চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, জলাবদ্ধ হাজারো পরিবার

সড়ক ডুবে যোগাযোগ ব্যাহত, ভেসে গেছে চাষের মাছ ও ফসলি জমি

আজাদী ডেস্ক | বুধবার , ৮ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

দুই দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতির। ক্ষতি হয়েছে ফসলি জমির। জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে হাজারেরও বেশি পরিবার।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট থেকে জানা যায়, আনোয়ারায় টানা ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন রয়েছেন লক্ষাধিক গ্রাহক। ১১ ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়কে জলবদ্ধতায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রাউজানে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র চাপে ভেঙে গেছে ডাবুয়া খালের বেড়িবাঁধ। বাঁধভাঙা পানি হুহু করে লোকালয়ে প্রবেশ করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কাপ্তাই সড়কের পাহাড়তলী এলাকা পানিতে ডুবেছে। উপজেলার অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হাঁটু থেকে কোমর পানিতে ডুবেছে। হাটহাজারী মহাসড়কের বড়দীঘির পাড়, নন্দীরহাট, আমান বাজার (আংশিক) পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চলাচল করছে। বাঁশখালীর উপকূলীয় বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। খানখানাবাদ, সাধনপুর, বাহারছড়া, সরল, গন্ডামারা, শেখেরখীল ও ছনুয়া এলাকার বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। মীরসরাইয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে রোপা আউশ। অনেক গ্রাম জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত, জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। লোহাগাড়ায় বেড়িবাঁধের ভাঙন দেখা দেওয়ায় খালপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে ও গাছপালা পড়ে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎবিহীন রয়েছে অনেক এলাকা। চন্দনাইশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে আছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নিম্নাঞ্চলের শত শত পরিবার। পাহাড়ি ঢল নামতে শুরু করায় শঙ্খনদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। অবিরাম বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ভয়াবহ বন্যার আশংকা করা হচ্ছে। উপজেলার অসংখ্য মৎস্য প্রজেক্ট পানিতে টইটম্বুর হয়েছে। এছাড়া জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায়ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

আনোয়ারা : উপজেলায় ১১ ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। সদর ইউনিয়নের ডাকবাংলা সড়ক, সরস্বতী স্কুল সড়ক, জয়কালী বাজার সড়ক, চাতরি চৌমুহনী বাজার সড়কসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে দুই থেকে তিন ফুট পানি জমে রয়েছে। বসতঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। এদিকে গত সোমবার গভীর রাত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় লক্ষাধিক গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। মোবাইল নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিও ব্যাহত হয়েছে বলে অভিভাবকরা জানিয়েছেন। আনোয়ারা পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝড়ো হাওয়ায় ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি লাইনের ক্ষতি হওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সময় লাগছে।

রাউজান : পাহাড়ি ঢলের তীব্র চাপে রাউজানের ডাবুয়া খালের বেড়িবাঁধ ভেঙে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় ডাবুয়া, চিকদাইর, কদলপুর, পাহাড়তলী, উরকিরচর, গহিরা, গুজরাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কাপ্তাই সড়কের পাহাড়তলী এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে এবং অনেক সড়ক হাঁটু থেকে কোমর পানির নিচে চলে গেছে। বহু পুকুর ও জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রাহাতুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং দুর্গতদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

হাটহাজারী : অঙিজেনহাটহাজারী মহাসড়কের বড়দীঘির পাড়, নন্দীরহাট ও আমান বাজার এলাকায় পানি ওঠায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। পাহাড়তলী ও আশপাশের এলাকায় বসতঘরে পানি ঢুকেছে। বিভিন্ন খাল ও ছড়ার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মির্জাপুর ইউনিয়নের মুহুরী পুকুরপাড় এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের গাইড ওয়াল ধসে পড়ায় জনচলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে। বিভিন্ন পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটছে। উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ফটিকছড়ি : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফটিকছড়িতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হালদা নদী, ধুরুং খাল, সর্তা খাল ও ফটিকছড়ি খালের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে নিম্নাঞ্চল, ফসলি জমি ও বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। বিবিরহাট বাজার সংলগ্ন ধুরুং খালের বাঁধ ঝুঁকিতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে।

মীরসরাই : মীরসরাইয়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক বসতঘর পানিবন্দি হয়েছে। রোপা আউশ ও অন্যান্য কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে। ওয়াহেদপুর, পোলমোগরা, সৈদালী ও ইছাখালী এলাকার বিভিন্ন গ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। ইউএনও সোমাইয়া আক্তার জানিয়েছেন, পানিবন্দি পরিবারের তালিকা পেলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

বাঁশখালী : টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ছনুয়া, পুইছড়ি, শেখেরখীল, বাহারছড়া, সাধনপুর, খানখানাবাদ ও সরলসহ বিভিন্ন এলাকায় বসতঘর, ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় এক হাজারের বেশি পরিবার জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে জোয়ারের চাপে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। খানখানাবাদ ইউনিয়নের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, আউশের বীজতলা ও সবজি ক্ষেতের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সিপিপি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সতর্কতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

চন্দনাইশ : চন্দনাইশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পাহাড়ি জনপদ ধোপাছড়ির বিভিন্ন সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শঙ্খ নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যার শঙ্কা বাড়ছে। নিম্নাঞ্চলের সবজি ক্ষেত ও মৎস্য প্রকল্প পানির নিচে চলে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, পাহাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

লোহাগাড়া : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লোহাগাড়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডলু, টংকাবতী, হাতিয়া, হাঙ্গর ও অন্যান্য খালছড়ার পানি বেড়ে অনেক এলাকায় লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় খালপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আবাদি জমি, সবজি ক্ষেত ও মাছের খামার পানিতে তলিয়ে গেছে। আধুনগর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকায় বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়বৃষ্টিতে বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ উপড়ে পড়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে খালের পাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং দুর্গত পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে ডিসি
পরবর্তী নিবন্ধনগরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে সমন্বিতভাবে কাজ করছি