সমকালের দর্পণ

ইরানে পরাজিত আমেরিকা -২

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ৫ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

৮ মে ২০১৮ দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে এক ঘোষণার মাধ্যমে ‘জে সি পি ও এ’ (জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান) থেকে তার দেশকে প্রত্যাহার করে নেয়। এ ঘটনা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলেও আমেরিকা তার পরাশক্তি বলে তাতে মোটেও কর্ণপাত করেনি। বরং ইরান আক্রমণের সুযোগ নেওয়ার জন্য নানা অজুহাত সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে থাকে। ১৩ জুন ২০২৫ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আমেরিকইসরাইলের ইরান আক্রমণ ঐ সুযোগ খোঁজার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এখন এটা প্রমাণিত সত্য যে এ দুটি আক্রমণের পিছনে ইসরাইল এবং ওয়াশিংটনে তার জোরালো লবী আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে নিদারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। ‘সুগার হাই’ এবং ‘ম্যাডম্যান’ থিওরির কবলে পড়া আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইসরাইলী প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে ইরান যুদ্ধে নেমে পড়েন। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ডোনাল্ট ট্রাম্পকে এটি বুঝাতে সক্ষম হন যে যুদ্ধের প্রথম ধাক্কায় ইরানী সম্মুখ সারির নেতা এবং সামরিক কমান্ডারদের খতম করা হবে। এর পর একে একে সামরিক স্থাপনাগুলি গুড়িয়ে দেওয়া হবে, এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক যাঁতাকলে থাকা সাধারণ ইরানীরা রাস্তায় নেমে আসবে, জনরোষে ‘রিজিম’ তথা সরকারের পতন ঘটবে। তারপর তেহরানে আমেরিকা ইসরাইলের একটি তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। আপনি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন সারা বিশ্বের সর্বেসর্বা কর্তৃত্বের মালিক। ‘সুগার হাই’ এবং ‘ম্যাডম্যান’ থিওরিতে আক্রান্ত ট্রাম্প গদগদ হয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যুক্তিতে ইরান যুদ্ধে নেমে পড়েন। এমন পটভূমিতে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সমালোচকরা উচ্চকণ্ঠ হন, ট্রাম্পের কাছে এখন ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নয় ‘ইসরাইল ফাস্ট’, ‘আমেরিকা ইসরাইলের প্রক্সি’। এমনকি ট্রাম্পের কড়া সমালোচকরা বলা শুরু করেন ‘US media refuses to inform US people that it is entirely a Israeli war fighting by the US’. আমেরিকান সংবাদ মাধ্যম আমেরিকান নাগরিকদের একথা জানাতে অস্বীকৃতি বা অপারগতা দেখাচ্ছে, যে ইরান যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে একটি ইসরাইলী যুদ্ধ যাতে আমেরিকা জড়িয়েছে এবং এ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

যা হোক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুরু হয়ে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলা ৪০ দিনের পর যুদ্ধ বিরতিতে এসে দেখা গেল ইসরাইলআমেরিকা এ যুদ্ধে তাদের যে তিনটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্ধারণ করেছিল, এগুলোর কোনটিই তারা অর্জন করতে পারেনি, যেমনইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস, রিজিম বা শাসকশ্রেণীর পরিবর্তন এবং ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। তারা যা পেরেছে তা হল যুদ্ধের শুরুতে ‘টমাহক’ ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে ১৬৫ স্কুল ছাত্রীকে হত্যা, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ইরানের আকাশে আমেরিকা ইসরাইলের যুদ্ধ বিমানগুলি ১৩ হাজারেরও বেশি বার উড়ে এবং ১২ হাজার ৩০০ টি লক্ষ্যবস্ত্তুতে আঘাত হানা।

এতসবের পরও ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান লক্ষ্যবস্ত্তু সমূহে নির্ভুল পাল্টা আঘাতে এবং হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে অবরোধের ফলে সামরিক এবং অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে আমেরিকার অবস্থা হয়ে পড়ে অনেকটা লেজে গোবরে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকা মরিয়া হয়ে যুদ্ধ বিরতির উপায় খুঁজতে থাকে। এমতাবস্থায় পাকিস্তান এগিয়ে আসে। বিশেষ করে পাকিস্তানী সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনীর। সংকট উত্তরণে পথ খুঁজতে প্রস্ত্তুতিমূলক বৈঠকে ইসলামাবাদে যোগ দেয় তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরব।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতায় এবং মধ্যস্থতায় ১১ এবং ১২ এপ্রিল ২০২৬ ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে ৩০০ সদস্যের আমেরিকান প্রতিনিধি দল এবং ইরানী পার্লামেন্টের স্পীকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এর নেতৃত্বে ৭০ সদস্যের প্রতিনিধি দল এ বৈঠকে অংশ নেয়। এ বৈঠকে বিদ্যমান যুদ্ধ বিরতি বজায় রাখার সমঝোতা এবং সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে সম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণে বা ইরানী পারমাণবিক কর্মসূচীর ব্যাপারে বৈঠকে কোনও ধরনের সমঝোতা বা এম ও ইউ স্বাক্ষর হয়নি। প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ এর ঘোষণা দেন। এর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৪ মে ২০২৬ পাকিস্তান, সৌদি আরব সহ মুসলিম দেশ সমূহকে তার প্রণীত আব্রাহাম এ্যাকর্ড এ স্বাক্ষর করার জন্য আহ্বান এবং চাপ দেন। সব দেশ এতে অস্বীকৃতি জানায়। আব্রাহাম এ্যাকর্ড কী?

আব্রাহাম এ্যাকর্ড’ হল ডোনাল্ট ট্রাম’এর গত মেয়াদে আমেরিকার উদ্যোগে ইসরাইল এবং ইউনাইটেড আরব আমিরাতের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি। এ চুক্তির মূল কথা তথা ঘোষণা ছিল ‘We, the undersigned, recognize the impotence of maintaining and strengthening peace in the Middle East and around the world based on mutual understanding and coexistence, as well as respect for human dignity and freedom, including religious freedom’ ইসরাইল এবং ইউনাইটেড আরব আমিরাতের মধ্যে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মর্মার্থ হল পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে শান্তি, সহাবস্থান, পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানবতার মাহাত্ম্য, স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে স্ব স্ব ধর্মাচরণ। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হল ইসরাইল এবং আমেরিকা কোনও দেশই মধ্যপ্রাচ্য তথা ফিলিস্তিনে ঘোষিত এইসব নীতির একটিও পালন করেনি বা করছে না। এরই প্রকৃষ্ট প্রমাণ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সৌদি আরব এবং ফ্রান্স, প্যালেস্টাইন এবং ইসরাইল এর মধ্য বিদ্যমান দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্যালেস্টাইন এবং ইসরাইল দ্বি রাষ্ট্র গঠনের একটি যৌথ প্রস্তাব উত্থাপন করে। আনিত এ প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ১৪২ ভোট, বিপক্ষে ১০ ভোট এবং ১২ টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে।

উল্লেখ্য বিপক্ষের এ ১০ ভোটের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অন্তর্ভুক্ত বাকী ৯ দেশের মধ্যে রয়েছে খোদ ইসরাইল, আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, পালাউ, পাপুয়া নিউগিনি, প্যারাগুয়ে এবং টোঙ্গা। নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত এই প্রস্তাবকে ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অনেকের ধারণা ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’ হয়ত দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর ধরে চলে আসা মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ করে নিপীড়িত প্যালেস্টাইনীদের জন্য একটি নিরাপত্তা নিশ্চিতের উপায় হবে। জুলাই ২০২৫ থেকে চলে আসা এ উদ্যোগের সফল সমাপ্তির পূর্বে জাতিসংঘের মহাসচিব তার মন্তব্যে উল্লেখ করেন ‘the central question for Middle East peace is implementation of the two – State solution, where two independent, sovereign, democratic States – Israel and Palestine -live side by side in peace and security. এর সরল অর্থ হল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে দুই রাষ্ট্র প্যালেস্টাইন এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠা, দুটি রাষ্ট্রই হবে স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক। প্যালেস্টাইনইসরাইল শান্তি এবং নিরাপত্তার সাথে পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস করবে। বাস্তবতা হল আমেরিকা এই প্রস্তাব গ্রহণে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়, অথচ পৃথিবীর সমস্ত দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে।

ফিলিস্তিনীরা ১৫ মে কে ‘নাকাবা ডে’ তথা ‘দুর্যোগের দিন’ হিসাবে পালন করে। ইতিহাসের নিষ্ঠুর এবং নির্মম পরিহাস হল ১৫ মে ১৯৪৮ সালে ৭,৫০,০০০ (সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) ফিলিস্তিনীকে স্ব ভূমি থেকে বিতাড়িত করে, ৫০০ এর উপর ফিলিস্তিনী গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে যে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা সে ইসরাইল এর এখন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে অনীহা, অস্বীকৃতি। আর আমেরিকা এই ইসরাইলের পিছনে থেকে তাকে সামরিক, আর্থিক এবং কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে চলেছে, উপরনু্ত্ত মুসলিম বিশ্বকে এখন হেদায়েত করে ইসরাইলের সাথে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষর করে ইসরাইরাইলকে স্বীকৃতি দিতে। সৌদি আরব, পাকিস্তান, বাংলাদেশনরসহ পৃথিবীর গরিষ্ঠ সংখ্যক মুসলিম দেশ দ্বি রাষ্ট্র তথা ফিলিস্তিন এবং ইসরাইলী দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তখন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

উইকেন্ড উইথ ব্লুমবার্গ’ এক সময়ের বিবিসি ওয়ার্ল্ড এর সুবিখ্যাত সাংবাদিক মিসেল হোসেনের সাক্ষাৎকার মূলক একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের একটি পর্বে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত কূটনীতিক এবং ‘হ্যাজ চায়না ওয়ান’ বই এর রচয়িতা কিশোর মাহবুবানীর বক্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি, ‘193 countries of the world are having a compartment in the same boat, so when the boat is sinking, try to save your compartment is having no sense but to save the boat. অর্থাৎ পৃথিবী নামক নৌকাটিতে ১৯৩ টি কক্ষ তথা দেশ রয়েছে, নৌকা তথা পৃথিবী যখন ডুবন্ত তখন নিজের কক্ষটি তথা দেশটিকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে নৌকা তথা পৃথিবী বাঁচানোর চেষ্টা করাই যুক্তিযুক্ত। আমেরিকা এ পর্যন্ত পৃথিবী বাঁচানোর চেষ্টা করেনি, নিজেকে ছাড়া, ফলে পৃথিবী নামক নৌকাটির অন্য কক্ষের বাসিন্দারা কেবল ডুবার ভয়ে থেকে নাকানিচুবানিই খেয়ে চলেছে।

ইরান যুদ্ধ এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে ইরান যুদ্ধ থেকে আমেরিকা যে পরাজয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত স্বাদ নিয়েছে তা বহুকাল আমেরিকান নীতি কৌশল তথা সমরবিদদের মনে গেঁথে থাকবে নিঃসন্দেহে। আরিজোয়ানার সিনেটর জন ওসাফের ভাষায় ইরান যুদ্ধ আমেরিকার জন্য ‘গ্লোবাল হিউমিলিয়েশান’ বা বিশ্বব্যাপী এক অপমান ছাড়া অন্য কিছু নয়।

আমেরিকার ইরান যুদ্ধে এই অপমানজনক পরাজয়কে মূলত আমি নিম্নোক্ত পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করতে চাই। যেমন

ক। নৈতিক, খ। অর্থনৈতিক, গ। ভূরাজনৈতিক এবং ঘ। সামরিক। (চলবে)

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআলহাজ্ব্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী (রহ.)
পরবর্তী নিবন্ধখামেনির শেষকৃত্যে বাংলাদেশের পক্ষে স্পিকারের শ্রদ্ধা