স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা দৈনিক আজাদী স্ব–গৌরবে ৬৭ বছরে পদার্পণ করেছে। এটি দৈনিক আজাদীর জন্য যেমন গৌরবের তেমনি চট্টগ্রামবাসীর জন্যও আনন্দ ও গর্বের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। কেননা সংবাদপত্র জগতে এটি অনন্য এক বিরল ইতিহাসের মাইল ফলক। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের গণমানুষের পেশাগত ও নাগরিক জীবনযাপনকে তৎকালীন পশ্চাৎপদ পিছিয়ে থাকার অবস্থান থেকে সচেতনতা সৃষ্টি, আধুনিক জীবনদর্শন, মানবিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে দৈনিক আজাদী যে অসামান্য ভুমিকা ও অবদান রেখেছে তা আজও সর্বমহলে প্রশংসায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই নিরেপক্ষ ও গঠনমূলক পত্রিকাটি প্রকাশের সাহসী ও বলিষ্ঠ দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন ক্ষণজন্মা কীর্তিমান পুরুষ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার। জানা যায় তাঁরই তত্ত্ব্বাবধানে চট্টগ্রামে যেভাবে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে লোকালয় আলোকিত হয়েছিল, তেমনি মুদ্রণ শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে শিক্ষার আলো জ্বালাতেও আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এতে ছিল আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারের অবিচল দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস, সাহস ও জনবান্ধন কৌশল। জানা যায় উক্ত ৫ সেপ্টেম্বর ছিল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংবাদপত্র প্রকাশ দীর্ঘ হলেও নিরপেক্ষ,গঠনমূলক ও জননন্দিত সংবাদপত্র হিসাবে তৎকালীন সময়ে আজাদীর মত কোনটাই তেমন বাজারে টিকে থাকতে পারেনি। আজাদীর পত্রিকা প্রকাশ ছিল শাসনত্রাসনের যাঁতাকলে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ও বড়ধরনের ঝুঁকি।
আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার আগাগোড়া একজন ধার্মিক মানুষ হলেও অসামপ্রদায়িক ভাবনায় সংবাদ, বাংলা ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি তাঁর ছিল এক অকৃত্রিম অনুরাগ ও ভালোবাসা। সেই অমর কীর্তিমান পুরুষ আলহাজ্ব আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার আজও বিশাল পাঠকের মন জয় করা সংবাদ জগতের ঐতিহ্যের ধারকবাহক জননন্দিত পত্রিকা আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
দৈনিক আজাদী প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পাঠকসমাজের কাছে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ সংবাদ পৌঁছানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারী, জনগণের অধিকার আদায়ের সংগত দাবীকে পূর্ণ সমর্থন যুগিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ছাত্রদের ১১ দফা, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণদাবীর পক্ষে আজাদী ছিল সোচ্চার। চট্টগ্রাম নগরীকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যময় বাসযোগ্য করতে দৈনিক আজাদী বৃক্ষ রোপন, শিক্ষাবৃত্তি, চিকিৎসা সহায়তাসহ নানা কল্যাণমুখি কাজ করে যাচ্ছে, যা সর্বজন বিদিত।
তাই চট্টগ্রামের সংবাদজগতে আজাদী আজও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক ও অদ্বিতীয় হিসাবে ঠাঁই করে নিয়েছে।
১৯৭৭ সাল থেকে আমি দৈনিক আজাদীর একজন নিয়মিত পাঠক। তখন আজাদীর আগামীদের আসরে লিখতে শুরু করি। সেই সময় আগামীদের আসরের ভাইয়া ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আতাউল হাকিম। আগামীদের আসর ছিল ছোট্টদের ছড়া, কবিতা, গল্প ইত্যাদি লেখায় একটি আকর্ষণীয় সমৃদ্ধ পাতা। জেনেছি আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার ছোটদেরকে লেখালেখিতে উৎসাহ যোগাতেন। তিনি নাকি বলতেন ভুল–শুদ্ধ যেমনই হোক ছোটরা লিখুক, লিখতে লিখতে একদিন ওরা ভালো লিখবে। ছোটদের প্রতি তাঁর এমন ভালোবাসা, মায়া ও উৎসাহ সত্যি অতুলনীয়। এই আগামীদের আসর থেকে বড় বড় লেখক সৃষ্টি হয়ে তাঁর এই মহৎ চিন্তা ও স্বপ্নীল ভাবনাকে আজ বাস্তবে প্রতিফলিত করেছে। আগামীদের আসর আমার পত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি ও প্রথম ভালোবাসা। আসরে আমার সভ্য নম্বর ছিল– ৩৬৪৪। যেদিন আসরের ঈদ সংখ্যায় আমার প্রথম ছড়া ছাপা হয় সেদিন কী যে আকাশ ছোঁয়া প্রাণোচ্ছল আনন্দ মেতে উঠেছিল, তা বলার বাইরে। যেন রঙিন আকাশে পাখিরা দলবেঁধে আমারই জয়গান গেয়েছিল। ঐ সংখ্যার দুটো কাগজ কিনে সযত্নে রাখলাম আর প্রতিদিন বার বার তা পড়ে দেখতাম। এরপর থেকে আজাদীর আগামীদের আসরে নিয়মিত ছড়া কবিতা পাঠাতাম এবং প্রায় ছাপাও হতো। তখন আগামীদের আসর ছিল পুরো এক পৃষ্ঠা। আসরে ছড়া, কবিতা, গল্প, কৌতুক, আঁকা ছবি, লেখার সমালোচনা ইত্যাদি প্রকাশ হতো। আন্দরকিল্লাহ আজাদী অফিসের (কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস) নিচে ডাকবাক্সে লেখা দিয়ে আসতাম আর না হয় ডাক যোগে লেখা পাঠাতাম। এভাবেই দৈনিক আজাদী পত্রিকা হয়ে গেল আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
ছাত্রজীবন শেষ করে আমি নগরীর ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি। বছর দুয়েক যেতে না যেতেই ১৯৮৭ সালে আমি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে জনসংযোগ কাম প্রটোকল অফিসার পদে চাকরিতে যোগদান করি। জনসংযোগ পেশা মানেই পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের নিউজ, সাংবাদিকদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে তোলা। তখন চট্টগ্রামে প্রধান ও সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা হলো দৈনিক আজাদী। সেই সময় আজাদীর অফিস চেরাগির মোড়ে সুন্দর পরিপাটি বহুতল ভবনে। ব্যক্তিগত ও অফিস কাজে প্রায় সময় আজাদী অফিসে যেতাম। কারণ সকল মেয়রগণই ছিলেন দৈনিক আজাদীতে তাঁর নিউজ ছাপানোর ক্ষেত্রে অসম্ভব ক্রেজি এবং আপসহীন। নিউজ ছাপা হলে পরেরদিন তাই মেয়রের অফিস টেবিলে আজাদীর নিউজ কাটিংটাই দেয়া হতো সবার উপরে। আজাদীতে নিউজ দেখলেই যেন মেয়রের নিউজ তৃষ্ণা বা ক্ষিদে অনেকটা মিটে যেতো। আজাদীর দুতলায় বিশাল বার্তা বিভাগ, সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এবং অন্যান্য বিভাগীয় সম্পাদক ও বিজ্ঞাপন অফিস। যেতে যেতে সবার সাথে আমার গড়ে উঠেছিল সুন্দর ভ্রাতৃতুল্য সুসম্পর্ক। দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি সবাই আমাকে পছন্দ করতেন। ব্যস্ততার মাঝেও কথাবার্তা বলতেন। সেই শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার মানুষগুলো পবিত্রমুখ এখনো চোখের সামনে ভাসছে। কত কথা কত স্মৃতি মানসপটে জেগে আছে। তাঁরা সবাই ছিলেন একেকজন জ্ঞানভাণ্ডার আলোর প্রদীপ। তাঁরা আজ বেঁচে নেই সত্যি তবে চট্টগ্রামে সংবাদজগতে কিংবদন্তি হয়ে অমর হয়ে থাকবেন।
আজ দৈনিক আজাদীর ৬৭ তম বছরের পদার্পণে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই জ্ঞানতাপস নির্ভীক ও সততার উজ্জ্বল প্রতীক সাধন কুমার ধর, কাজী জাফরুল ইসলাম, অরুণ দাশগুপ্ত, শরীফ রাজা, ওবায়দুল হক, মোহাম্মদ ইউসুফ, বিমলেন্দু বড়ুয়া, মাহবুবুল আলম, আতাউল হাকিম, সিদ্দিক আহমেদ, বন্ধুতুল্য হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, হিসাব বিভাগের সজ্জন শান্তিপ্রিয় লোকমান হাকিম বিজ্ঞাপনের বাদল ভাইসহ আরো অনেককে।
অসামপ্রদায়িক চেতনা, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং মুক্তচিন্তা চর্চার কাগজ ছিল দৈনিক আজাদী। আশির দশকের দিক থেকে বহু জ্ঞানীগুণী লেখকের নিয়মিত কিছু কলাম ও পাতা পাঠকসমাজে আলোড়ন তুলেছিল। সেই কলাম ও পাতার জন্য পাঠক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। যেমন প্রফেসর আসহাবউদ্দিন আহমদের পথ চলিতে এবং উজান স্রোতে জীবনের ভেলা, আনিস চৌধুরীর বহুদর্শীর ডাইরী, চৌধুরী জহুরুল হকের সদয় অবগতির জন্য ও রম্যব্যঙ্গ কৌতুক কণিকা, বর্তমান সম্পাদক এম এ মালেকের চোখে দেখা কানে শুনা, নুরুল ইসলাম বিএসসি‘র একান্ত ভাবনা, শরীফ রাজার দেশ দেশান্তর, ওহীদুল আলমের কালের যাত্রা ধ্বনি, মঈনুল আলমের ডেটলাইন চট্টগ্রাম, মোফাজ্জল চৌধুরীর অন্তহীন ভাবনা, মোহাম্মদ ইদ্রিসের বিচরণ, রবীন্দ্রনাথ শীলের বিজ্ঞান বিচিত্রা, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খানের বিরস রচনা, অধ্যাপক ফজলুল হকের বহমান সময়, সাখাওয়াত হোসেন মজনুর সামপ্রতিক চট্টগ্রাম ও দৈনন্দিন টুকিটাকি, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের ঢাকার চিঠি এবং আজাদীর নিয়মিত পড়শী‘র আরশি নগর।
নাগরিক সমস্যা ও এর সমাধানকে গুরুত্ব দিয়ে দৈনিক আজাদী ১৯৯১ সালের দিকে দুটি চিঠিপত্র কলাম প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এর একটি হলো সিটি কর্পোরেশন সমীপে এবং অপরটি পুলিশ কমিশনার সমীপে। সপ্তাহে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কলামে নগরবাসী তাদের নানাবিধ যে সমস্ত সমস্যা তুলে ধরতেন পরের সপ্তাহে মেয়রের পক্ষে আমি জনসংযোগ অফিসার হিসাবে তার জবাব দিতাম। এই দুটি চিঠিপত্র কলামও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। নগরবাসী তাতে সরাসরি তার সমস্যার উত্তর পেতেন এবং তাতে তারা স্বস্তি ও আনন্দবোধ করতেন।
আজাদী পত্রিকার নিরপেক্ষ সংবাদের মান, মফস্বল সংবাদ, সম্পাদকীয়, উপ–সম্পাদকীয়, খেলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য সাপ্তাহিকী, খেলা, মুূদ্রণ, বানান, গেটআপ প্রভৃতি অত্যন্ত উঁচুমানের হওয়ায় আজও পাঠক সমাদৃত। স্বাধীনতার পূর্বে দৈনিক আজাদীর সাপ্তাহিক বহু কলাম তৎকালীন সময়ে নগরবাসীর কাছে ভীষণ প্রিয় ছিল। পুরুষদের পাশাপাশি বহু প্রসিদ্ধ ও নামকরা নারী লেখিকাও তাদের লেখায় আজাদীকে সমৃদ্ধ করেছে এবং নারীপাঠক ও সমাজকে করেছে আলোকিত। বিনোদনের জন্য সপ্তাহের বৃহস্পতিবারে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্র আনন্দন। পাঠক চাহিদার সবধরনের ফিচার এতে পাওয়া যেতো। এই জনপ্রিয় ফিচারটির পরিচালনায় ছিলেন বর্তমান পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক। তাঁর সাথে ছিলেন সাংবাদিক রাশেদ রউফ, জহুরুল ইসলাম ও মঈনুল আলম বাদল। দৈনিক আজাদীর সুবিশাল কর্মজজ্ঞ ও অবদান স্বল্পপরিসরে লেখা সম্ভব নয়। বর্তমানে বহু লেখক আজাদীতে নিয়মিত কলাম লিখছেন।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননার সর্বোচ্চ পদক একুশে পদকপ্রাপ্ত দৈনিক আজাদী পত্রিকা বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঠকের হৃদয়ে চম্বুকের মত আকর্ষণ নিয়ে আস্থা ও ভালোবাসা যে জায়গা জুড়ে রেখেছে তা চিরদিন অক্ষুণ্ন থাকবে। লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক।












