চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: প্রিয় ক্যাম্পাস

ড. শামসুদ্দীন শিশির | মঙ্গলবার , ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, শিক্ষা আর সৌন্দর্যের এক অপার মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেওয়া জনপদের নাম চট্টগ্রাম। এখানে আকাশ, পাহাড় আর সমুদ্র যেন মানুষের মতোই সহাবস্থান করেকখনো মেঘের কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে গল্প বলে, কখনো সমুদ্রের ঢেউয়ে স্বপ্ন ছুঁয়ে যায়, আবার কখনো সবুজ পাহাড় ইশারায় ডাক দিয়ে যায়। প্রকৃতি আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এমন মেলবন্ধন বাংলা ভূখণ্ডে খুব কমই দেখা যায়। সেই অপার মুগ্ধতার চট্টগ্রাম জনপদকে ১৬৬৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা ঘোষণা করে। জেলার জন্মের সেই মুহূর্তটিই হয়তো ভবিষ্যতের বিশাল শিক্ষাকেন্দ্রের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল সেদিন।

সময় বয়ে চলে আপন গতিতে। তারই তিনশো বছর পর, ১৮ নভেম্বর ১৯৬৬ সালে তৎকালীন সরকার এই জেলার বুকেই প্রতিষ্ঠা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, আলোকিত মানবিকতায় সমৃদ্ধ করতে পুরো অঞ্চলের মানুষকে। পাহাড়বেষ্টিত সবুজের গহীনে ২,৩১২ একর বিস্তৃত জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠে জ্ঞানচর্চার এই অনন্য পাদপীঠ। সূচনা ছিল নিভৃত কিন্তু স্বপ্ন ছিল সীমাহীন। আগামী ১৮ নভেম্বর ২০২৬ প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ছয়টি দশক পেরিয়ে যাবে।

শুরুটা ছিল মাত্র ৪টি বিভাগ, ৭ জন শিক্ষক ও ২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে। ওই অল্প মানুষদের হাত ধরেই শুরু হয় বড় কিছু হওয়ার যাত্রা। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে উঠল বটবৃক্ষের মতোমজবুত কাণ্ড, দিগন্ত ছোঁয়া শাখাপ্রশাখা। আজ এখানে ১০টি অনুষদ, ৫৫টি বিভাগ, ৮টি ইনস্টিটিউট এবং ২৬৬৭৮ জন শিক্ষার্থীর বৃহৎ, প্রাণবন্ত, সরব এক ক্যাম্পাস। এদের জন্য রয়েছে ১৪ টি হল এবং একটি হোস্টেল। আছেন জ্ঞানে ঋদ্ধ ১০১০ জনের অধিক শিক্ষক। ৪৪৫ জন কর্মকর্তা, ৫৩৯জন তৃতীয় শ্রেণির এবং ১০৫৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।

প্রতি বছর নতুন স্বপ্ন নিয়ে হাজারো মুখ আসছে, আবার সাফল্যের পথে যাত্রা করে হাজারো মুখ বিদায় নিচ্ছে। বর্তমান পৃথিবী প্রতিযোগিতার। শুধু পরীক্ষায় পাস করে নয়; বিষয়কে গভীরভাবে বোঝা আর গবেষণার চর্চা করা এখন অপরিহার্য। যত বেশি শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান বাড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামও তত দ্রুত উজ্জ্বল হবে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বানবিষয়ের গভীরে ডুব দাও, বিষয় সম্পর্কিত অন্যান্য জ্ঞানেও নিজেকে সমৃদ্ধ করো। স্বপ্নের সারথিরা যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না পড়েএই দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের, শিক্ষকের, শিক্ষার্থীর; আমাদের সবার।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ইনস্টিটিউট রয়েছে সেগুলো হলোশিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, চারুকলা ইনস্টিটিউট, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, কমিউনিটি অফথমোলজি ইনস্টিটিউট, বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাতীয় কবি নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ভৌতবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম গবেষণা ইনস্টিটিউট। আগামীদিনগুলোতে আরো বিভাগ বাড়বে, ইনস্টিটিউট বাড়বে সেটা আনন্দের কথা; একই সাথে মানসম্মত শিক্ষকও বাড়ুক সেটাই আমাদের কাম্য। বিভাগ, ইনস্টিটিউট খোলার আগেই মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের বন্দোবস্ত হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি বাড়ুক। দেশের শীর্ষ স্থানে ওঠে আসুক আমাদের গর্বের প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যারা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেনতাঁদের প্রত্যেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি। তাদের নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম ও দিকনির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়কে বর্তমান অবস্থানে এনেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রফেসর ড. এ আর মল্লিক (০১.১০.১৯৬৬) থেকে শুরু করে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আল ফোরকান পর্যন্ত সবাই নিজেদের সময় ও সক্ষমতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রত্যেকের আমলই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়অবকাঠামো উন্নয়নে, কেউ শিক্ষার বিস্তারে, কেউ প্রশাসনিক সংস্কারে, আবার কেউ গবেষণাউদ্যোগে রেখেছেন দৃষ্টান্তমূলক অবদান। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এ লেখায় জুলাই ২৪ এ শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন এর আত্মার শান্তি কামনা করছি। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে জুলাইআগস্টে আহত সকল শিক্ষার্থীদের জন্য শুভ কামনা। ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেকগুলো ইতিবাচক, স্মরণীয় কাজ করেছেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শহীদ শিক্ষার্থীদের নামে হলের নামকরণ, সমাবর্তন আয়োজন, চাকসু নির্বাচন, ক্যাম্পাসে ইকার চালু, স্যাটেলাইট কেন্দ্র স্থাপন, কমন গুডস প্রকল্প, হলগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা, ব্যাংকিং চালু, প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন বিভাগের সেমিনার সিম্পোজিয়াম এর আয়োজন। গৃহীত অন্যান্য শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানউন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যেমনমানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি প্রশংসার দাবি রাখে। এইসব অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা স্মরণযোগ্য।

আমরা আশা করি শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে, সেশনজট নিরসনে, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায়, প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহে, পাঠ্যক্রম হালনাগাদ যুগোপযোগীকরণে, শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধকরণে, কর্মকর্তাকর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানে, শিক্ষকদের দেশবিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকরণে, প্রতিটি বিভাগ থেকে গবেষণা পত্রিকা প্রকাশনে, শিক্ষকশিক্ষার্থীদের জন্য প্রণোদনা প্রদানে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

উল্লেখ্য, শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অনেক বেশি গবেষণায় উদ্বুদ্ধকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করার আন্তরিক অনুরোধ করছি। প্রয়োজনে গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাকর্ম কীভাবে সম্পাদন করা হয় সে বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা হোক। পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আমাদের স্বপ্নের সারথি, আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাস, আমাদের প্রাণ স্পন্দন, আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সুনামসুখ্যাতি অর্জন করুকসেই প্রত্যাশাই রাখছি।

লেখক:, প্রাবন্ধিক, শিক্ষা চিন্তক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের নাট্যপত্রিকার পরিচয়
পরবর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডের ঝরনা