নগরের ২৫টি ওয়ার্ড থেকে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে ‘ডোর টু ডোর’ বর্জ্য সংগ্রহ করবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। ওয়ার্ডগুলোতে চসিকের নিযোগকৃত বেসরকারি প্রতিনিধি বর্জ্য সংগ্রহ করবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গঠিত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কমিটির ১০ম সভায় এ ঘোষণা দেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র আজাদীকে বলেন, পাইলট প্রকল্পভুক্ত ওয়ার্ডগুলোতে আমরা এজেন্ট নিয়োগ করব। তারা ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহ করবে। যেসব ওয়ার্ড খালের কাছাকাছি সেগুলোকে পাইলট প্রকল্পে রাখা হয়েছে।
২৫টির বাইরে থাকা ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দাদের কাছ থেকে ময়লা সংগ্রহে চসিক টাকা আদায় করবে কিনা জানতে চাইলে বলেন, তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হবে না। ২৫টি ওয়ার্ডে এজেন্ট নিয়োগ করার পর ওয়ার্ডগুলোর শ্রমিকদের বাকি ওয়ার্ডগুলোতে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হবে।
এদিকে গতকালকের সভায় ২৫ ওয়ার্ড সম্পর্কে মেয়র বলেন, দীর্ঘমেয়াদে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব চট্টগ্রাম গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নগরে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই যত্রতত্র ময়লা ফেলছেন, যা নালা–নর্দমা ভরাট, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং কর্ণফুলী নদীর দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডা. শাহাদাত বলেন, বিনামূল্যে বর্জ্য সংগ্রহে বছরে হয়তো ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। কিন্তু এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে নগরবাসী ভোগ করবে। অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। সবুজ জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামে ইউটিলিটি–স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি জমি বরাদ্দ চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। তিনি জানান, কর্ণফুলী নদরী ওপারে সম্ভাব্য একটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। জমি বরাদ্দ পাওয়া গেলে আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
সভায় বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বী নগরীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলে ধরে মেয়র বলেন, চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে জুলাই মাসে বৃষ্টির কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তিনি বলেন, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এডিস মশার প্রজনন রোধে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তখন মেয়র জানান, বর্তমানে কোতোয়ালী, বায়েজিদ, বন্দর, পাহাড়তলী, হালিশহর, বাকলিয়া ও আকবরশাহ এলাকাকে ডেঙ্গুর রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আরও ১৪টি বিশেষায়িত ফগার মেশিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডা. শাহাদাত বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বীকৃত আধুনিক মশকনাশক ব্যবহার করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, যা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে নগরবাসীকে বাসার ছাদ, টব, বারান্দা, এসির ট্রে, ডাবের খোসা ও অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় নগরীর সেবার মান আরও বাড়াতে প্রকৌশল ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের আওতায় বিদ্যমান ৬টি জোনকে ৮টি জোনে উন্নীত করার প্রস্তাব সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন। তিনি বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্বের পরিধি কমিয়ে আনলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা আরও কার্যকরভাবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ডিজিটাল নাগরিক সেবা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, চসিকের নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা অ্যাপে ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার ১২৩৮টি সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, নাগরিকরা ছবি তুলে সরাসরি অভিযোগ পাঠাতে পারছেন এবং প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে তা মনিটরিং করছে। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা ও সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
নগরীর যানজট নিরসনে পরিবেশবান্ধব ই–রিকশা চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মেয়র। তিনি বলেন, নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশার মালিকদের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বৈধ ও পরিবেশবান্ধব ই–রিকশা চালু করা হবে। এতে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা কমবে, চালকদের কর্মসংস্থান বজায় থাকবে এবং নগরীর যানজটও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
সভায় নগরের ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে ভ্রাম্যমাণ দোকান উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। চসিকের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা জানান, উচ্ছেদের পর দ্রুত পুনরায় দখল হয়ে যাওয়ায় স্থায়ী সমাধানের জন্য নিয়মিত পুলিশি সহায়তা প্রয়োজন।
চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা কার্যক্রম শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শতবর্ষ স্মারক প্রকাশনা, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক আয়োজন বাস্তবায়ন করা হবে।












