ইরান যুদ্ধ আমেরিকাকে শুধু নয় তার ইউরোপিয় মিত্রদের ও নানামুখি বেকায়দায় ফেলেছে। এ বেকায়দা ভূ–রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক অবস্থান, এমনকি পশ্চিমাদের প্রতি পৃথিবীর নানা প্রান্তে অবস্থিত দেশগুলির মাঝে আস্থারও সংকট তৈরী করেছে। এ আস্থার সব চেয়ে সংকটে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার তাবেদার রাষ্ট্রগুলি। আমেরিকা– ইসরাইল কর্তৃক ইরান আক্রান্ত হলে, ইরান দারুণ এক কৌশল অবলম্বন করে। এ কৌশলের অংশ হিসাবে তারা প্রথমে হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করে। ক্রমান্বয়ে ইরান তার উপর আক্রমণকে প্রতি আক্রমণের মাধ্যমে এই যুদ্ধকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দেয়। ইরান যুদ্ধকে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে গিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে এতদিন ধরে আমেরিকার বিদ্যমান সামরিক স্থাপনা সমূহে প্রচণ্ড এবং নির্ভুল আক্রমণ পরিচালনা করে। এই আক্রমণের তোড়ে আমেরিকান টেলিভিশন ন্যাটওয়ার্ক সি এন এন এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যস্থিত ২৭ টি ঘাঁটির প্রায় সব কটি বিধ্বস্ত হয়। আক্রমণের প্রাবল্যে প্রায় সবক্ষেত্রে এসব ঘাঁটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এরই মাঝে দেখা দেয় নতুন বিপত্তি, আমেরিকার নৌ বহর ইউ এস এস আব্রাহাম লিংকন ইরান যুদ্ধে স্বীয় ভূমিকা পালনে দীর্ঘদিন সাগরে অবস্থানের কারণে জাহাজস্থ ৫০০০ (পাঁচ হাজার) নৌ সেনার অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ বিষয়টি বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রচার করতে থাকলে এটিও পৃথিবীর দেশে দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে আমেরিকার উপর আস্থার সংকটকে আরো ঘনী ভূত করে।
নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থা সমূহ কর্তৃক নিরুৎসাহিত করা সত্ত্বেও ইসরাইলের প্ররোচনায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক আন্তর্জাতিক রীতিনীতির কোন তোয়াক্কা না করে ইরান আক্রমণ পৃথিবীর সচেতন মানুষ যেমন ভালো চোখে দেখেনি তেমনি আরব বিশ্বের সরকারগুলি ছাড়া সাধারণ আরব জনগণও আমেরিকা– ইসরাইলের ইরান আক্রমণকে মোটেও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখেনি। পাশাপাশি ইরানী প্রতি আক্রমণ ঠেকাতে আমেরিকার প্রতি আরব সরকারগুলির যে অবিচল আস্থা ছিল তা আক্রমণের ভয়াবহতায় কাচের ঘরের মত ভেঙে পড়ে।
এসমস্ত বিষয় তৈরী করে আমেরিকার উপর আস্থাহীনতা। মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলির আমেরিকার সক্ষমতার উপর সৃষ্ট আস্থাহীনতা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন এক নিরাপত্তা সংকট এবং এই সংকটকে ভিত্তি করে তৈরী হয় নতুন এক ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এ বাস্তবতায় সৌদি আরব তার নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় এতদিনের আমেরিকা নির্ভরতা বাদ দিয়ে পাকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, চুক্তির নামকরণ করা হয় এস এম ডি এ (স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এ্যাগ্রিমেন্ট) । চুক্তি অনুযায়ী দু দেশের কোন একটি আক্রান্ত হলে উভয় দেশই আক্রান্ত বলে গণ্য করা হবে। এ চুক্তির তিনটি মৌল ভিত্তি: ১. ক্যালেক্টিভ সিকিউরিটি তথা যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ২. রিজিওনাল স্ট্যাবিলিটি তথা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। এবং ৩. আঞ্চলিক নিরাপত্তা।
আপাত বিবেচনা এবং বিশ্লেষণ অনুযায়ী এস এম ডি এ’ কে ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি নিবারণমূলক প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসাবে গণ্য করা হয়। এ চুক্তি নিয়ে পাকিস্তান–ভারত সংঘাতকালীন সময়ে সৌদি আরবের ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান কী হবে তা নিয়ে সামরিক এবং ভূ–রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা নানা বিশ্লেষণে এ পর্যন্ত কোন ধরনের স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্তে আসতে এখনও ব্যর্থ।
৭ আগস্ট ২০২৬ পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক সৌদি আরবের মক্কায় এক প্রতিরক্ষায় চুক্তিতে উপনীত হয়। এই চুক্তির নামকরণ করা হয় ‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’। এই চুক্তিরও মূল ভিত্তি চুক্তিভুক্ত যেকোনও একটি দেশ আক্রান্ত হলে সকল দেশ আক্রান্ত বলে গণ্য করা হবে। এ চুক্তির ঘোষিত দায়িত্ব বণ্টিত হয়েছে, সৌদি আরব প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেবে, তুরস্ক সামরিক সরঞ্জাম, পাকিস্তান জনবল প্রশিক্ষণ। এই চুক্তিকে অনেকে অতি উৎসাহী হয়ে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসাবেও আখ্যায়িত করছেন। এর কারণও অবশ্য রয়েছে। ন্যাটো চুক্তির ৫ (পঞ্চম) ধারায় রয়েছে ন্যাটোভুক্ত যেকোন একটি দেশ আক্রান্ত হলে সকল দেশ আক্রান্ত বলে গণ্য করা হবে।
‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’কে ঘিরে এখন নানা সমীকরণ। এর মাঝে প্রথমটি হল এটি কি আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির নিরাপত্তা বলয় দিতে ব্যর্থতায় সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণ করতে সৃষ্ট কিনা?
এটি যদি সত্য হয় তবে এই এ্যালায়েন্সের সাথে ইরানের সর্ম্পক কী রকম হবে? ইরানেরই বা এই জোটের প্রতি মনোভাব কেমন হবে? ‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’ এর প্রতি চীন রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি কী রকম হতে চলেছে?
এ্যালায়েন্সভুক্ত দেশগুলিরও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভূ–রাজনৈতিক সমস্যা। যেমন সৌদি আরবের ইরানের প্রক্সি হাউতিদের সাথে রয়েছে প্রচণ্ড বিরোধ। এ বিরোধ ইরান কর্তক হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধের পর আরো বেড়েছে। ইরান আমেরিকা এবং তার মিত্রদের উপর চাপ বাড়াতে এবং তার উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধকে আলোচনায় আনতে বাব আল মান্দেবের উপর হাউতিদের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনার হুমকি দিয়ে আসছে। এ হুমকির কিছু কিছু ইতিমধ্যে কার্যকরী হতেও দেখা গেছে। বাব আল মানদেব হয়ে লোহিত সাগর মুখি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হাউতিরা আক্রমণ পরিচালনা করেছে। উল্লেখ্য হরমুজ প্রণালীর পর বাব আল মানদেব বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম আরেকটি প্রণালী। এর সবচেয়ে কম প্রস্থ মাত্র ১৮ মাইল। এর কূলে রয়েছে ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া আর দিজিভূতি। হাউতিরা ইরানের পক্ষ হয়ে এ প্রণালীতে আমেরিকার মিত্রদের স্বার্থের উপর আঘাত হানার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব হাউতিদের এ হুমকি মোকাবেলায় ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ (চৌদ্দ) টি দেশ নিয়ে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে, মেরিটাইম ডিফেন্স এ্যালায়েন্স গঠন করেছে। এ এ্যালায়েন্স বাব আল মান্দেব, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দিবে। চুক্তির ঘোষণা অনুযায়ী এর লক্ষ্য– ১. নিদিষ্ট নৌ পথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা। ২. আর্ন্তজাতিক সমুদ্র পথের নিরাপত্তা এবং ৩. বাব আল মান্দেব, লোহিত সাগর এবং এডেন উপ সাগরের সমন্বয়ে গঠিত কৌশলগত এ জলপথের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এদিকে ‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’ ভুক্ত দেশগুলির প্রত্যেকের রয়েছে স্ব স্ব সমস্যা এবং এজেন্ডা।
যেমন তুরস্কের সাথে সিরিয়া, ইসরাইল এবং ককেসাস অঞ্চলে রয়েছে দ্বি পাক্ষিক এবং বহুপক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত। সৌদি আরবের রয়েছে ইরান, হাউতি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সংকট, সংঘর্ষ।
পাকিস্তানের জন্ম সূত্রে ভারতের সাথে সংকট, এখন নতুন করে যোগ হয়েছে আফগানিস্তান এবং বেলুচিস্তানে বিভিন্ন প্রক্সির উপস্থিতি। বাংলাদেশের আপাত এরকম কোন সমস্যা দৃশ্যমান নয়। এমতাবস্থায় ‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’ এ বাংলাদেশের যোগদানের কোন তাড়া আছে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’ভুক্ত হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। এ প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি বিবেচনা এবং বিশ্লেষণ করা সমীচীন বলে প্রতীয়মান।
এ ‘ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’ আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির নিরাপত্তা বলয় দিতে ব্যর্থতায় সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণ করতে সৃষ্ট কিনা? এই এ্যালায়েন্সের সাথে ইরানের সর্ম্পক কী রকম হবে? ইরানেরই বা এই জোটের প্রতি মনোভাব কেমন হবে?
‘মক্কা ডিফেন্স এ্যালায়েন্স’ এর প্রতি চীন, রাশিয়া এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি কী রকম হতে চলেছে?
১–২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কিরগিজিস্তানের বিসকেক এ ২৬ তম এস সি ও (সাংহাই কো অপারেশন অর্গানাইজেশন) সম্মেলনের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ঘোষণা এ প্রসঙ্গে অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












