টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) স্বাভাবিক কার্যক্রম। জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস, পরিবহন সংকট, শাটল ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ও পরবর্তীতে ট্রেন চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৮ জুলাই সব ধরনের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে। পরে বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় ৯ জুলাইও একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। প্রশাসন জানায়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং যাতায়াতের দুর্ভোগ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ক্যাম্পাসজুড়ে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। দুইজন শিক্ষার্থীকে সাপে কেটেছে। এসব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন শিক্ষক–শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
যাতায়াতে চরম ভোগান্তি, শাটল ট্রেনও বন্ধ : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন শাটল ট্রেনে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে রেললাইনের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়া, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং সার্বিক দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে প্রথমে শাটল ট্রেনের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে পড়ে। নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল না করায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয় শিক্ষার্থীদের। পরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে শাটল ট্রেন চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি গতকালও সারাদিন শাটল চলাচল বন্ধ ছিলো। অন্যদিকে চট্টগ্রাম–হাটহাজারী সড়কের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় বাস, সিএনজি টেক্সি ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে আসতে পারেননি, আবার অনেকে ক্যাম্পাসে আটকা পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন, ‘শাটল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছি আমরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করেও ট্রেন পাইনি। পরে বিকল্প যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ক্যাম্পাসে যেতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী আবার মাঝপথ থেকে ফিরে গেছেন।’
ক্লাস–পরীক্ষা বন্ধ, থমকে গেছে একাডেমিক কার্যক্রম : দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, জলাবদ্ধতা এবং পরিবহন সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন টানা দুই দিনের জন্য সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করে। এতে বিভিন্ন বিভাগের সেমিস্টার পরীক্ষা, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও নিয়মিত ক্লাসসূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, স্থগিত হওয়া ক্লাস ও পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে জানানো হবে। বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘অনেকদিন ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় পুরো পরিকল্পনাই এলোমেলো হয়ে গেছে। আবার কবে পরীক্ষা হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছি। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকায় সেশনজটের শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।’
ক্যাম্পাসে বাড়ছে সাপের উপদ্রব : অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড়, ড্রেন ও পাহাড়ি এলাকা থেকে সাপ বের হয়ে বিভিন্ন আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন এবং সড়কসংলগ্ন এলাকায় চলে আসছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে পৃথক ঘটনায় দুইজন সাপে কাটা শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। যদিও তারা বর্তমানে শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে। তবে এ ঘটনা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড় পরিষ্কার এবং দ্রুত সাপ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী জাকির খন্দকার বলেন, ‘প্রতিদিনই হলের আশপাশে কিংবা ঝোপঝাড়ের পাশে সাপ দেখা যাচ্ছে। দুইজন শিক্ষার্থীকে সাপে কাটার ঘটনার পর আমরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতেও ভয় লাগে।’
বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা : ভারী বর্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ছোট–বড় পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে কাটা পাহাড় এলাকায় দুই পাশেই পাহাড় ধসে পড়েছে। কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশে মাটি ধসে পড়ায় চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
আবাসিক হলে দুর্ভোগ, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সমস্যাও : বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে বৃষ্টির পানি প্রবেশ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং ড্রেন উপচে পড়ার কারণে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কিছু হলে কক্ষের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন এবং ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যা দেখা দেওয়ায় অনলাইনভিত্তিক একাডেমিক ও ব্যক্তিগত কাজেও বিঘ্ন ঘটেছে। শাহজালাল হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, বৃষ্টির পানি কক্ষে ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিকভাবে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে, কাপড়–চোপড় ও বইপত্রও ভিজে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সমস্যার কারণে পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে অপেক্ষা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এখন এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে। একদিকে বন্ধ একাডেমিক কার্যক্রম, অন্যদিকে ব্যাহত পরিবহন চলাচল, সাপের উপদ্রব ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ক্যাম্পাস জীবন থমকে গেছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা সংস্কার, ক্যাম্পাস পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা জোরদার, সাপ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং শাটল ট্রেনসহ পরিবহন ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। আবহাওয়ার উন্নতি হলে পরিস্থিতি পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।











