এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প এবং ওয়াসার স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চট্টগ্রাম মহানগরীতে কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। কোথাও দোকানপাট ভেঙে তৈরি করা হচ্ছে র্যাম্প, কোথাও সড়কের উপর গর্ত করে সরানো হচ্ছে ইউটিলিটি লাইন, কোথাও সড়ক কেটে বসানো হচ্ছে স্যুয়ারেজের পাইপ, কোথাও খাল সংস্কার ও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের জন্য সড়কের একটি অংশে যান চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও পুরনো স্থাপনা ভেঙে জায়গা তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু কাজগুলোর গতি এবং যথাযথ সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। একইসাথে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একাংশ বন্ধ রেখে দিনের পর দিন কাজ চলায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পয়েন্টগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। কোনো কোনো স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে একদিকে নগরবাসী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুফল, জলাবদ্ধতা ও স্যুয়ারেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস পাচ্ছেন, অন্যদিকে চলমান কাজের কারণে প্রতিদিন অসহনীয় যানজট ও ভোগান্তি মোকাবেলা করছেন।
লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণ নিয়ে অনেকদিন ধরে ভুগছেন নগরবাসী। বর্তমানে ইপিজেড, আগ্রাবাদ ও জিইসি মোড় থেকে ওয়াসা এলাকায় র্যাম্প নির্মাণের কাজ চলছে। আগ্রাবাদ ও ইপিজেড এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জিইসি মোড়ের র্যাম্পে সিটি কর্পোরেশন লাইটপোস্ট না সরানোর ফলে এটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ওয়াসা মোড় পর্যন্ত সারাদিন যানজট লেগে থাকে।
নগরীর লাভলেইন ও জুবিলি রোডে অনেকদিন ধরে চলছে ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ। একাধিক পয়েন্টে রাস্তার একটি বড় অংশ টিনের ঘেরা দিয়ে বন্ধ করে রাখায় যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যস্ত এই সড়কে স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। নগরীর আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একই সময়ে রাস্তায় এই প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে। কাজের গতি প্রত্যাশা স্পর্শ করতে পারেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলেছেন, লাভলেইন থেকে তিন পুলের মাথাসহ সন্নিহিত এলাকার যানজট এখন ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। শহরে ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্পটির আওতায় ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ কিলোমিটার পয়ঃপাইপলাইন, ২৮ হাজার গৃহসংযোগ এবং দৈনিক ১০ কোটি লিটার ক্ষমতার পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যে ৭৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ওয়াসা জানিয়েছে, ২০২৭ সালে প্রকল্পটি চালু হলে নগরীর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ প্রথমবারের মতো আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনের সবচেয়ে বড় প্রকল্পটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদও দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বাকি খালগুলোর কাজ চলমান। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯৫ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কাতালগঞ্জে একটি ১০ তলা ভবন ভাঙার কাজ চলছে। হিজড়া খালকেন্দ্রিক জলাবদ্ধতা নিরসন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা অপসারণের কারণে কাতালগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, প্রবর্তক মোড়, চকবাজারসহ আশপাশের এলাকায় যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে। এর আগে হিজড়া খালের সংস্কারকাজে ১৩৫টি ভবন ভাঙার কথা জানিয়েছিল সিডিএ।
স্থানীয়রা বলেছেন, সামগ্রিকভাবে নগরীর সড়কব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্থবিরতা। উন্নয়নকাজ চলাকালে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও জনদুর্ভোগ কমানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, সড়কের একটি বড় অংশ বন্ধ করার আগে বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করা, কাজের অংশ দ্রুত শেষ করে সড়ক খুলে দেওয়া, একাধিক সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় করা এবং রাত–দিন কাজের সময়সূচি নির্ধারণ করে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করা হলে নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ত না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরে একই সময়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘রোড কাটিং ম্যানেজমেন্ট’ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। কোন সড়কে কখন কাজ হবে, কতদিন সড়ক বন্ধ থাকবে, কতটুকু অংশ বন্ধ রাখা যাবে, বিকল্প যান চলাচলের পথ কী হবে–এসব আগেভাগে নির্ধারণ করে কাজ শুরু করা হলে নগরবাসী উপকৃত হতো। উন্নয়ন কাজ চলছে এমন পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বাড়ালেও নাগরিক দুর্ভোগ বহুলাংশে কমে আসত।
তারা বলেন, উন্নয়নকাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। চাই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সর্বোচ্চ কানেক্টিভিটি। কিন্তু একইসাথে সকল কাজ যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় সেই প্রত্যাশাও রাখি। যদি বছরের পর বছর ধরে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত করে উন্নয়ন কার্যক্রম চলে, কাজের ধীরগতির কারণে প্রতিদিন মানুষের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা–বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাহলে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়ে, আস্থায় টান পড়ে এবং নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।
লাভলেইন, এনায়েত বাজার, বিমান অফিস, কাতালগঞ্জ, প্রবর্তক মোড়, পাঁচলাইশ, চকবাজার, জিইসি মোড়, আগ্রাবাদসহ সন্নিহিত এলাকার সড়কগুলো ব্যস্ত সড়ক হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় একটি সড়কের অংশ বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব আশপাশের অনেক সড়কে পড়ে। ফলে একটি নির্মাণস্থলের যানজট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্য পয়েন্টে। কোথাও সড়কের প্রস্থ কমে যায়, কোথাও এক লেন দিয়ে দুই দিকের যানবাহন চলাচল করতে হয়। আবার কোথাও রিকশা, টেঙি, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন একই সংকুচিত জায়গায় আটকে যায়। এতে স্বাভাবিক যান চলাচল ভেঙে পড়ে।
যেসব এলাকায় কাজ চলছে সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে দ্রুত সড়ক উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।












