গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার সংকট তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এসময় তিনি সরকারকে সতর্ক করতে লং মার্চ করা হয়েছে উল্লেখ করে বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের। তিনি বলেন, আমাদের আজকের এই লং মার্চ সরকারকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাকি লং মার্চগুলো এমন হবে না। এতগুলো মানুষ মারা গেল, তাদের দলেরও (বিএনপি) প্রচুর লোক মারা গেছে, গুম হয়েছে, আয়নাঘরে বন্দি হয়েছে– এই মানুষগুলোর রক্ত আর জীবনের প্রতি আমাদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?
তিনি গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সাফ জানিয়ে দিচ্ছি– আপনারা উল্টাপাল্টা করবেন, আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে, এটা হবে না। এখন পর্যন্ত আঙুল আমাদের সোজা, প্রয়োজনে এটা বাঁকা হবে। আমাদেরকে বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে।
তিনি বলেন, আমরা তো এই দাবি নিয়ে রাজপথে আসতে চাই নাই, আমরা তো চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে এবং সংসদের ভেতরেই তার ফয়সালা হবে। আপনারা গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষকে অপমান করেছেন। আপনারা তাদের সাথে দেওয়া কথার সাথে গাদ্দারি করেছেন, প্রতারণা করেছেন। বিরোধী দল জনগণের সাথে প্রতারণা করবে না ইনশাআল্লাহ।
১১ দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক ইনশাআল্লাহ আসবে। তবে এর সাথে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখন প্রয়োজন হবে, ডাক তখনই আসবে ইনশাআল্লাহ। এবং আমরা কনফিডেন্ট, এই লড়াইয়ে জনগণ বিজয়ী হবে। ফ্যাসিবাদ হেরে যাবে, অপরাধীরা হেরে যাবে, চাঁদাবাজরা হেরে যাবে, দুর্নীতিবাজরা হেরে যাবে, লুটপাটকারীরা হেরে যাবে, যারা আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করে তারা হেরে যাবে।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আপনারা শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার চান? সাড়ে ১৫ বছরের যত হত্যাকাণ্ড, গুম হয়েছে– বিচার চান? ২৪ এর আন্দোলনের যারা বীর শহীদ, তাদের খুনিদের বিচার চান? তাদেরকে যারা গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে, সেই খুনিদের বিচার চান? বিডিআরের পিলখানায় ৫৭ জন সেনা অফিসার যাদেরকে খুন করা হয়েছে, সেই খুনিদের বিচার চান? যারা আয়নাঘর তৈরি করেছিল, তাদের বিচার চান? জল্লাদদের বিচার চান? আমরা কথা দিচ্ছি, সেই বিচার আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। আর এই সরকার যদি এই বিচার না করে, তাহলে জনগণের সরকার কায়েমের মাধ্যমে সেই বিচার আমরা তুলে আনব ইনশাআল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা পরিষ্কার একটা কথা বলি– আমাদের এই আন্দোলন ‘ঈদের পরের আন্দোলন’ নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। আর আমরা এমন জায়গাকে নির্বাচিত করে নিয়েছি, যেই জায়গাটা আন্দোলন–সংগ্রাম–স্বাধীনতার সূতিকাগার। বীর চট্টলা থেকেই আন্দোলন আজকে শুরু হলো। আমরা কাউকে ক্ষমতা থেকে বিদায় দেওয়ার জন্য এই আন্দোলন শুরু করি নাই। কেউ যদি বিদায় নেওয়ার আমল করতে থাকে, তো আমরা কি তাদেরকে ইয়াসিন সূরা পড়ে পানি পড়া খাওয়াব? সেই পথেই সরকার হাঁটছে, আমাদের কিছু করার নেই। আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকার একই রাস্তা ধরে হেঁটেছে।
এসময় বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, চট্টগ্রামে একজন মেয়র আছে, উনার মেয়াদ কি এখনো আছে? উনাকে কী বলব আমরা? মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র, তাই না? এখন শুনি যে উনি যতদিন ইচ্ছা ততদিন থাকবেন। এর নাম সুশাসন, না এর নাম ফ্যাসিবাদ? আপনি আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। জনগণের ভোটে এসে সম্মানের সাথে আপনি নেতৃত্ব দেন, আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু ভোটে যদি জনগণ অন্য কাউকে নির্বাচিত করে, তাও আপনাকে মেনে নিতে হবে। এটা কি ফ্যাসিবাদ নয়?
জামায়াতের আমির বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দুটো ভোট দিয়েছিলেন। একটা জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, আরেকটা বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে একই ব্যক্তিকে দুটি ভোট দিয়েছেন। আফসোস, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সকলেই বলেছি যে, আপনারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। যদি ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়, তাহলে গণভোটের রায় আমরা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। একথা বিএনপিও বলেছে, আমরাও বলেছি। ৬ মাস চলে গেল, বিএনপি কি তাদের কথা রেখেছে? জাতির সাথে তারা কী করেছে? সংকট তারাই তৈরি করেছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল একটা পরিবর্তন আসবে, আর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না। এদেশের মানুষকে আদালতে গেলে শোষণের, বঞ্চনার শিকার হতে হবে না, ন্যায়বিচার আমরা পাব। আমাদের সন্তানেরা ভালো শিক্ষা পাবে, ভালো কাজ পাবে, তারা দেশ গড়বে। দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষখোরি এবং দুর্নীতি নির্মূল হবে–তার একটাও হয় নাই।
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির বলেন, তারা বলেছেন, অনির্বাচিত সরকার যত তাড়াতাড়ি বিদায় নেবে দেশের তত মঙ্গল হবে। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, অনির্বাচিত সরকার আমাদেরকে জান্নাতে পাঠায় নাই– এটা ঠিক, কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের সময় আপনারা যেমন ছিলেন, এখন কি সেই সুবিধাগুলো পাচ্ছেন? দেশ তো দেশের জায়গাতেই আছে। আপনারা এসে ক্ষমতায় কুরসিতে বসলেন, তো এখন উল্টা হচ্ছে কেন? তিনি বলেন, এখন গ্যাস নাই, বিদ্যুৎ নাই। আবার বিদ্যুৎ না থাকলেও বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল আসছে। গ্যাস দিবে না, কিন্তু গ্যাসের বিল জমা দিতে হচ্ছে। আমরা তেল পাই না, জ্বালানি পাই না, চতুর্দিকে হাহাকার।
তিনি বলেন, সমাজে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস, রাহাজানি ও হানাহানি। দলীয় আনুকূল্যে ও প্রশ্রয়ে সরকারি দলের লোকেরা এখন সন্ত্রাস ও চুরি–চামারিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চার দিন আগে ঢাকা বিমানবন্দরে একজন প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাই করেছে। যখন ছিনতাই করে তখন বলছে যে, ‘আমরা আওয়ামী লীগের লোক, দিয়ে দাও নইলে শেষ করে দেব।’ ধরা পড়ার পর এখন দেখা যায় সবগুলো বিএনপির লোক। এরা গুপ্ত! একেই বলে গুপ্ত! যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে– সেই হচ্ছে সবচাইতে বড় গুপ্ত। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা যখন লং মার্চের ডাক দিলাম, তখন বিভিন্ন জায়গায় চর্মরোগ দেখা দিয়েছে! হিস্টাসিন খাওয়ানো লাগবে। আজকে বোধহয় কিছু রিঅ্যাকশন আপনারা শুনতে পেয়েছেন।
জামায়াতের আমির বলেন, তারা ওয়াদা করেছিলেন জাতির সামনে নির্বাচনী ইশতাহারে এবং তাদের সংস্কারের ৩১ দফাতে– সমাজের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই শুধু দেশ চালাবে। এখন জায়গায় জায়গায় তারা যে প্রশাসক বসালেন, তারা কি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি? সরকার ভাটির কথা বলে জনগণকে এখন উজানের দিকে নিক্ষেপ করে দিচ্ছে। সবগুলো উলটাপালটা কাজ করছে।
তিনি বলেন, আফসোস! ক্ষমতায় বসেছেন ৬ মাস। কিন্তু বলেন ‘আমাদের সরকারটা শিশু সরকার।’ জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয় নাই। ২৫ বছরের আগে কেউ সংসদ সদস্য হতে পারে না। তো উনারা কি ২৫ বছরের শিশু নাকি? প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আপনারা ভোট দিয়েছেন, ওয়াদা করেছেন, কথা দিয়েছেন– এখন তার সবকিছু আপনারা লঙ্ঘন করছেন।
তিনি বলেন, আমাদেরকে বহু টোপ দেওয়া হয়েছে, লোভ দেওয়া হয়েছে– ‘এইটা করব, ওইটা করব, আসেন।’ আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছি, কোনো লোভ–টোপের প্রতি আমরা চোখ খুলেও তাকাব না। ৭০ ভাগ জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে, এবং আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এর আগে আমরা বিরতি দেব না, আমরা থামব না। এ লড়াই আমাদের চলবে এবং বাংলাদেশও ইনশাআল্লাহ বদলাবে।
এর আগে সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা, সংবর্ধনা ও অভিবাদন কর্মসূচির পর রাত ৮টার দিকে লংমার্চটি চট্টগ্রামের এসে পৌঁছায়। এই কর্মসূচিতে বেশ কয়েকটি পথসভা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাইয়ে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী জনসভার মাধ্যমে লং মার্চ কর্মসূচি শেষ হয়।
উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লং মার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামীর ডা. আমির শফিকুর রহমান।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।












