দেশ হতে দেশান্তরে

মরুতে সুইস বেদুঈন

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ১২ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

আস সালামুয়ালাইকুম! হাউ আর ইউ ড. সেলিম, এভ্রিথিং ফাইন?” বলতে বলতে রুমে ঢুকে আমার টেবিলের দিকে এগুতে এগুতে মাঝপথেই হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করলো তালাত আদ দিব!

কিংকর্তব্যবিমুঢ় আমি দ্রুত উঠে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে চেয়ারে এনে বসাতে বসাতে জিজ্ঞেস করি, হয়েছেটা কী? নিরুত্তর তালাত চেয়ারসিন হয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে প্রাণপণ। দু হাতে চোখ ঢেকে মুখ নিচু করে তাতে শব্দ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হলেও, কান্নার দমকে কাঁধ বুক ফুলে ফুলে উঠছে তার!

হতবুদ্ধি অধম ভাবছি, হলোটা কী? মিশর থেকে পরিবার পরিজনের কোন খারাপ খবর এলো কী? তা যদি হয়ও, তারপরও এরকম কান্না ঠিক যায় না তার হাবভাবের সাথে। সারাক্ষণই তো হাসিখুশি দেখে আসছি গাট্টাগোট্টা তালাতকে। যদিও লক্ষ করেছি অধীনস্থ বাসেমের সামনে হয়ে যায় তার চোয়াল শক্ত। মিলিটারি কায়দায় তটস্থ রাখে তাকে সে। তদুপরি অফিসের ফিসফাস এসেছে যা কানে, জানি তাতে মিশরি ইসলামিক ব্রাদারহুডের রিয়াদ শাখার না হলেও আমাদের অফিসের উপশাখার বড় চাই তালাত। আর সব মৌলবাদীদের মতো আছে যাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ইতিহাস।

আচ্ছা এই কান্নাটি কি পূর্বপরিকল্পিত? না হয়, এই সাতসকালে রুমে সালাম দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে, দরাজটাই বা টেনে দিয়েছিল কেন? যাই হোক, দরোজা ভেজানো থাকায়, কারো নজরে পড়ছে না ভেতরের নাটকিয়তা, কারণ যার জানি না এখনো!

ডঃ সেলিম, ইউ হেড মিটিং উইথ নাহরাওয়ি। ইউ ডোন্ট বিলিভ মি? আই এম ভেরি সে!” চোখমুখ মুছে নিজেকে সামলে উঠতে উঠতে অভিমান নাকি অভিযোগের ছুড়ল তীর!

যাক বাবা! মনে হচ্ছে ক্লু পাওয়া গেল। ঈদ শেষে দেশ থেকে ফেরার পর, যে ব্যাপারটি এর আগে ঢাক ঢাক গুড় গুড় করছিল, সেটি এক্কেবারে হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়েছিল ঘাড়ে। বড়ই ব্যস্ততায় কেটেছে গত দিন দশেক তাই। এরই মধ্যে সে বিষয়ে এই তালাতের সাথেই বসেছিলাম বার তিনেক। কিন্তু পাইনি কোনই কূলকিনারা!

যতোই সে বিষয়টি নিয়ে সবজান্তা ভাব ধরুক না কেন, কথা বলতে গিয়ে যখনই প্রশ্ন করেছি, উত্তরে এদিক ঐদিক হাতড়ানো দেখে মনে হয়েছে আসলে সে জানে না কিছুই। দুয়েকবার এও মনে হয়েছে যে, ইচ্ছে করেই কাশছে না সে ঝেড়ে। অথচ ঐসব প্রশ্নের হাজির জবাবই পেয়েছি নাহরাওয়ির কাছে।

নাহ, এ নিয়ে কোন নমনীয়তা দেখালে, নির্ঘাত এ বসবে চেপে ঘাড়ে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো। তা তো হতে দেওয়া যায় না। নিরাবেগ দিলাম উত্তর তাই, কেন আমি তো তোমার সাথেই বসেছিলাম আগে!

না মানে, আমি তো ভ্যাক্সিন বিষয়ে কিছু জানি না।”

আমিও জানি তা। তোমাকে কোন দোষারোপ করেছি কি সেজন্য? শোন, কাজ তো আমাকে করাতেই হবে।যে কাজ যে জানে, তাকে দিয়ে সেটা করানোটাই তো আমার কর্তব্য।

না মানে, ভাবছিলাম তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না। মনে রেখ নাহরাওয়ি কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটরের লোক। বিরাট মিচকা শয়তান। আমি ইন্সটিউশন সেলসের দায়িত্ব নেবার পর, তার অনেক শয়তানি ধরে ফেলেছিলাম। আচ্ছা সে কী তোমাকে কিছু বলেছে আমার সম্পর্কে?”

শোন, আমি এখানে পলিটিক্স করতে আসি নাই। কাজে এসেছি। নাহরাওয়ির সাথে কাজ ভিন্ন অন্য কোন কথাই হয়নি।

ওকে, ওকে ডঃ সেলিম, বুঝেছি।” কান্নার ভাব একদমই গেছে উবে কণ্ঠ থেকে। বরং হাত কচলাতে কচলাতে হাসি হাসি মুখে কথা কটি বলেই, প্রসঙ্গ পাল্টাল তালাত– “বুঝলে ডঃ সেলিম, ঐ বাসেম কিন্তু এখন সারাক্ষণই অফিসে ঘুর ঘুর করে। ফিল্ডে না গেলে সেলস তো সাফার করবে।” ওহ তাই নাকি? চল চা খেতে খেতে শুনি। বলেই দুজনের জন্য দুটো মিন্ট টিয়ের অর্ডার করলাম। তারপর সরাসরি ছুঁড়লাম প্রশ্ন, আচ্ছা বল তো বাসেমের জব রেসপন্সিবিলিটি কী?

৫০% সেলস এন্ড ৫০% মার্কেটিং।”

ঠিক । সেলস নিয়ে সে কি করছে সেটা অবশ্যই তুমি ভাল জানো। আমি তা নিয়ে মাথা ঘামাব না। ঐ ব্যাপারে তুমি তার বস, তুমিই বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু তার মার্কেটিংয়ের কাজে যে বিরাট গ্যাপ দেখেছি, সেটাও বলেছি তোমাকে।

আমি তো আসলে মার্কেটিংয়ের কিছু জানি না।”

জানি তো। সেজন্যও তোমাকে বলেছি কি কিছু ? বলিনি বাসেমকেও। বলবোই বা কেন? বেচারাতো মার্কেটিংয়ের কাজ করার সুযোগ বা গাইড্যান্স কোনটাই পায় নি। অফিসে কোন বসার জায়গাও তো তার ছিল না। সেই ব্যবস্থাও করেছি তোমার সাথে আলাপ করেই। তারপরও তোমার যদি সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ থাকে সেটা বল।

না না, মানে কোন অভিযোগ নাই। বলছিলাম অফিসে বসার জায়গা পাওয়ার পর থেকে কেমন যেন একটা ভাব এসেছে তার। ঠিক আছে উঠি এখন। কিং ফাহাদ ইন্সটিউটে যাবো একটু পর। থ্যাঙ্ক ইউ”বলেই লম্বা এক চুমুকে কাপের বাকী চা টুকু শেষ করে উঠে গেল তালাত।

সাতসকালে এরকম নাটকীয়তার কী মানে? এযাত্রা রিয়াদে পৌঁছে তৃতীয়দিনেই মীটিঙয়ে বসতে হয়েছিল, হেডকোয়ার্টার থেকে আসা ভ্যাক্সিন ডিভিশনের লোকজনদের সাথে। হুট করে জরুরি ভিত্তিতেই এসেছিলেন তাঁরা। প্রতি হজ মৌসুমেই, সৌদি সরকার প্রচুর পরিমাণে মেনিনজাইটিস ভাক্সিন কিনে থাকে। ভ্যাক্সিন ডিভিশনের ঐ কার্যক্রম এতোকাল দুবাইস্থ রিজিওনাল অফিস পরিচালনা করলেও, এখন থেকে হবে তা সৌদি থেকেই সরাসরি। এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে হেডকোয়ার্টার। কারণ, এই মরুতে একটা ভ্যাক্সিনপ্লান্ট বসানোর কথা দিয়েছিলেন আমাদের চেয়ারম্যান, বাদশাহকে।

যার বিপরীতে বাদশাহ কথা দিয়েছিলেন, কোম্পানির মালিকানা বিষয়ক সৌদি আইন বদলে, আমাদের সৌদি অপারেশন চলেছে যা এতকাল সৌদি মালিকের তত্ত্ববাবধানে, চলে আসবে তা সরাসরি আমাদের কান্ট্রি অফিসের নিয়ন্ত্রণে। এসেছি সেই এসাইনমেন্টেই আমি। দেশে ও সিংগাপুরেও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ অধমই যেহেতু ভ্যাক্সিন ব্যবসা দেখাশোনা করতাম, সে যুক্তিতে এখানকার সে দায়িত্বও দিয়েছেন তুলে বস, ঘাড়ে। বরাবরের মতোই না করিনি। শুধু চেয়েছিলাম বাড়তি লোকবল। বিনা ওজর আপত্তিতেই মেনে নিয়েছেন তা, ফিল রাশ। তো ঐ দায়িত্ব ঘাড়ে উঠতে না উঠতেই পেয়েছিলাম টের, সময় নাই হাতে। হজের প্রস্তুতি হিসেবে, সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ও এ সময় শুধু যে নড়ে চড়ে বসে, তাই নয়! যে সব বিষয় স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্যুরোক্রেসি থাকে বছরভর কুম্ভকর্ণনিদ্রায়, সে সব নিয়ে এসময়ই শুরু হয় তাদের হুটোপুটি হুড়াহুড়ি।

ঐ মেনিনজাইটিস ভ্যাক্সিন নিয়ে পড়েছি আমি সেই চক্করে। তদুপরি এ বিষয়ে সৌদি অফিসের কারোই নাই অভিজ্ঞতাও। তারপরও ঐ ব্যবসার পুরোটাই যেহেতু ইন্সটিউশনাল, প্রথমেই বসেছিলাম, তা নিয়ে তাই তালাতের সাথে। বলেছিই তো যে, তার সাথে দুইতিনবার বসেও পাচ্ছিলাম না কোন কূল কিনারা। এদিকে উড়ছিল সময় রকেট গতিতে। এমতাবস্থায় কপাল ভাল যে মনে পড়েছিল, কথায় কথায় একদিন মোহাম্মেদ গা’র বলেছিল, আমাদের ডিসট্রিবিউটরের, টেন্ডার বিজনেস হেড নাহরাওয়ির কথা। তার মতে ২০ বছরের হাতে কলমের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিশরি নাহরাওয়ির নাকি সৌদি ইন্সটিটিউশনাল বিজনেসের জীবন্ত এনসাইক্লপেডিয়া। সে কথা মনে পড়তেই দ্বারস্থ হয়েছিলাম তার। এছাড়াও কপাল ভাল যে, বিজনেস মডেল বদল নিয়ে, এই দালানের দুই অংশের, কান্ট্রি অফিস ও ডিসট্রিবিউটর অফিসের মধ্যে চলমান ঠাণ্ডা যুদ্ধ, উপেক্ষা করে এখানে আসার পর থেকে নিরন্তর চেষ্টা করেছিলাম ঐ অফিসের সিইও, সুইস ব্রুনো সাফিনোর সাথে ভাব জমাতে। চলবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানুষকে সত্যিকার অর্থে চেনা যায় অনুভূতি দিয়ে
পরবর্তী নিবন্ধজীবনেরে কে রাখিতে পারে