আদালত কিংবা জেলা প্রশাসনের কর্মচারী নন, এমনকি আইনজীবী কিংবা আইনজীবীদের কোনো ক্লার্কও নন। সেই তিনি বিবাহ রেজিস্ট্রি, জায়গা জমির দলিল, খতিয়ান ও নামজারির কাজ করে দিচ্ছেন। মামলা মোকদ্দমা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শও দিয়ে আসছিলেন। তিনি হলেন সেলিনা আক্তার। সেবার নাম করে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির দুর্নীতি ও টাউট উচ্ছেদ কমিটির সাঁড়াশি অভিযানে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বর থেকে আটক হয়েছেন সেলিনা আক্তার। গত ৩১ আগস্ট এ অভিযান পরিচালিত হয়।
তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ভিজিটিং কার্ডে তার স্বামীর নামও (নুরুল আবছার) রয়েছে। অর্থাৎ একই ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করে এ দম্পতি একে অপরের সহযোগিতায় নগরীর কোর্টহিলে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন। কার্ডে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সেলিনা আক্তার বাঁশখালী উপজেলার রাইছড়া এলাকার প্রেমাশিয়া গ্রামের জমির আলী মাঝির বাড়ির বাসিন্দা। সমিতি জানায়, সেলিনা আক্তারকে আটক পরবর্তী তার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। সেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে, তিনি ও তার স্বামী নুরুল আবছার কোনো আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী বা কোনো ক্লার্ক না হয়েও এমন যৌথ নামের ভুয়া ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে বিবাহ রেজিস্ট্রি, বায়না দলিল, খতিয়ান ও নামজারির কাজ করার কথা বলে বিচারপ্রার্থীদের সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতারণা করে আসছিলেন, যা মারাত্মক অন্যায় ও অপরাধ। ভবিষ্যতে এই ধরনের কোনো প্রতারণা ও দালালিমূলক অপরাধে লিপ্ত হবেন না এবং করলে সমিতির যে কোনো শাস্তি মেনে নিতে বাধ্য থাকবেন মর্মে তিনি মুচলেকায় উল্লেখ করেন।
সমিতি জানায়, আইনজীবী না হয়েও আইনজীবীর লিন নম্বর ব্যবহার করে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন এমন একজন ব্যক্তিকেও সম্প্রতি আটক করা হয়েছে। তার নাম সুনিল কান্তি ধর। গত ২ সেপ্টেম্বর কোর্টহিলের জজশিপ কেন্টিন থেকে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের একটি মামলার মক্কেলের সাথে টাকা লেনদেন করার সময় তাকে হাতেনাতে ধরা হয়। বোয়ালখালী উপজেলার পূবাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সুনিল কান্তি ধরের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি অ্যাডভোকেট ক্লার্ক না হয়েও একজন মূল আইনজীবীর বৈধ লিন নম্বর (অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার চৌধুরীর লিন নং– ৫৮৭৪) ব্যবহার করে আদালতের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতেন। অর্থাৎ, আইনজীবীর লিন নম্বরকে পুঁজি করে তিনি সরাসরি আইনজীবী পরিচয় দিয়েই মামলায় হাজিরা দিয়ে আসছিলেন এবং সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের সাথে বড় ধরনের প্রতারণা করে আসছিলেন।
সমিতি জানায়, সুনিল কান্তি ধরও মুচলেকা দিয়েছেন। এতে তিনি অ্যাডভোকেট ক্লার্ক হিসেবে নিবন্ধিত না হওয়ায় আগামী এক মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করবেন এবং এর আগে আদালত অঙ্গনে প্রবেশ করবেন না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দূর–দূরান্ত থেকে আদালতে আসা আইনি সহায়তাপ্রার্থী সাধারণ মানুষ আদালত প্রাঙ্গণ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ থাকায় খুব সহজেই এসব প্রতারক চক্রের টার্গেটে পরিণত হন। স্বামী–স্ত্রী মিলে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কিংবা আইনজীবীর লিন নম্বর ব্যবহারকারী চক্রগুলো নিজেদের বৈধ পরিচয় দাবি করে কম খরচে বা দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। পরবর্তীতে ভুয়া দলিল বা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তারা সাধারণ মানুষের কষ্টের জমানো অর্থ ও সর্বস্ব লুটে নেয়। এমন অবস্থায় আইন অঙ্গনকে দালাল ও টাউট মুক্ত রাখতে আইনজীবী সমিতির এই ধরনের অভিযান অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন মহলের মতে, কেবল মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে না দিয়ে এই ধরনের সক্রিয় সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বিচারপ্রার্থীদের এই নিঃস্ব হওয়া কোনোভাবেই থামবে না।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আদালতপাড়ায় দুর্নীতি ও টাউট উচ্ছেদ কমিটির অভিযান নিয়মিতই চলছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেকের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের এমন অভিযান চলবে।












