সৈয়দ আমীর আলী ও চট্টগ্রাম

ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ ছিদ্দিকী | সোমবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকার প্রথম মহাপরিচালক, চট্টগ্রামস্থ বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালক, সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা উপচার্য, প্রাচ্যবিদ্যার প্রখ্যাত পণ্ডিত, চট্টগ্রাম জেলার লোহাগড়া উপজেলার বিখ্যাত চুনতি গ্রামের খান ছিদ্দিকী পরিবারের উজ্জল নক্ষত্র ড. মুঈনউদ্দীন আহমদ খান বলেছেন– “ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে অদ্যাবদি বাঙলায় সৈয়দ আমীর আলীর সমকক্ষ কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বা বুদ্ধিজীবী অনুগ্রহণ করেনি।” ড. খানের এমন মন্তব্য সৈয়দ আমীর আলী সম্পর্কে বহুমাত্রিক চিন্তা করার অবকাশ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া ইসলামের ইতিহাসে তার প্রণীত গ্রন্থ সমূহ ইউরোপ, আমেরিকা সহ পৃথিবীর খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি লাভ করে বিশ্ববুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার চত্তরে বাঙালি মুসলমানদের একটি উন্নত অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে আলোচ্য প্রবন্ধে সৈয়দ আমীর আলী ও বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্র বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক নির্ণয়ের প্রচেষ্টা করা হবে।

২। বাংলাকোটের শহীদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর খলিফা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার চুনতি গ্রামের বাসিন্দা, গাজীয়ে বালাকোট মাওলানা আবদুল হাকিমের ষষ্ঠপুত্র মাওলানা আবদুল হাই কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা হতে টাইটেল পাশ করেন। তিনি বিখ্যাত আলিম ও শায়ের ছিলেন। তার প্রসঙ্গে ড. মুঈনউদ্দীন আহমদ খান লিখেছেন– “তিনি (আবদুল হাই) হুগলীর ইমামবাড়ার নিকটস্থ মসজিদের ইমাম ছিলেন। সৈয়দ আমীর আলীর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন এবং পুস্তক প্রণয়নে ও আরবীফার্সী কিতাবের উর্দু অনুবাদে তাঁকে সাহায্য করেন। বিশেষত: ফিকহ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ কিতাব হিদায়ার উর্দু তরজুমায় ও ভাষ্য রচনায় তিনি সৈয়দ আমীর আলীর সহযোগী ছিলেন। মাত্র ৪২ বছর বয়সে হুগলিতে ইনতেকাল করেন। সৈয়দ আমীর আলী তাঁর বিধবা স্ত্রীকে চুনতীতে মাসিক ভাতা প্রদান করতেন। সৈয়দ আমীর আলী যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মাওলানা আবদুল হাই এর স্ত্রী ভাতা পেয়েছিলেন। তিনি হুগলীতে মারা যান এবং তথায় সমাহিত হন। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রফেসর ড. আলী আহমদ লিখেছেন: Maulana Muhammad Abdul Hai, son of Maulana Muhammad Abdul Hakim of Chunati. Satkania was a Persian poet, who after completing his studies at Calcutta madrasah, become an imam of a mosque at or near the famous Imambara at Hughly. Maulana Abdul Hai lived at Hughly in the company of Sir Sayyid Ameer Ali for a considerably long time and died and was buried there at the Imambara. He, in his later life, is known to have helped Ameer Ali in the translation of many Arabic and Persian works of which the translation of the Hidaya from Arabic into Urdu is mentionable, Maulana Abdul Hai would remain ever memorable for his Majmuah Khutut, a collection of a number of letters and poems.” অবসর গ্রহণের পর সৈয়দ আমীর আলী লন্ডন চলে যান; কিন্তু অন্তরঙ্গ বন্ধু মরহুম মাওলানা আবদুল হাই হুগলীতে থেকে যান। উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে চট্টগ্রামের অজপাড়াগাঁয় চুনতির সাথে সৈয়দ আমীর আলীর সম্পর্ক সত্যই বিস্ময়কর।

মাওলানা আবদুল হাই মারা যাওয়ার পর সৈয়দ আমীর আলীর অনুবাদ সহযোগী হিসাবে কাজ করেন তাঁর জামাতা মাওলানা ফৈয়াজুর রহমান খান (১৮৭৮১৯৬৭)। এ প্রসঙ্গে ড. খান লিখেছেন– ‘তিনি একজন কীর্তিমান ব্যক্তি ছিলেন। আরবী শিক্ষা সমাপনান্তে ইংরেজী পড়াকালীন সময়ে কলিকাতায় নিজ শশুর মাওলানা আবদুল হাই (ইবনে আবদুল হাকীম) এর মাধ্যমে সৈয়দ আমীর আলীর সংস্পর্শে আসেন। পরে অনুবাদ কাজে সৈয়দ আমীর আলীকে সাহায্য করতেন এবং সৈয়দ আমীর আলীও কিছু কিছু পারিশ্রমিক দিতেন।

৩। চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিদ্দিকী পরিবার চট্টগ্রামের সম্‌ভ্রান্ত, বনেদী ও সম্মানিত পরিবার হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমান স্থানে এ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোহাম্মদ ওয়াসিল ছিদ্দিকীর প্রধান কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি তার পুত্র শেখ রেয়াজউদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকীকে ইংরেজী শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য কলকাতা প্রেরণ করেছিলেন। কলিকাতা হতে এন্ট্রাস পাস করে তিনি এলাহাবাদের অভিজাত মুইর সেন্ট্রাল কলেজ থেকে বি.. পাস করেন। পরবর্তীকালে একই কলেজ থেকে তিনি বি.এল. ডিগ্রী অর্জন করেন।

লক্ষ্মৌর নবাব পরিবারের সদস্য নবাব বজলুর রহমান নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের সাথে কলিকাতায় হিজরত করেন। তারা কলিকাতায় বিপুল সম্পত্তির মালিক হন। শেখ রেয়াজউদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকী নবাব বজলুর রহমানের কন্যা জেবুন্নিসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। উক্ত বিবাহের কাবিননামায় এক নাম্বার সাক্ষী ছিলেন জাস্টিস সৈয়দ আমীর আলী। এখানে নিহিত রয়েছে চট্টগ্রামের বিখ্যাত রেয়াজাউদ্দিন বাজারের প্রতিষ্ঠাতা শেখ রিয়াজউদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকীর অসাধারণ কৃতিত্ব যার বিয়ের সাক্ষী হচ্ছেন একজন মুসলিম বিচারপতি। আর একটি তথ্য হচ্ছে সৈয়দ আমীর আলী ১৯২৮ সালের ৩ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। শেখ রিয়াজ উদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকী ১৯২৮ সালের ১০ মহরম চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ করেন। একই সালে দুই মনীষীর মৃত্যুবরণ সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার।

৪। Central National Mohamadan Association এর পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী রিপোর্টে এসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম শাখায় ৬৪ জন সদস্যের একটি তালিকা স্থান পেয়েছে। জমিদার, সরকারি আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী প্রভৃতি বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির লোক ঐ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ইকরাম রসুল খান বাহাদুর এবং সম্পাদক ছিলেন চট্টগ্রাম মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট জুলফিকার আলী। সৈয়দ আমীর আলীর প্রতিষ্ঠিত মুসলমানদের প্রিয় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ন্যাশনাল এসোসিয়েশন কলিকাতা প্রতিষ্ঠার প্রায় সাথে সাথে চট্টগ্রামে শাখা উদ্বোধন করা হয়। কেন্দ্রীয় সংগঠনের কর্মসূচী বাস্তবায়নের সাথে চট্টগ্রাম শাখাও নানা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে।

৫। সারা বিশ্বে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সৈয়দ আমীর আলীর চর্চা হয়। এ ক্ষেত্রে তাঁর জীবন ও কর্মের যথাযথ মূল্যায়ন করে গবেষণাধর্মী গ্রন্থটি প্রদান করেছেন খার্তৃুম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর ড. কে. কে. আযীয। তার প্রণীত গ্রন্থের নাম ‘Ameer Ali: Life and Work’ এটি অনুবাদ করেছেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ ছিদ্দিকী। যিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামের বড় মহিষখালী গ্রামের সন্তান। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর মুহাম্মদ আবদুর রহিম। Syed Ameer Ali and Muslim Renaissance Movement শিরোনামে একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন যা চট্টগ্রামের ইসলামিক সংস্কৃতি কেন্দ্র হতে ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখিত তথ্যসমূহ এ বার্তাপ্রদান করে যে চট্টগ্রামে সৈয়দ আমীর আলী চর্চা বিশ্বের অন্যান্য জেলা হতে খুব একটা পিছিয়ে নেই।

৬। উপসংহার: চট্টগ্রামের সাথে সৈয়দ আমীর আলীর নির্ণয় করতে গিয়ে আমরা প্রথমত দেখতে পেলাম তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুবাদ সহযোগী মাওলানা আবদুল হাই হচ্ছেন জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামের অধিবাসী। দ্বিতীয়ত চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত রেয়াজউদ্দিন বাজারের প্রখ্যাত শেখ রেয়াজউদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকীর বিয়ের এক নাম্বার স্বাক্ষী হলেন সৈয়দ আমীর আলী। তৃতীয়ত সৈয়দ আমীর আলির প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মহামেডান এসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম শাখা কেন্দ্রীয় সংগঠনের প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে রয়েছে ৬৪ জন সদস্য। চতুর্থত চট্টগ্রামে সৈয়দ আমীর আলী চর্চার অধ্যায় ও চমৎকারভাবে পরিলক্ষিত হয়। সৈয়দ আমীর আলী কখনও চট্টগ্রাম আসছেন কিনা জানি না; কিন্তু উল্লেখিত বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডে চট্টগ্রামে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতি একান্তভাবে অনস্বীকার্য।

লেখক: ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ; উপাচার্য, বান্দরবান বিশ্বাবদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপার্বত্য চট্টগ্রামে ইনবাউন্ড ট্যুরিজম
পরবর্তী নিবন্ধজাতীয়তাবাদী অর্থনীতি : বিশ্ব অর্থনীতির নতুন ধারা