আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পর তা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ শহীদ পরিবারের মধ্যে বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে বলে তথ্য দিয়েছেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম। এ ধরনের কোনো নজির ট্রাইব্যুনালে নেই বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এবার প্রথমবারের মত এ প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে প্রসিকিউশন। সারা দেশ থেকে ট্রাইব্যুনালে আসা জুলাই অভ্যুত্থানের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচার এক বছরে মধ্যে শেষের কথাও বলেন আমিনুল ইসলাম।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ আছে অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা সম্পত্তি জব্দের যে আদেশগুলো আছে, সেগুলো কীভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সেই প্রক্রিয়া আমরা শুরু করতে যাচ্ছি।
তবে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে আইনি জটিলতা রয়েছে তথ্য দিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ট্রাইব্যুনালের রুলস অব প্রসিডিউরে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন নেই। আমরা আইনকানুনগুলো পর্যালোচনা করে দেখছি। সেখানে আমাদের রুলস অব প্রসিডিউরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নাই। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনে কী ধরনের বিধান রয়েছে এবং সরকার অন্য কোনো আইন প্রয়োগ করে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এসব আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে। দ্রুতই এ বিষয়ে ফলাফল দেখা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। খবর বিডিনিউজের।
পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার চলার বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো আসামি বিচার মোকাবিলা না করে পলাতক থাকলে আইনের বিধান অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিচার চলতে পারে। তবে আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা, আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করার সুযোগ নেই।
পলাতক আসামির বিরুদ্ধে আদালত দণ্ড ও জরিমানার আদেশ দিতে পারে। তবে রায় কার্যকরের জন্য আসামিকে পাওয়া প্রয়োজন বলেও জানান আমিনুল ইসলাম। পলাতক আসামিদের সন্ধান করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া সরকারের পক্ষ থেকে অব্যাহত রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। কেউ যদি দেশের বাইরে চলে যায়, আমাদের তো একটা আইনগত প্রক্রিয়া থাকে আনতে হয়। সেই আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেও সরকার চেষ্টা করছে। নির্দিষ্ট কোনো পলাতক আসামি কোথায় অবস্থান করছে, এমন তথ্য থাকলে তা প্রসিকিউশনকে অবহিত করারও আহ্বান জানান প্রধান কৌঁসুলি। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে আপনাদের কাছে, যে অমুক আসামি অমুক জায়গায় অবস্থান করছে, আমাদেরকে তথ্য দেন, আমরা সাথে সাথে ধরে নিয়ে আসব।
জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে সারা দেশ থেকে আসা ৫৯০টি অভিযোগ থেকে বাছাই করা ১০৯টি মামলার তদন্ত ও বিচার আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ জন্য একই এলাকার একাধিক ঘটনা একত্র করে বড় পরিসরে তদন্তের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলেছেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও নরসিংদীর মত এলাকার একাধিক ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত না করে সেগুলো একত্র করে একটি তদন্তের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই সবগুলো বিষয়কে একীভূত করে আমরা তদন্তের আওতায় নিয়ে আসব। তাতে আমার সময় বাঁচবে এবং একটা তদন্তের মধ্যে সবগুলো বিষয় আমি তুলে নিয়ে আসতে পারব।
তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষের লক্ষ্য প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের লক্ষ্য হচ্ছে, আমরা তদন্ত এবং বিচার দুইটাই যাতে আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা যায়। এটা নিয়ে আমরা যেন বছরের পর বছর না ঘুরি। শহীদ পরিবার, যারা আহতদের পরিবার, তাদের তো বিচার দ্রুত পাওয়ার একটা আকাঙ্ক্ষা আছে। আমরাও চেষ্টা করছি, সে আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করতে।
জুলাইয়ের বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো নিয়েও কাজ চলছে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন “জুলাইর বিচারগুলোকে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেমনটা দেখছি, পাশাপাশি কিন্তু গুম এবং ক্রসফায়ারের যে ঘটনাগুলো, সেগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া এবং ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার নিয়ে কোনো সংঘাত দেখছেন না জানিয়ে আমিনুল বলেন, কিছু কিছু গুম স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ আর কিছু গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
গত এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে জুলাই সংক্রান্ত ৬টি মামলার বিচার হয়েছে তথ্য দিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আমি মনে করি, অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এবং স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার মধ্যে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এই ৬টি মামলার বিচার কার্য সম্পন্ন হয়েছে। এর চেয়েও যদি দ্রুত বিচারকার্য করেন, তাহলে এই বিচার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। সেই কারণে আমি মনে করি, এটা স্বচ্ছতার সাথে এবং স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে।
চলতি মাসে আরো তিনটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে বলে তথ্য দেন তিনি। আমিনুল ইসলাম বলেন, ওবায়দুল কাদেরের মামলায় যুক্তিতর্কের শুনানি চলছে এবং মাহবুবউল আলম হানিফের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। যাত্রাবাড়ীর তাইম ভূঁইয়া হত্যা মামলার যুক্তিতর্কের শুনানি কয়েকদিনের মধ্যে শুরু হবে এবং জিয়াউল আহসানের মামলাটি সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।











