
মানুষই প্রাণী জগতে একমাত্র উৎপাদক, এই কথাটি অর্থনীতির ভিত্তি। অন্যান্য প্রাণী প্রকৃতি থেকে যা পায়, তাই গ্রহণ করে; কিন্তু মানুষ ফসল চাষ করে, যন্ত্র তৈরি করে, শস্য থেকে খাবার বানায়, কাঠ থেকে আসবাব গড়ে। এই উৎপাদনের জন্য চারটি উপাদান দরকার; ভূমি, শ্রম, মূলধন এবং সংগঠন। কিন্তু এই চারটির পাশে আরও একটি জিনিস নীরবে কাজ করে, যা ছাড়া উৎপাদন প্রায় অসম্ভব, সেটি হলো যোগাযোগ, বা সহজ কথায় ভাষা ও তথ্যের আদান–প্রদান।
ভূমি ছাড়া চাষ হয় না, শ্রম ছাড়া উৎপাদন হয় না, মূলধন ছাড়া বিকাশ হয় না, সংগঠন ছাড়া সমন্বয় হয় না। কিন্তু এই চারটি উপাদানকে একত্রিত করতে, পরিচালনা করতে এবং অর্থবহ করতে দরকার যোগাযোগ। একজন কৃষক জমি চাষ করে, কিন্তু তার উৎপাদিত শস্য বাজারে পৌঁছায় তখনই, যখন ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে দরদাম হয়, চুক্তি হয়, তথ্য বিনিময় হয়। বাজারের প্রতিটি লেন–দেনই মূলত একটি যোগাযোগের ঘটনা।
মূলধনের ক্ষেত্রেও একই কথা। টাকা, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, এগুলো নিজে নিজে উৎপাদন করে না। এগুলোকে কাজে লাগাতে হয় মানুষের মাধ্যমে, আর মানুষকে পরিচালনা করতে হয় নির্দেশের মাধ্যমে। নির্দেশ মানেই ভাষা। একটি কারখানার প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, ম্যানেজার, সবাই ভাষার মাধ্যমেই তথ্য বিনিময় করে, সিদ্ধান্ত নেয়, সমস্যা সমাধান করে। মূলধন যত উন্নতই হোক, যোগাযোগের দুর্বলতা থাকলে সেই মূলধন অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সংগঠন হলো সেই প্রক্রিয়া, যা ছড়িয়ে থাকা শ্রম ও মূলধনকে একত্রিত করে একটি লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সংগঠন কীভাবে গড়ে ওঠে? নিয়ম, নীতি, দায়িত্বের বণ্টন, কর্মপ্রবাহ, এসবের সবই ভাষায় প্রকাশিত হয়। একটি সংগঠনের চার্ট, ম্যানুয়াল, চুক্তিপত্র, সবই ভাষার রূপ। সংগঠন ছাড়া ভাষা অর্থহীন, আবার ভাষা ছাড়া সংগঠন অচল। দুটি একে অপরের পরিপূরক।
আধুনিক অর্থনীতিতে এই সম্পর্ক আরও গভীর। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যোগাযোগ শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যেও ভাষা চলে। কোড, অ্যালগরিদম, ডেটাবেস, এগুলোও ভাষারই রূপ, যা ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না। একটি স্টার্টআপ, একটি বহুজাতিক কর্পোরেশন, একটি সরকারি প্রকল্প, সব জায়গায় যোগাযোগই হলো সেতু, যা মানুষকে মানুষের সাথে, মানুষকে যন্ত্রের সাথে, এবং প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত করে।
যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্ঞানের সংরক্ষণ ও সঞ্চালন। এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছায় ভাষার মাধ্যমেই। একটি কারখানার উৎপাদন পদ্ধতি, একটি ব্যবসার গোপন রেসিপি, একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি ,সবই লিখিত ও মৌখিক ভাষায় টিকে থাকে। যোগাযোগ হারিয়ে গেলে সেই জ্ঞানও হারিয়ে যায়, আর উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে।
তাই বলা যায়, যোগাযোগ উৎপাদনের একটি স্বাধীন উপাদান নয় , বরং এটি সেই মাধ্যম, যা অন্য চারটি উপাদানকে একত্রিত করে, পরিচালনা করে এবং অর্থবহ করে তোলে। ভূমি ছাড়া চাষ হয় না, শ্রম ছাড়া উৎপাদন হয় না, মূলধন ছাড়া বিকাশ হয় না, সংগঠন ছাড়া সমন্বয় হয় না কিন্তু যোগাযোগ ছাড়া এই চারটির কোনোটাই কার্যকর হয় না। যোগাযোগ হলো সেই অদৃশ্য সুতো, যা উৎপাদনের পুরো কাঠামোকে একসাথে বেঁধে রেখেছে। আজকের আধুনিক সমাজে বা জাতিরাষ্ট্রের কালে, যোগাযোগের সবচেয়ে বড় উপায় ও মাধ্যম হলো: গণ–মাধ্যম। এক সোর্স থেকে লক্ষ জনের সংবাদ পৌঁছে দেয়াই হচ্ছে গণমাধ্যমের প্রধান কাজ। বিশাল ভূখণ্ডের মানুষকে গণমাধ্যমের মাধ্যমেই এক চিন্তায় গ্রথিত করে। গণমাধ্যম না থাকলে, জাতিরাষ্ট্র থাকে না। ইউরোপে সামন্ত ব্যবস্থা ভেঙে পুঁজিবাদের উদ্ভব ও এর প্রসারে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের অগ্রগামী।
ইংল্যান্ডে গণতন্ত্রের উদ্ভবকে সাধারণত রাজনৈতিক আদর্শের বিজয় হিসেবে দেখা হয় স্বাধীনতা, প্রতিনিধিত্ব, নাগরিক অধিকারের ধারণার বিজয়। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি অসম্পূর্ণ। গণতন্ত্রের আসল চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক, পুঁজি সঞ্চয়কারী শ্রেণির সেই পুঁজি রক্ষার ও বিনিয়োগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে এক নতুন ধরনের ধনী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, বণিক, জাহাজের মালিক, ঔপনিবেশিক উদ্যোক্তা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ লুণ্ঠন, আফ্রিকা ও আমেরিকায় দাস ব্যবসা, উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ, এই সবের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ পুঁজি ইংল্যান্ডে প্রবাহিত হয়। এই পুঁজি ছিল নতুন, গতিশীল, এবং ঐতিহ্যবাহী ভূমি–ভিত্তিক অভিজাত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এই নতুন পুঁজিপতি শ্রেণির একটি মৌলিক সমস্যা ছিল। তাদের পুঁজি বিনিয়োগের জন্য দরকার ছিল মুক্ত বাজার কাঁচামাল সস্তায় কেনার, শ্রম সস্তায় পাওয়ার, পণ্য বিক্রির স্বাধীনতা। কিন্তু সেই সময়ের রাজনৈতিক কাঠামো রাজতন্ত্র, অভিজাত ভূস্বামী, সরকারি একচেটিয়া অধিকার এই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিল। রাজা বাণিজ্যে কর আরোপ করত, অভিজাতরা জমি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখত, সরকারি কোম্পানিগুলো বাজার একচেটিয়া করে নিত।
এই পরিস্থিতিতেই উঠে আসে ল্যাসেফেয়ার অর্থনীতির ধারণা, রাষ্ট্র যেন বাজারে হস্তক্ষেপ না করে, পুঁজির মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত হয়। অ্যাডাম স্মিথের ‘দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস’ (১৭৭৬) এই ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়। কিন্তু স্মিথের ধারণা শুধু অর্থনৈতিক ছিল না এর পেছনে ছিল একটি রাজনৈতিক দাবি: পুঁজিপতি শ্রেণিকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার অধিকার দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
এই দাবি থেকেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা। ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব, ১৮৩২ সালের রিফর্ম অ্যাক্ট, ১৮৬৭ ও ১৮৮৪ সালের সংস্কার আইন, এগুলোর পেছনে ছিল পুঁজিপতি শ্রেণির ধাপে ধাপে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া। প্রথমে ভূমি–ভিত্তিক অভিজাতদের সাথে মিত্রতা, তারপর ধীরে ধীরে ভোটাধিকার সমপ্রসারণ কিন্তু সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল একই: অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ল্যাসেফেয়ার অর্থনীতি কখনোই পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ বাজারের মুক্তি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে, আইন, আদালত, সম্পত্তির অধিকার, চুক্তির বাধ্যবাধকতা, এসব রাষ্ট্রই তৈরি করে। আর রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক না হলে, পুঁজিপতি শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চললে, তাদের স্বার্থ রক্ষিত হয় না। তাই গণতন্ত্র ছিল পুঁজির প্রয়োজন, শুধু আদর্শ নয়।
তবে আদর্শ ছাড়া সমাজের কার্যক্রম অচল হয়ে যায়। একটি অর্থব্যবস্থা, একটি বা সমার্থক একাধিক আদর্শের দ্বারা চালিত হয়। আয়না যেমন চেহারা দেখবার মাধ্যম, আজকের দুনিয়ায় গণমাধ্যম ও তাই। তাইতো একে সমাজ দর্পণ বলা হয়।
সংবাদপত্র ছিল সেই সেতু, যা দার্শনিকদের ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিল। লক বা রুশোর বই কয়েকজন শিক্ষিত মানুষই পড়ত, কিন্তু সংবাদপত্র প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের হাতে পৌঁছাত।
ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকে সংবাদপত্রগুলো– যেমন ‘দ্য স্পেক্টেটর’, ‘দ্য জেন্টলম্যানস ম্যাগাজিন’ শুধু খবর ছাপায়নি, তারা আলোচনা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক কার্টুন, সম্পাদকীয়, পাঠকের চিঠি এসবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রথমবার বুঝতে পেরেছিল যে রাষ্ট্র তাদের জন্য, তাদের মতামতের জন্য। এই প্রচারই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জ্বালানি হয়ে উঠেছিল।
জাতিরাষ্ট্র তৈরির ক্ষেত্রে গণমাধ্যম আরও সরাসরি ভূমিকা রাখে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, জাতি হলো একটা কল্পিত সমপ্রদায়, মানুষ একে অপরকে চিনে না, তবু একই জাতির মানুষ বলে মনে করে। এই কল্পনাটা সম্ভব হয়েছে সংবাদপত্রের কারণে, যেখানে হাজার হাজার অপরিচিত মানুষ একই সকালে একই খবর পড়ে।
স্বাধীনতা কেন দরকার, কারণ মাধ্যম যখন রাষ্ট্র বা কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন সেই কল্পনাটা ভেঙে যায়। স্বাধীন মাধ্যম ক্ষমতার অপব্যবহার ধরে, সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বর তোলে, আর নাগরিকদের সত্য জানার অধিকার রক্ষা করে।
পত্র, রেডিও আর এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্রতিটি মাধ্যম মানুষের চিন্তাভাবনাকে আলাদাভাবে গড়ে তোলে। ম্যাকলুহান বলতেন, মুদ্রণ যুগে মানুষ এককভাবে চিন্তা করত, আর ইলেকট্রনিক যুগে সবাই একসাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশে ফেসবুক আর ইউটিউব এখন সেই বৈশ্বিক গ্রামের প্রধান মাধ্যম, যেখানে খবর আর মতামত একসাথে ছড়ায়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেন জরুরি, তা বোঝা যায়। যখন মাধ্যম স্বাধীন থাকে, তখন মানুষ নিজের চারপাশের সত্য সম্পর্কে নিজেই ধারণা গড়ে তোলে। কিন্তু যখন মাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন মানুষের চিন্তাও নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। ম্যাকলুহানের ভাষায়, “মাধ্যম মানুষের ইন্দ্রিয়ের সমপ্রসারণ, আর সেই সমপ্রসারণ কেউ কেড়ে নিলে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়”।
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, সাংবাদিকদের ওপর মামলা, আর অনলাইনে ভিন্নমত দমনের ঘটনা দেখায় যে মাধ্যমের ওপর চাপ শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নয়, পুরো সমাজের চিন্তার স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করছে।
অন্যদিকে, স্বাধীন মাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। নির্বাচনের আগে, দুর্নীতির খবর বের হওয়ার সময়, আর সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরার সময় মাধ্যমই একমাত্র সেতু। বাংলাদেশে আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, আর অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল সেই ভূমিকা পালন করে, যদিও তাদের স্বাধীনতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ম্যাকলুহানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– মাধ্যম নিজেই এক ধরনের পরিবেশ তৈরি করে। টেলিভিশন যুগে মানুষ দর্শক হয়ে যায়, আর ডিজিটাল যুগে মানুষ নিজেই কন্টেন্ট তৈরি করে। বাংলাদেশে ইউটিউবার আর ফেসবুক পেজ এখন নতুন ধরনের মাধ্যম, যেখানে স্বাধীনতা আরও বেশি ছড়িয়ে আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতাও আইনি ভয় আর সামাজিক চাপে সংকুচিত হচ্ছে।
তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে শুধু সাংবাদিকদের কথা বলার সুযোগ নয়, বরং পুরো জাতির চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্ন। ম্যাকলুহান বলতেন, আমরা যা দেখি তা দিয়ে আমরা যা হই। মাধ্যম স্বাধীন না হলে মানুষও স্বাধীন হতে পারে না।
সংক্ষেপে, ম্যাকলুহানের তত্ত্ব থেকে বলা যায়, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু একটি পেশার অধিকার নয়, এটি একটি জাতির মানসিক স্বাধীনতার ভিত্তি। সেই ভিত্তি যত মজবুত, সমাজ তত বেশি সচেতন আর গণতান্ত্রিক হবে।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী; উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম।












