উল্টো রথ টানার মধ্য দিয়ে গতকাল সম্পন্ন হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসব। এর আগে গত ১৬ জুলাই থেকে ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়। ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির ও নন্দনকানন ইসকন রাধামাধব মন্দিরের যৌথ উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার বিকেলে নগরের ডিসি হিল থেকে শুরু হওয়া শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রা হাজার হাজার ভক্তবৃন্দের সমাগম ঘটে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস–জগন্নাথ দেব হলেন জগতের নাথ বা অধীশ্বর। জগত হচ্ছে বিশ্ব আর নাথ হচ্ছেন ঈশ্বর। তাই জগন্নাথ হচ্ছে জগতের ঈশ্বর। তার অনুগ্রহ পেলে মানুষের মুক্তিলাভ হয়। জীব রূপে তাকে আর জন্ম নিতে হয় না। এ বিশ্বাস থেকেই রথের ওপর জগন্নাথ দেবের প্রতিমা রেখে রথযাত্রা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
উল্টো রথযাত্রা উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকে ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির ও নন্দনকানন ইসকন রাধামাধব মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের উল্টো রথ রথযাত্রা উৎসবের পুজো–অর্চ্চনাসহ নানা মাঙ্গলিক আচার অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরমধ্যে ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের ভোগরাগ–কীর্ত্তণ, প্রসাদ নিবেদন, হরিনাম সংকীর্তন, বিশ্ব শান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্রী যজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনা সভা, ভাগবত কথা ও শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ।
এদিকে উল্টো রথযাত্রা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) গ্রহণ করে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিএমপির বিভিন্ন ইউনিটের বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন ছিল। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়।
গতকাল বিকালে নগরীর ডিসি হিল থেকে ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির ও নন্দনকানন ইসকন রাধামাধব মন্দিরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত উল্টো রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাহবুবের রহমান শামীম। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রা মহোৎসব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির এক অনন্য প্রতীক। হাজার হাজার ভক্তের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় উৎসবকে সমপ্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে উদযাপন করতে বিশ্বাস করে। বর্তমান বিএনপি সরকার দেশের সকল ধর্মাবলম্বীর সাংবিধানিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা ও প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সমপ্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলো সুন্দর, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হচ্ছে।
সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী সকল মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। দেশের উন্নয়নের সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন সব ধর্ম ও সমপ্রদায়ের মানুষ সমান সুযোগ, মর্যাদা এবং অংশীদারিত্ব অনুভব করবেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সব সমপ্রদায়ের মানুষের অবদান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় অগ্রযাত্রায় সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আমরা একটি সমৃদ্ধ, উদার ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসকন নন্দনকানন মন্দিরের অধ্যক্ষ ও পণ্ডিত গদাধর দাস ব্রহ্মচারী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইসকন প্রবর্তক মন্দিরের অধ্যক্ষ দারুব্রহ্ম জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী। স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ আশির্বাদক হিসেবে ছিলেন ইসকনের আন্তর্জাতিক প্রধান কেন্দ্র শ্রীধাম মায়াপুরের সিনিয়র ভক্ত কমলাপতি দাস ব্রহ্মচারী ও মায়াপুর একাডেমির সহ পরিচালক তারক কৃষ্ণনাম দাস ব্রহ্মচারী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ। বিশেষ অতিথি ছিলেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাষ্টের ট্রাষ্টি দীপক কুমার পালিত, ইসকন কমিউনিকেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হৃষীকেশ গৌরাঙ্গ দাস, সাবেক কাউন্সিলর এম এ মালেক, মুকুন্দ ভক্তি দাস, সুমন চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল, বেসরকারি কারা পরিদর্শক উজ্জ্বল বরণ বিশ্বাস, মিলন শর্মা, নিতাই প্রসাদ ঘোষ, প্রশান্ত কুমার পান্ডে, বাপ্পী দে, সুজন দাশ, বাবলু চৌধুরী, বিপ্লব চৌধুরী, মিটন রবি দাস প্রমুখ।
পরে প্রধান অতিথি, উদ্বোধক ও বিশেষ অতিথি সহ অন্যান্য অতিথিগণ মিলে বেলুন উড়িয়ে জগন্নাথের রথযাত্রার শুভারম্ভ করেন। ডিসি হিল থেকে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। আয়োজকদের দাবি, শোভাযাত্রায় অর্ধলক্ষাধিক ভক্ত অংশ নেন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।











