হল্যান্ড থেকে

লন্ডন থেকে ফিরে এসে: যেন আছি দেশের কাছাকাছি -৩

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ২৫ জুলাই, ২০২৬ at ৯:১১ পূর্বাহ্ণ

দেশ থেকে এক পাঠক জানতে চেয়েছেন সাত সমুদ্দুর দূরের শহর লন্ডনে এসে আমার কেন মনে হয় যেন আছি দেশের কাছাকাছি। উত্তরে বলতে হয়, তার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। লন্ডনে ঘর থেকে বাইরে পা রাখতেই চোখে পড়ে একই (আমার মত) বর্ণের মানুষ, কোন কোন এলাকায় পাশ দিয়ে মহিলা পুরুষদের সিলেটি ভাষায় কথা বলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, তাদের পরনের পোশাক খুব চেনা চেনা লাগে। ফুটপাত পথচারীদের জন্যে। কিন্তু দেশের মত তার অনেকটা স্থান দখলে নিয়েছে বাংলাদেশী ভারতীয় সহ এশীয় দোকানদাররা। সেখানে তারা ডালামেলে সাজিয়ে রেখেছে কাঁঠাল, আম, সাজনা, দেশি শাকসবজি থেকে শুরু করে কী না। ফুটপাতের উপর বিক্রি হচ্ছে দেশের কাঁচা ডাব। বিক্রেতাকে ঘিরে উৎসাহী ক্রেতার ভিড়। পথ চলছেন শুনবেন গাড়ির অহেতুক হর্ন, মানুষ রাস্তা পার হচ্ছে যখন প্রয়োজন হলো তখন, সামনে একটু এগিয়ে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে নয়। মনে হয় দেখার কেউ নেই, ধরার কেউ নেই। তবে এমন দৃশ্য লন্ডনের সব জায়গায় চোখে পড়ে না। এমন দৃশ্য দেখবেন কেবল এশীয়, আফ্রিকীয়, ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসা লোকজনের যেখানে বসবাস, সেখানে। এই ধরনের দৃশ্য কী কেবল লন্ডনেই দেখা যায়? না, এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। এমন দৃশ্য আপনি দেখবেন ফ্রান্স (প্যারিস), ইতালি, পর্তুগাল, স্পেনের মত দেশের বড় বড় শহরে যেখানে আমাদের মত বিদেশিদের ভিড়। হল্যান্ডেও যে সমস্ত বড় বড় শহরে বিদেশিদের বসবাস সেখানে দেখা মিলবে এই দৃশ্য। লন্ডনের সাথে হল্যান্ডের পার্থক্যএই দেশে বাংলাদেশী কম, লন্ডনের তুলনায় হাতে গোনা। তার উপর হল্যান্ডে বাংলাদেশিরা লন্ডন কিংবা প্যারিসের মত নির্দিষ্ট কোন শহরের এক এলাকায় জোট হয়ে বসবাস করেনা। কিন্তু যে সমস্ত এলাকায় তুর্কি, মরক্কীয়, আফ্রিকীয়, সুরিনামী সমপ্রদায়ের বসবাস বা কাজকারবার, সেই সমস্ত এলাকায় গেলে মনে হবে আছি যেন দেশের কাছাকাছি। এই সমস্ত এলাকায় যদি সাদা চামড়াধারীর দেখা মেলে তা হবে অনেক বৃষ্টির মাঝে এক পশলা রোদেরমত। হেগ শহরের ওপেন মার্কেটে আপনাকে যদি চোখ বন্ধ করে এনে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে আপনার মনেই হবে না আপনি ইউরোপের কোন এক শহরে আছেন। ডানেবাঁয়েসামনেপেছনে চারিদিকে কালোয়‘ (ননয়ুরোপীয়) ভর্তি। অবাক হবোনা যদি মনে মনে গেয়ে উঠেন, ‘কালো আমার কালো ওগো, কালোয় ভুবন ভরা / কালো নয়নধোওয়া আমার, কালো হৃদয়হরা।যাই হোক

দুদিন লন্ডনের গ্রীনস্ট্রীট এলাকাটা বলা চলে চষে বেড়িয়েছি। হেন পোশাক ও আনুষঙ্গিক বস্ত্রের দোকান নেই যে যেখানে ঢোকা হয়নি। কখনো কখনো শপিংয়ে ক্লান্ত আমি (কেননা আমার অপছন্দের যে তালিকা তার শীর্ষে শপিং) দোকান থেকে বের হয়ে বাইরে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকিয়ে লোকজনের চলাচল দেখেছি। ওই সময়টায় হল্যান্ড থেকে আসা আমার সঙ্গীরা কেনাকাটায় ব্যস্ত। ওরা দারুণ উপভোগ করে। এই ব্যাপারে আমার স্ত্রী ও শ্যালিকা একেবারে শীর্ষে। ওদের কোন ক্লান্তি নেই। আর আমি মনে মনে বলি, ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু। দ্বিতীয় দিন গ্রীনস্ট্রিটে আবারো যাওয়া। উদ্দেশ্য কেনাকাটা। দলের বাকিরা এক বাংলাদেশী মালিকানায় বড় গোছের চোখধাঁধায় তেমন এক পোশাকের দোকানের ভেতর। সঙ্গীদের বলি, তোমরা দেখো, আমি বাইরে আছি। চোখ পড়লো দোকানের ঠিক প্রবেশমুখের পাশে এক বিক্রেতার উপর। একটি ডালা নিয়ে তিনি বিক্রি করছেন ঝাঁলমুড়ি। ডালায় ছাপার অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা ঝালমুড়ি। ভাবতে পারেন, ঝালমুড়ি বিক্রি হচ্ছে খোদ লন্ডনের বুকে? তাকে ঘিরে কয়েক বাংলাদেশি মহিলা, তাদের পরনে বোরকা, হিজাব। এই ঝালমুড়িওয়ালাকে গতকালও দেখেছি, তার পাশ দিয়ে গেছি। কৌতূহলবশত কাছে যাই। তখন দুপুর প্রায় দুটো। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ভাগ্নি নিপার বাসা থেকে বের হয়েছি। এরপর পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি। কফি যে খাব সেই সময়টুকু দিচ্ছেনা সাথে আসা মহিলাদের দল, সাথে এক ডাচ পুরুষও। সেও গেছে ওই দোকানের ভেতর। বাংলাদেশী পোশাকের জন্যে কোন ইউরোপীয়র এমন আগ্রহ আগে দেখিনি। একদিকে খিদে, তার উপর ঝালমুড়িভাবলাম দেখিনা কেমন লাগে খেতে। বিক্রেতাকে দেখে টের পাই, বাংলাদেশী। বয়স অনুমান করি ৪২৪৫। তবে চেহারা বা গঠন দেখে সব সময় সঠিক বা কাছাকাছিবয়স বুঝা মুশকিল। মুড়ির সাথে চানাচুর, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, মসল্লা মিশিয়ে ছোট্ট একটি ওয়ানটাইম প্লাস্টিক চায়ের কাপে বিক্রি করছেন, দাম হাঁকছেন দুই পাউন্ড, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩৩০ টাকা। মুখরোচক খাবার, ভালোই লাগলো খেতে। খেতে খেতে তার পাশে দাঁড়িয়ে টুকটাক কথা বলি। ছবি তোলা যাবে কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার ছবি নেবেন না, ডালার ছবি তুলতে পারেন।আলাপে জানতে পারলাম ১৭ বছর ধরে আছেন ইংল্যান্ডে। স্ত্রী ও সন্তান আছে, তারা বাংলাদেশে। আগে অন্য কাজ করতেন, কিন্তু সেখানে সুবিধা না হওয়ায় নিজেই এই ছোট্ট ব্যবসা খুলে বসলেন। কেমন চলে? ‘আপনাদের দোয়ায় চলছে মোটামুটি ভালো‘, তার উত্তর। জানতে চাইলাম, এই যে বাইরে ফুটপাতে বিক্রি করছেন এর জন্যে কি অনুমতি আছে? ‘আমার নিজের বিক্রি করার অনুমতি নেই। দোকানের মালিকের সিটি কাউন্সিল থেকে নেয়া অনুমতি দিয়েই আমি এখানে দাঁড়াতে পেরেছি। তবে আমাকে হাইজিন (স্বাস্থ্যবিধি) সার্টিফিকেট দেখাতে হয়েছে। এখনো পাসপোর্ট পাইনি।ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দেশ ছেড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ দেয়া এই বাংলাদেশী। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কথাটা উনি নিজ থেকেই বললেন, মনে হলো অনেকটা সংকোচে জানিয়েছিলেন। তার নামও জানিয়েছিলেন। সেটি এখানে আর লিখলাম না। কেননা মনে হলো ঢাকা শহরের কোন এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ দেয়া এই তরুণ (যখন এসেছিলেন) চান না দেশে কেউ জানুক তিনি কীভাবে স্বপ্নের দেশ বিলেতে বেঁচে আছেন, কীভাবে সংগ্রাম করে চলেছেন দেশে রেখে আসা স্ত্রী ও সন্তানদের একটি সুন্দর আগামীদেবার লক্ষ্যে। হয়তো তিনি অনেকের মত স্বপ্ন দেখেন একদিন তার স্ত্রী ও সন্তান এই ‘সোনা ফলানোরদেশে আসবে, একটি সুন্দর ছাদের নিচে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে থাকবেন, তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন লন্ডনের পার্কে, টেমস নদীর ধারে, আরো কতো কতো দর্শনীয় জায়গায়। এর আগে আমার এমনি কত সালমানের (আসল নাম নয়) দেখা মিলেছে ইতালি, স্পেন, প্যারিস এমন কী ভারত মহাসাগরের পাড়ে আফ্রিকার মরিশাসে যারা এক বুক অনিশ্চয়তা ও আশা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সালমানের ভাগ্য তাও ভালো। হাজার হাজার স্বপ্নভাঙা বাংলাদেশী তরুণদের তুলনায় অনেক ভালো আছেন। বাংলাদেশ থেকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে জীবনকে বাজিতে রেখে অনেক তরুণ এখনো বেঁচে রয়েছে পূর্ব ইউরোপের বসনিয়ার জঙ্গলে, খোলা আকাশের নিচে। সে সংবাদ পত্র পত্রিকায় দেখেছি। সে দৃশ্য কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের সাথে আলাপ করেছেন এমন এক উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিবিদের মুখ থেকে শুনেছি বছর কয়েক আগে। ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড নেবার স্বপ্ন দেখিয়ে এদের মাঝপথে ফেলে রেখে গেছে মানব পাচারকারীরা।

যাই হোক, ঝালমুড়ির কাপটি ছোট্ট হলেও দেখলাম পরিমাণে একেবারে কম নয়। দোকানের ভেতর খাবার বা ড্রিঙ্কস নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খাচ্ছি। এমন সময় দেখি বেন দোকান থেকে বের হয়ে আসছে। কাছে আসতে তাকে বলি, ‘ট্রাই ঝালমুড়ি, বাংলাদেশী প্রোডাক্ট। হাতের তালুতে নিয়ে একটু খেয়ে বলে, ‘নট ব্যাড। আর একটু দেব কি? ‘না, না। মনে হলো ঝাল লেগেছে লন্ডনের বুকে খাওয়া ঝালমুড়ি। ঝাল তো ইউরোপীয়রা তেমন খায় না, আর মুড়ি সে বোধকরি জীবনে এই প্রথম দেখলো। মাস ছয়েক আগে বেন, পুরো নাম বেন ইয়ংব্লাড, সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে হল্যান্ডের টোয়েনতে (ঞবিহঃব) ইউনিভার্সিটি থেকে অবসর নিয়েছে। কেনাকাটার পালা অনেকটা শেষ। লাঞ্চের সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। প্রথম দিন যে রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সেরেছিলাম সেখানে গিয়ে দেখি প্রচণ্ড ভিড়। কোন আসন খালি নেই। ভেতর থেকে অপেক্ষমান দীর্ঘ লাইন এসে দাঁড়িয়েছে বাইরে ফুটপাতে। মিনিট দশেক অপেক্ষা করে হাল ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেলাম আগের দিন বাংলাদেশী যে রেস্তোরাঁয় ডিনার করেছিলাম সেখানে। সেখানে খালি পাবো কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। ভাগ্য ভালো, তেমন ভিড় ছিলনা। আমাদের দেখে রেস্তোরাঁর মালিকগোছের তরুণ যিনি গত সন্ধ্যায় আমাদের সার্ভ করেছিল বেজায় খুশি। হাসিমুখ নিয়ে এগিয়ে এসে তিনটি টেবিল পাশাপাশি করে আমাদের বসালেন। অর্ডার দেয়া হলো। এলো আমের লাচ্ছি থেকে শুরু করে আমার প্রিয় গার্লিক নান ও নানা আইটেম। খাবারের মাঝপথে আমাদের সাথে যোগ দিল সহোদর, প্রকাশ। আমার ছোট, স্থায়ীভাবে ১৪ বছর ধরে থাকে লন্ডন। তার আগে ছিল মালয়েশিয়া ও পর্তুগাল। লন্ডনে আছে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে, সাথে কিশোরী নাতনি, রোদেলা। রোদেলা প্রকাশের দেশে থাকা বড় মেয়ের ঘরের নাতনি। সে এডপ্টকরে এনেছে বছর কয়েক আগে। সাথে এলো প্রকাশের ছোট মেয়ে, সনি ও তার স্বামী মিঠুন, ডাক নাম অভি। ওরা থাকে সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে ১৯৬ মাইল (৩১৫ কিলোমিটার) দূরে আয়ার (অরৎব) নদীর তীরে, লীডস শহরে। একই শহরে থাকে প্রকাশের একমাত্র ছেলে রনি, তার স্ত্রী ও তাদের ছোট্ট এক মেয়ে। সময়ের কারণে কারো বাসায় যাওয়া সম্ভব নয় আগেই জানিয়েছিলাম। সে কারণে আমাদের সাথে দেখা করতে তাদের আসা। অনেক দিন পর তাদের দেখা। ভালো লাগলো। ওরা কিছু খেলো না। জানালো ধারেকাছে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। সেখানেই লাঞ্চ সেরেছে। লীডসের নাম অনেক শুনেছি। এখনো যাওয়া হয়নি। এই নগরীতে রয়েছে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়। লীডস বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম বৃহত্তম এবং জনপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের চতুর্থ বৃহত্তম ছাত্র জনসংখ্যার কারণে এই শহরের রাতের জীবন বেশ প্রাণবন্ত। এছাড়া খেলাধুলা, ধ্রুপদী এবং জনপ্রিয় মিউজিক ফেস্টিভ্যাল এবং নানা ধরনের জাদুঘরের জন্যে এই শহরের রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। ইতিমধ্যে আমাদের খাওয়া ও আড্ডা শেষ। প্রকাশ ও তার দল বিদায় নিলো। কেননা মেয়ে ও জামাই ফিরে যাবে লীডসসে, লং ড্রাইভ। সনিকে জিজ্ঞেস করি, কে চালাবে এই দীর্ঘ পথ। ভাগাভাগি করে দুজনেই‘, তার উত্তর। দেশে জন্ম ও কিছুটা বেড়ে উঠা, নিজেকে অনেকটা নিজের মাঝে গুটিয়ে রাখা সনি, লন্ডন এসে কত আত্মনির্ভরশীল হয়েছে, সুন্দর জীবন গড়ে তুলেছে, স্মার্ট হয়েছে। দেখে খুব ভালো লাগলো। ওকে আশীর্বাদ করি। পাছুঁয়ে প্রণাম করে সনি, তার স্বামী অভি। বলে, ‘আমাদের ওদিকে (লীডস) আসবেন। ওরা বিদায় নেয়। প্রকাশ ও তার নাতনি রোদেলা ফিরে চলে তাদের বাসার উদ্দেশ্যে। হল্যান্ড থেকে আসা আমাদের দল এগিয়ে চলে, লক্ষ্য সেই শপিং। (চলবে)- ২২২০২৬।

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরের নালা-নর্দমা পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে কর্মীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধপটিয়ার শশাঙ্কমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন