচ্ছে নতুন করে শুরু করার। লিভারপুলের এক কবির ভাষায়, “সে যেন ছিল এক ঝড়, বায়বীয় বিদ্যুতর মতো তার আগমন ঘটেছিল!” সেই আশাবাদীতার হাওয়ার তোড়ে ভেসে এলো দ্য বিটলস্। এমন তারুণ্য পৃথিবী কখনও দেখেনি আগে!” (পৃ:৪৪)
পরিশেষে বলতে পারি “The Beatles : পৃথিবীকে যারা বলেছিল গান গাইতে” বইটি নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান বই, যে বই সকল সংগীতানুরাগী, বিটলস্ আগ্রহীদের অনেক অজানা তথ্য জানতে সহায়তা করবে। কারণ, বইতে আছে বিটলস্–এর দুষ্প্রাপ্য অনেক ছবি, গান ও ইতিহাস।
বইটি প্রকাশ করেছে আরেক সংগীত শিল্পী ও প্রকাশক জয় শাহরিয়ার, তার আজব প্রকাশ থেকে। বইটির সাফল্য কামনা করি।









