চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, বায়ু ও নদী দূষণসহ পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের প্রধান মঞ্চ পরিবেশ আদালত, চট্টগ্রাম। অথচ এই আদালতটিতে এখন স্থবিরতা বিরাজ করছে। পাহাড় রক্ষা কিংবা দূষণকারীকে শাস্তির আওতায় আনার বদলে এই আদালতে এখন অধিকাংশ সময় ব্যয় হচ্ছে ফৌজদারি দায়রা মামলাসহ দেওয়ানি মামলার বিচারে। এর ওপর গত দেড় বছর ধরে আদালতটিতে নেই কোনো নিয়মিত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ আদালতের স্থবিরতার বড় কারণ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা। আইনজীবীরা আইনটি সংস্কারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
বিদ্যমান আইনে যেকোনো নাগরিক সরাসরি পরিবেশ অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন না। পাহাড় কাটা বা পরিবেশ দূষণের মতো ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী বা সচেতন নাগরিককে আগে পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে হয়। অধিদপ্তর সেটি সরেজমিনে যাচাই করে যদি মনে করে মামলা করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, কেবল তখনই তারা মামলা করতে পারে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং মাঠ পর্যায়ে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম চলতে থাকে।
শূন্যতায় কাটছে দেড় বছর : আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো পরিচালনার জন্য বর্তমানে কোনো পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নেই পরিবেশ আদালত চট্টগ্রামে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দায়িত্বরত পিপির নিয়োগ বাতিল করা হয়। এরপর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এই বিশেষ আদালতে নতুন পিপি নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
দায়রা মামলার চাপ : একটি বিশেষ আইনের বিচার নিশ্চিত করার জন্য এই আদালত গঠিত হলেও বর্তমানে এখানে মামলার অনুপাতে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আদালতটিতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের মামলা রয়েছে ১০৯টি। বিপরীতে ফৌজদারি ও দেওয়ানি দায়রা মামলার সংখ্যা প্রায় ১৯০০টি। আদালতের বিচারক বর্তমানে নিজেই চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। যে ৫ জন অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) দায়রা মামলা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তাদের একজনকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি ব্যস্ত থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উক্ত ৫ জনের অপর একজন বর্তমানে উক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ আদালতকে কার্যকর করতে হলে অবিলম্বে একজন পিপি নিয়োগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ আইনকে আরো সহজতর করা, যাতে সরাসরি আইনি প্রতিকারের পথ প্রশস্ত হয়। একইসঙ্গে পরিবেশ আদালতকে দায়রা মামলার দায়ভার থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র পরিবেশ সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে।
পরিবেশ আদালত, চট্টগ্রামের বেঞ্চ সহকারী আলাউদ্দিন আহমেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিবেশ আদালত কক্ষে বর্তমানে চারটি আদালতের কার্যক্রম চলছে। একটি হচ্ছে পরিবেশ আদালত। অপরগুলো হচ্ছে ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ যুগ্ম দায়রা জজ আদালত। পরিবেশ আদালতে মামলা রয়েছে ১০৯টি। অন্যদিকে দায়রা সংক্রান্ত আদালতগুলোতে মামলা রয়েছে ১৯০০’র মতো। পরিবেশ আদালতের বিচারকই দায়রা মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তিনি বলেন, সর্বশেষ অ্যাডভোকেট হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী রুবেল পরিবেশ আদালতের পিপি ছিলেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। এরপর থেকে এ আদালতে পিপি নেই। অন্য একজন দায়রা মামলার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের মামলাগুলো রাষ্ট্রপক্ষে দেখভাল করছেন।
পরিবেশ আদালত চট্টগ্রামে বর্তমানে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অ্যাডভোকেট শাহজাহান দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের মামলা পরিচালনায় বর্তমানে নিয়মিত পিপি নেই। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে একজন দায়িত্বে রয়েছেন। তার নাম অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন। তিনি ব্যস্ত থাকায় বর্তমানে আমি তার দায়িত্ব পালন করছি। তিনি বলেন, মামলা কম থাকায় মামলা নিষ্পত্তিতে কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। সাক্ষী হাজির থাকলে সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। রায়ের জন্য প্রস্তুত হলে রায় দেওয়া হচ্ছে। সবকিছু ঠিকভাবে চলছে। তবে নিয়মিত পিপির বিকল্প নেই। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পরিবেশ বিষয়ে শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরই মামলা করতে পারে। অন্য কেউ পারেন না। পরিবেশ আদালতে মামলা কম থাকার পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী ও সিনিয়র আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের মামলা কমের পেছনে একমাত্র কারণ হচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের জটিলতা। এ জটিলতার কারণে একজন ব্যক্তি সরাসরি মামলা করতে পারেন না। এক্ষেত্রে আইনটি সংস্কার করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির দৈনিক আজাদীকে বলেন, জরিমানার দিকেই মনোযোগ পরিবেশ অধিদপ্তরের। মামলা খুবই কম হয়। পরিবেশ বিষয়ে যে কেউ মামলা করতে পারে না। আইনে সংশোধনী এনে যে কেউ যাতে মামলা করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, মামলা যেগুলো হয় সেগুলোতে আসামির সাজা তেমন একটা হয় না। আইনে কারাদণ্ডের বিকল্প জরিমানা থাকায় এ অবস্থা। আইনে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা জরিমানা থেকে ‘অথবা’ শব্দটা বাদ দিতে হবে। তিনি বলেন, পরিবেশের মামলায় দেখা যায়, দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল হয় না, সাক্ষী হাজির করতেও বিলম্ব হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরকে কার্যকর ভূমকা রাখতে হবে। সেই সাথে প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তরিকও হতে হবে।











