চাষের মাছে বিপ্লব

দেশে মাছের উৎপাদন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে । প্রাকৃতিক উৎসের পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে চাষনির্ভরতা । একই সময়ে কমছে সামুদ্রিক মাছ, তিন বছরে ইলিশ কমেছে এক লাখ টনের কাছাকাছি, ইলিশের জীবনচক্রে পরিবর্তন এসেছে কিনা তা নিয়ে প্রয়োজন গবেষণা

হাসান আকবর | বুধবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

দেশে মাছের উৎপাদন এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। পুকুর, ঘের, বিল, হাওর, নদী ও সাগর মিলিয়ে দেশে মাছ উৎপাদন ৫২ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্যের পেছনে প্রকৃতিনির্ভর উৎসের পরিবর্তে চাষনির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সময়ে কমছে সামুদ্রিক মাছ ও ইলিশের উৎপাদন।

বাংলাদেশের মৎস্য অর্থনীতির কাঠামোয় গত দেড় দশকে বড় পরিবর্তন ঘটেছে বলে উল্লেখ করে মৎস্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, দেশে উৎপাদিত মাছের মধ্যে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার টন এসেছে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে, ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টন বদ্ধ জলাশয় বা চাষ থেকে এবং ৫ লাখ ৮ হাজার টন এসেছে সমুদ্র থেকে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৬১ শতাংশই এখন চাষের মাছ।

সূত্র বলেছে, ২০০৮০৯ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ২৭ লাখ টন। এরপর ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বেড়ে ২০১৪১৫ অর্থবছরে ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার টন, ২০১৯২০ সালে ৪৫ লাখ ৩ হাজার টন, ২০২১২২ সালে ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার টন, ২০২২২৩ সালে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার টন, ২০২৩২৪ সালে ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন এবং ২০২৪২৫ সালে ৫১ লাখ ১১ হাজার টনে পৌঁছেছে। ২০২৫২৬ সালে যা ৫২ লাখ টন ছাড়িয়েছে। ১৭ বছরে দেশের মাছ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অবদান চাষের মাছের। পুকুর, ঘের ও বদ্ধ জলাশয়ে উন্নত পোনা, কৃত্রিম প্রজনন, উন্নত খাদ্য, রোগ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চাষপদ্ধতির বিস্তারের ফলে মাছ উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। বদ্ধ জলাশয়ের উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে এবং অভিযোজনযোগ্য প্রযুক্তি ও প্রয়োজনভিত্তিক সমপ্রসারণ সেবা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

চাষের মাছের এই সাফল্য বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের প্রাণিজ আমিষের বড় অংশ আসে মাছ থেকে। ফলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও বেড়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে মাছ চাষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। পোনা উৎপাদন, খাদ্য, ওষুধ, পরিবহন, বরফ, আড়ত, বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ মিলিয়ে মাছকে ঘিরে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।

চাষের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও সাগরের অবস্থা নাজুক। ২০২১২২ অর্থবছরে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় ৭ লাখ ৬ হাজার টন। পরবর্তী সময়ে তা কমে ২০২২২৩ সালে ৬ লাখ ৭৯ হাজার টন, ২০২৩২৪ সালে ৬ লাখ ২৯ হাজার টন, ২০২৪২৫ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন, গত অর্থবছরে তা ৫ লাখ টনের কিছু বেশি। চার বছরের ব্যবধানে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ১ লাখ টনের বেশি কমে গেছে।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিশাল সমুদ্রসীমা থাকা সত্ত্বেও সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, গত বছরজুড়ে প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয়সহ সাগর উত্তাল থাকায় মৎস্য আহরণ ব্যাহত হয়েছে। একইসাথে দুই দফায় দীর্ঘ সময় মাছ শিকার বন্ধ থাকার বিষয়টিও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মাছ শিকার বন্ধ রাখার সময় নির্ধারণ নিয়েও ভাবার সময় এসেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

আরভি মীন সন্ধানী’ গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত জরিপ চালানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, ২০১৬ সাল থেকে এ গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বহু জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সমুদ্রের বিভিন্ন অঞ্চল ও গভীরতায় ৪৭৬ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩৭১ প্রজাতির মাছ, ২৩ প্রজাতির চিংড়ি, ৩৫ প্রজাতির হাঙর, ৩০ প্রজাতির কাঁকড়া, তিন প্রজাতির লবস্টার এবং ১৪ প্রজাতির সেফালোপোড।

দেশের ১৪টি উপকূলীয় জেলার ৫৫টি উপজেলা এবং প্রায় ২১২টি অবতরণকেন্দ্র থেকে নিয়মিত সামুদ্রিক মাছ আহরণর তথ্য সংগ্রহ করে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন এবং মজুদ সম্পর্কে একটি ডাটাবেস গড়ে তোলা হচ্ছে বলে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, এই ডাটাবেস থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাপ্ত তথ্যে মাছ আহরণের পরিমাণ কমে যাওয়ার তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অতিরিক্ত আহরণ, ছোট মাছ ও পোনা ধরা, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা, সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। তাই সাগর থেকে যথেচ্ছ মাছ আহরণ না করে কতটুকু আহরণ করলে মাছের মজুত পুনরুৎপাদনের সক্ষমতা বজায় থাকবে সেটি নিয়েও কাজ করতে হবে।

ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার ব্যাপারটিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৩২৪ সালে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, ২০২৪২৫ সালে আরও কমে ৫ লাখ টনে এবং সর্বশেষ অর্থবছরে তার পরিমাণ আরো কমে গেছে। মাত্র তিন বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে এক লাখ টনের কাছাকাছি। যা উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইলিশ রক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে অভয়াশ্রম, জাটকা সংরক্ষণ, মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখার মতো নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০২৫২৬ অর্থবছরেও প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলে পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি অর্থবছরে প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০টি জেলে পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এতো উদ্যোগের পরও ইলিশের উৎপাদন কমার জন্য নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ, প্রজননক্ষেত্রের পরিবর্তন, অবৈধ জাল, অতিরিক্ত আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদীসাগরের পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবকে দায়ী করে বলা হয়েছে, ইলিশের জীবনচক্রে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা, বা কী ধরণের পরিবর্তন এসেছে তা নতুন করে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের মৎস্য অর্থনীতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ বলে উল্লেখ করে মৎস অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, কাপ্তাই হ্রদ থেকে শুরু করে কর্ণফুলী, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ফেনী নদী এবং উপকূলীয় বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে উৎপাদিত মাছ চট্টগ্রাম বিভাগের মৎস্যসম্পদকে বরাবরই সমৃদ্ধ করেছে। ফলে জাতীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণেও চট্টগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা প্রনয়নের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের হালদা নদী কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। হালদার সঙ্গে যুক্ত খাল ও নদীপ্রবাহ রক্ষা, দূষণ বন্ধ, বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজনন মৌসুমে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে এই নদী বড় ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধডেঙ্গু প্রতিরোধে ৩ মাসের বিশেষ অভিযান, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬