সুশিক্ষার আলোয় মানবকল্যাণ

বর্ষা ঘোষ | বুধবার , ২২ জুলাই, ২০২৬ at ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের একটি মাধ্যম নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় আদর্শ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি জাতির সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো সুশিক্ষা। তবে সেই শিক্ষা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল ও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা ব্যক্তিস্বার্থের সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিবেদিত হয়।

বর্তমান যুগে শিক্ষার সাফল্যকে প্রায়শই উচ্চশিক্ষা, আকর্ষণীয় পেশা, উচ্চ আয় কিংবা সামাজিক মর্যাদার মানদণ্ডে বিচার করা হয়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য এর চেয়েও অনেক বিস্তৃত। সত্যিকার শিক্ষা মানুষের অন্তরে মানবিকতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ এবং দায়িত্বশীলতার বিকাশ ঘটায়। একজন ব্যক্তি যদি শিক্ষিত হওয়ার পরও কেবল নিজের উন্নতি ও স্বার্থসিদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকেন এবং পরিবার, সমাজ কিংবা দেশের প্রতি তাঁর কর্তব্য ভুলে যান, তবে সেই শিক্ষা তার পূর্ণ উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে না। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষা মানুষকে সত্য, ন্যায়, সততা, সহিষ্ণুতা ও সৌহার্দ্যের পথে পরিচালিত করে। একই সঙ্গে এটি সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক মুক্তি, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একজন শিক্ষিত নাগরিক কেবল নিজের জীবনমান উন্নত করেন না; তিনি তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার মাধ্যমে সমাজের অন্যদেরও আলোকিত করার দায়িত্ব পালন করেন।

পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা, মাবাবার সেবা, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করাও শিক্ষার বাস্তব ও মানবিক প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। সমাজের সাংস্কৃতিক, সৃজনশীল ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ মানুষের ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করে এবং সামাজিক সমপ্রীতি ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করে। আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা পরিহার করে সম্মিলিত উন্নয়নের চেতনা লালন করাই একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের পরিচয় বহন করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে অনেক অভিভাবক সন্তানদের শুধুমাত্র একাডেমিক সাফল্যের দিকে মনোনিবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে জ্ঞান অর্জিত হলেও মানবিক গুণাবলির পূর্ণ বিকাশ ঘটে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা, স্বার্থপরতা, আত্মপ্রচারপ্রবণতা এবং হিংসাত্মক মানসিকতার জন্ম হয়। কেবল আত্মপ্রচারে ব্যস্ত থেকে সমাজের কল্যাণে কোনো কার্যকর ভূমিকা না রাখা শিক্ষার প্রকৃত আদর্শের পরিপন্থী। এমন শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজউভয়ের জন্যই কল্যাণকর নয়। অতএব, শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যা মানুষকে শুধু দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং একজন সৎ, মানবিক, বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুশীল সমাজ গঠনে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা
পরবর্তী নিবন্ধগড়তে হবে গ্রেট গ্রিন ওয়াল