চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক আলোর দেখা যেভাবে

ইসমাইল জসীম | বৃহস্পতিবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

একসময় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের দিনও যেন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসত। কর্ণফুলীর বুকে তখনও নৌকার আনাগোনা, ঘাটে পণ্য ওঠানামা, সদরঘাটের পথে মানুষের ব্যস্ত পদচারণা সবই চলত; কিন্তু সূর্য অস্ত যাওয়ার পর শহরের চেহারা বদলে যেত। কুপি, প্রদীপ কিংবা হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় ঘরবাড়ি জেগে থাকত, আর পথঘাটের অন্ধকারে রাত যেন আরও গভীর হয়ে উঠত। সেই শহরে বিদ্যুতের আগমন তাই নিছক একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ছিল না; ছিল সময়ের সঙ্গে চট্টগ্রামের সম্পর্ক বদলে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

আজকের চট্টগ্রামকে দেখে সেই সময়ের শহরকে কল্পনা করা কঠিন। একটি সুইচের স্পর্শে ঘর আলোকিত হয়, রাজপথে রাতও দিনের মতো সচল থাকে, বন্দর থেকে শিল্পাঞ্চল সবখানেই বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি। বিদ্যুৎ এখন আমাদের জীবনের এমন স্বাভাবিক অংশ যে তার প্রথম আগমনের বিস্ময়টি প্রায় বিস্মৃত। অথচ একদিন এই অদৃশ্য শক্তিই ছিল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।

চট্টগ্রামে সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ইতিহাসের সঙ্গে কয়েকটি নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁদের মধ্যে তড়িৎ প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল খালেক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রসন্ন কুমার সেন (পি. কে. সেন) বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকাশে চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ শতকের গোড়ার চট্টগ্রাম ছিল এক পরিবর্তনশীল বন্দরনগরী। কর্ণফুলীকে ঘিরে তার বাণিজ্যিক জীবন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিল। জাহাজ আসত, পণ্য নামত, ব্যবসা বাড়ত; সদরঘাট, স্টেশন রোড, ফিরিঙ্গিবাজারসহ শহরের বিভিন্ন অংশে তৈরি হচ্ছিল নতুন অর্থনৈতিক পরিসর। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ছায়ায় থেকেও চট্টগ্রাম নিজের মতো করে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

সেই পরিবর্তনের সময়ের একটি দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল পি. কে. সেনের সাততলা ভবন। ১৮৯০ সালে প্রসন্ন কুমার সেনের নির্মিত এই ভবনটি তৎকালীন চট্টগ্রামের স্থাপত্য ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। স্থানীয় ইতিহাসে এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় যে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর থেকে ভবনটির চূড়া দেখা গেলে নৌযাত্রীরা চট্টগ্রাম শহরের সান্নিধ্য বুঝতে পারতেন। ভবনটি যেন দূর থেকেই জানিয়ে দিত এই শহর বদলাচ্ছে, সামনে এগোচ্ছে।

প্রসন্ন কুমার সেন ছিলেন সেই পরিবর্তনের এক অংশীদার। ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল বিস্তৃত; কিন্তু চট্টগ্রামের বিদ্যুতায়নের ইতিহাসে তাঁর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক আলোর মুখ দেখিয়েছেন যিনি তিনি হলেন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক। তাঁর পুত্র দৈনিক আজাদীর বর্তমান সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল মালেক স্যারের ২৫ সেপ্টেম্বর’২৫ সালের দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত স্মৃতিচারণ ‘আমার বাবা’তে তিনি বলেন

বাবা আইএসসি পাস করার পর দাদা আহমদ মিঞা চৌধুরীর উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় ভর্তি হন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। এটি ভারতের প্রাচীনতম এবং অগ্রণী ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৮৫৬ সাল থেকে এর যাত্রা শুরু। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এটি এখনো সেদেশের একটি অভিজাত শিক্ষাকেন্দ্র। এ কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে স্বর্ণপদকসহ তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন বাবা। এরপর দেশে ফিরে এলেও কোনো চাকরি পেলেন না। কারণ তখনও চট্টগ্রামে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরুই হয়নি। বাবা কিছুদিন শিক্ষকতা করে চলে যান রেঙ্গুন। সেখানে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাকুরিতে যোগ দেন।

কিছুদিন পর বাবাকে রেঙ্গুন থেকে নিয়ে আসেন পি কে সেন। উনারা স্টেশন রোডে জেনারেটরের সাহায্যে সীমিত পরিসরে কিছু ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বাবাকে দায়িত্ব দেয়া হলো চট্টগ্রাম শহরে বিদ্যুৎ প্রচলনে অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং সাপ্লাই কোম্পানির। সেটা গত শতাব্দির ২০ এর দশকের প্রথমভাগ। চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সূচনা সেখান থেকেই। এখন যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, তার সরবরাহ্‌ ব্যবস্থার সূচনালগ্নে আমার বাবার যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তা আমাকে, আমার পরিবারকে গর্বিত করে।” লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের প্রথমভাগের।

বিদ্যুৎ কেবল একটি ধারণা নয়; তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হয় যন্ত্রের মাধ্যমে, তারের মাধ্যমে, হিসাবের মাধ্যমে। কোথায় জেনারেটর বসবে, কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে, কীভাবে তার টানা হবে, কীভাবে সংযোগ দেওয়া হবে, কীভাবে পুরো ব্যবস্থা সচল রাখা হবে এসবের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন ছিল। সেই উত্তর দেওয়ার মানুষ ছিলেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল খালেক।

তাঁর জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি কেবল একটি নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারিক কারিগর ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিকতার একজন সক্রিয় নির্মাতা। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের প্রাথমিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা, পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎচালিত ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা এবং সংবাদপত্র প্রকাশ সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন আলোকে এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে প্রবাহিত হওয়ার গল্প।

স্টেশন রোডের সেই শুরুর দিনগুলোর কথা কল্পনা করলে একটি দৃশ্য ভেসে ওঠে। চারপাশে অন্ধকার শহর। কোথাও একটি জেনারেটর গর্জন করছে। তারের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে চোখে দেখা যায় না এমন এক শক্তি। তারপর একটি ঘরে জ্বলে উঠল একটি বৈদ্যুতিক বাতি। হয়তো আলোটি আজকের মাপকাঠিতে খুব সামান্য। হয়তো তার দীপ্তি কয়েক গজের বেশি দূরেও পৌঁছাত না। কিন্তু ইতিহাসের আলোকে তার উজ্জ্বলতা দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি ছোট্ট প্রদীপও কখনো কখনো একটি দীর্ঘ যুগের সূচনা করে। চট্টগ্রামের বিদ্যুতের ইতিহাসেও সেই প্রথম আলোর তাৎপর্য ছিল এমনই।

১৯২০এর দশকের গোড়াতেই চট্টগ্রামে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছিল। তবে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর ক্ষেত্রে ২৩ মার্চ ১৯২৭ তারিখটি বিভিন্ন লেখায় উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ ১৯২৭ সালকে যদি বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়, তবে তারও আগে যে পরীক্ষামূলক বা সীমিত ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল, সেটিকে ইতিহাসের বাইরে রাখা যায় না।

এখানেই পি. কে. সেন, মোহাম্মদ আবদুল খালেক এবং চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির ভূমিকা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। একজনের ছিল উদ্যোগ ও ব্যবসায়িক সামর্থ্য, অন্যজনের ছিল প্রকৌশল জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা; আর একটি প্রতিষ্ঠান সেই বিচ্ছিন্ন প্রয়াসকে নাগরিক বিদ্যুৎ সরবরাহের কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।

বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে শুধু ঘরের অন্ধকার দূর হয়নি; বদলে যেতে শুরু করেছিল সময়ের ধারণাও। সূর্যাস্তের সঙ্গে দিনের কাজের সমাপ্তি আর অবধারিত রইল না। দোকান, অফিস, কারখানা, ছাপাখানা নগরজীবনের নানা কর্মকাণ্ড রাতের দিকেও প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পেল। একটি বন্দরনগরীর জন্য এই পরিবর্তনের অর্থ ছিল গভীর। ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্পের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।

বিদ্যুৎ তাই কেবল আলো নয়। বিদ্যুৎ ছিল সময়কে নতুনভাবে ব্যবহারের ক্ষমতা। আর এই আলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার দেখা যায় মোহাম্মদ আবদুল খালেকের জীবনে। তড়িৎ প্রকৌশলের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটি পরবর্তীকালে বিদ্যুৎচালিত মুদ্রণশিল্পের বিকাশেও ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস চট্টগ্রামের মুদ্রণজগতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বিদ্যুৎ দিয়ে যে শহরের ঘর আলোকিত হয়েছিল, সেই বিদ্যুতের শক্তিই এবার ছাপাখানার যন্ত্র চালিয়ে অক্ষরকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতে শুরু করল। এখানে যেন আলোর একটি গভীর প্রতীকী রূপান্তর ঘটে। প্রথমে আলো অন্ধকার দূর করেছিল; পরে সেই শক্তি শব্দকে দূরে নিয়ে গেল। মুদ্রণযন্ত্রের চাকা ঘুরল, অক্ষর কাগজে ফুটে উঠল, সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল মানুষের মধ্যে। পরবর্তীকালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দৈনিক আজাদী চট্টগ্রামের সংবাদজগৎ ও জনজীবনে যে দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা পালন করে, তার সূতিকাগারেও তাই প্রযুক্তির সেই প্রথম অভিযাত্রার একটি সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

একজন প্রকৌশলীর জীবন তখন আর কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তার ও জেনারেটরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর কাজের বিস্তার গিয়ে মিশে যায় একটি সমাজের জ্ঞান, সংবাদ ও জনচেতনতার সঙ্গে। আজকের চট্টগ্রাম রাতে জেগে থাকে। কর্ণফুলীর তীরে আলো, বন্দর এলাকায় আলো, সড়কে আলো, ভবনের জানালায় আলো। নগরীর বিস্তৃত শরীর যেন অগণিত বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে।

এই আলোয় দাঁড়িয়ে সেই প্রথম আলোর কথা মনে করা কঠিন। তবু ইতিহাস আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই শুরুর কাছে। একটি জেনারেটরের শব্দের কাছে। একটি পুরোনো রাস্তার কাছে। একটি ঘরের কাছে, যেখানে হয়তো প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে উঠেছিল। সেই মুহূর্তে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা হয়তো জানতেন না তাঁদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সামান্য ঘটনাটি একদিন একটি শহরের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তাঁরা হয়তো ভাবেননি, একদিন সেই আলো ছড়িয়ে পড়বে হাজার হাজার ঘরে; কারখানা চালাবে, ছাপাখানার চাকা ঘোরাবে, সংবাদ ছড়িয়ে দেবে, রাতকে দীর্ঘ করবে, একটি বন্দরনগরীর জীবনযাত্রার ছন্দ বদলে দেবে। ইতিহাসের বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় এমনই আসে নিঃশব্দে, ছোট পরিসরে, অল্প কয়েকজন মানুষের উদ্যোগে।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রথম বাঙালি পুঁথি সংগ্রাহক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ
পরবর্তী নিবন্ধইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক : তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধায়