জীবনের প্রথম চাকরিতে বেতন পেতাম ২ হাজার টাকা। পাঁচশত টাকা খরচের জন্য রেখে বাকী টাকা মায়ের হাতে দিয়ে দিতাম। কিছুদিন পর দ্বিতীয় চাকরিতে বেতন পেতে শুরু করি চার হাজার টাকা। ২ শত টাকা অধিক বরাদ্দ করে ৭ শত টাকা রেখে বাকী ৩ হাজার ৩ শত টাকা মায়ের হাতে দিয়ে দিতাম। এমনে, উপন্যাস টুপন্যাস পড়ে মহৎ আদর্শ ইত্যাদি মনে উঁকি দিত বটে, কিন্তু সেজন্য না, আমি প্রায় পুরো টাকা মাকে দিতাম ইনভেস্ট হিসাবে এবং বিশ্বাস করতাম এই ইনভেস্ট লসহীন। সিরিয়াসলি বিশ্বাস করতাম, এই ব্যবসায় এক টাকাও লস গুণতে হবে না। গুণতে হয় নি। মা মারা গেছেন আড়াই দশক, সেই ইনভেস্টের লাভ বাড়তেই আছে। অর্থনৈতিক রিজিক কিম্বা ক্যারিয়ার প্ল্যান নিয়ে আমার প্রথম টেনশন আসে ক্লাস সেভেন এইটে থাকতে। আমার বাবার বেতন কত হাজার ১২ চৌদ্দশ। উনি আশা করতেন আমি অন্তত মেট্টিক পাশ করবো এবং কোথাও একটা ছোট কাজ জুটিয়ে নেব। আমি এমএ পাস পণ্ডিত হবো এদ্দুর উনি আশা করেন নি। সেভেন–এইটে থাকতে আমি আল্লাহর কাছে বরাবর ৩ হাজার টাকার একটা চাকরি চেয়ে মোনাজাত করতাম। মনে করতাম মাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা পেলে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত টেনশনমুক্ত থেকে ফুটবল কবিতা ধর্মের নানা কল্পনা নারী বিষয়ক স্বপ্নসহ একটা ঘোরযুক্ত বাস্তব জীবন যাপন আনন্দের সাথে শেষ করা যাবে।
যা হোক জীবনের ঘোর দুই হাতে সরিয়ে সরিয়ে আসতেছি। এখনও সরাই। সরাতেই হয়। ‘আন্না কারেনিনা’ ঘোরে ডুবেছে। যা কিছু ফ্যান্টাসি লালন অপসারণ করি নি কেন অর্থনৈতিক রিজিক বিষয়ে সিরিয়াসলি ধর্মাদেশ বুঝার চেষ্টা করেছি। টাকা পয়সা বিষয়ে ফাইনালি বুঝছি যে পরিমাণের উচ্চতায় ধনী পরিমাণের নিচতায় দরিদ্র, এই বুঝে নিজেই দরিদ্র। ভাগ্যে বিশ্বাস আর স্বাভাবিক পরিশ্রম ও যোগ্যতার বৃদ্ধি ও ব্যবহার দ্বারা ৩ হাজার অথবা ৩ লাখ অথবা ৩০ লাখ অথবা তিন কোটি–একই কথা আর মাঝে আছে বরকত।
আমি যখন ২ হাজার টাকা বেতন পেতাম তখন, ৪ হাজার টাকা বেতন পেতাম তখন সবসময় নিজেকে ধনী মনে করতাম আর সেটাকে স্থায়ী করার নিয়তে মা তে ইনভেস্ট করার পরিকল্পনা করেছি। কারণ আমার দরকার বরকত। দুনিয়ার কোনও ইনভেস্টই ঝুঁকি মুক্ত না কিন্তু আমি নিজে সাক্ষী বেতন মা কে বুঝিয়ে দেওয়ার চাইতে বুদ্ধিমানের কাজ আর কিছু না। টাকার পরিমাণ আমার জন্য কখনই মেটার হয় নি। আমার বিশ্বাস যে সৎ ইনকাম আর মা কে বুঝিয়ে দেওয়া–এটার বরকত সারাজীবন পাবো। আসল ব্যাপার এটা মাতৃভক্তি বললে পুরা বিষয়টা ক্লিয়ার হয় না বরং একটু নেকামি ভাব আসে, এটা আসলে ব্যবসায় সূত্র। ধনী হওয়ার ব্যবসায়টা সবচেয়ে ভালো হয় টাকাপয়সা মা জননীর প্রজেক্টে ইনভেস্ট করায়।আমি জানি না বাকী জীবন আমার এই ধনী অবস্থা বিরাজ করে কিনা, না করলে তো বিপদে পড়ে যাবো। মা বেঁচে নেই।










