ইরানে পরাজিত আমেরিকা

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অবঃ) | রবিবার , ২৮ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ

৫ এবং ১২ এপ্রিল ২০২৬ দৈনিক আজাদীর এ পাতায় প্রকাশিত আমার লেখা ছিল ‘ইরানে আমেরিকার জন্য এক লজ্জা জনক পরাজয় অপেক্ষায়’। দুটি উপ সম্পাদকীয়তে লেখা দুটি প্রকাশিত হলে পাঠকদের ব্যাপক সাড়া আমাকে অনেকটা দ্বিধায় ফেলে। পরাজয় তো আমেরিকার জন্য অপেক্ষায়, তবে তা কবে। এখন আমার সমস্ত দ্বিধার মেঘ কেটে গেছে। এখন আমি নিশঙ্কচিত্তে অবলীলায় বলতে পারি আমেরিকা এখন পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আমেরিকা অতীতেও যে একই কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে মানুষের জন্য যে দুর্ভোগ দুর্বিপাক সৃষ্টি করেছিল তার একটি উদাহরণ উপস্থাপন করছি।

১৯৬৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ভিয়েৎনামী জাতির অবিসংবাদিত নেতা হো চি মিন আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন’কে এক চিঠিতে লেখেন :

The US govt. has committed war crimes, crimes against peace. And against mankind in South Vietnam, half a million US and satellite troops have resorted to the most inhuman weapons and most barbarous methods of warfare…….to massacre our compatriots, destroy crops,… destroying towns, villages, factories, Schools. ….May I ask you: who has perpetrated these monstrous crimes? …US govt. is entirely responsible for the extremely serious situation in Vietnam. অর্থাৎ ভিয়েৎনামে আমেরিকান সরকার যুদ্ধ অপরাধ, শান্তির বিপরীতে অনাসৃষ্টি, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে, ৫ লক্ষেরও অধিক আমেরিকান এবং তাদের তাবেদার সৈন্যরা মারাত্মক সব মারনাস্ত্রের সাহয্যে যুদ্ধের বর্বরতম কৌশল অবলম্বন করে আমাদের জনগণের উপর গণহত্যা, শস্যাদি বিনষ্ট, শহর- গ্রাম, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসে লিপ্ত। আমি আপনার কাছে জানতে চাই এই দানবিক অপরাধে কারা জড়িত?… ভিয়েৎনামে এই বিপর্যয়কর অবস্থা সৃষ্টিতে আমেরিকান সরকার সম্পূর্ণভাবে দায়ী।

Fire On the Lake মার্ক হারম্যান এবং ভলকো রুনকে’র লেখা ভিয়েৎনাম যুদ্ধের বীভৎস ভয়াবহতা, মানবিক বিপর্যয় ইত্যাদির দগদগে এক বর্ননামূলক এক বই। এ বইতে উল্লেখ আছে ভিয়েৎনামী নেতা হো চি মিন ১৯৪৫-৪৬ এ আমেরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রু ম্যান’ এর কাছে ভিয়েৎনামের স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য চেয়ে আবেদন জানিয়ে ছিলেন। ট্‌্রু ম্যান – হো চি মিন’এর সে আবেদনে সাড়্ল্লা দেননি। বরং কালে দেখা গেল আমেরিকা দখলদার ফ্‌্রান্সের পক্ষ নিয়ে ভিয়েৎনামিদের উপর মানব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়। এর পরিনতি কি হয়েছে সে ইতিহাস পৃথিবীর মানুষ জানে।

১৩ জুন ২৫ ইসরাইল আমেরিকার সম্মতিতে ইরান আক্রমণ করে বসে। অথচ ১৫ জুন দুই দেশের আলোচনা নির্ধারিত ছিল তার আগেই ১৩ জুনের আক্রমণ। কূটনীতির ইতিহাসে এটি ‘এপিক বিট্রায়েল’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ইসরাইলকে সহায়তা করতে ২১ জুন ২০২৫ আমেরিকা ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নাম দিয়ে তার বিমান বহরের সবচেয়ে শক্তিশালী বি ৫২ বোমারু বিমানের মাধ্যমে ইরানের পারমানবিক স্থাপনা ‘ফরডো’ ‘নাথানজ’ এবং ‘ইস্পাহান’ এর উপর আক্রমণ শুরু করে। এই হামলায় অংশ নিতে আরিজোয়ানার হোয়াইটম্যান এয়ার বেইস থেকে ৭ টি বি ৫২ বোমারু বিমানসমূহ অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি বি ৫২’র বুকে ছিল ৩০০০০ (ত্রিশ হাজার) পাউন্ড ওজনের ২টি করে জি বি ইউ-৫৭/বি বাংকার বাস্টার প্যাট্‌্িরয়ট বোমা।

এই আক্রমণ পরিচালনার পরপরই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন `We obliterated Iran’s nuclear caoacity so they did’nt get a nuclear bomb. That attack should have been done long before I came along’. এর সরল অর্থ আমরা ইরানের পারমানবিক সক্ষমতাকে বিনাশ করেছি, এ কাজটি আরো অনেক আগেই সম্পন্ন করা উচিত ছিল।

দিন যেতে আমেরিকা বুঝে যায় ‘আমরা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে বিনাশ করেছি’ হাওয়ায় যে ঘোষণা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট দিয়েছেন তা ভুয়া বা ভুল। পরিনতিতে পুনরায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আমেরিকা এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের উপর সামরিক অভিযান পরিচালনা শুরু করে। এ অভিযানের পিছনের কারণ বরাবরের ইরান ভীতি। আরো নির্দিষ্ট করে ইরান পারমানবিক শক্তিধর হয়ে উঠছে সেই শঙ্কা।

এই শঙ্কা এবং ইরানের উপর আমেরিকা ইসরাইলের এই আক্রমণের পটভূমি তৈরী হয় বহু পূর্বে ২০০৭ সালে ইসরাইলী শহর হারজেলিয়ায়। হারজেলিয়ায় ‘ব্যালেন্স অব ইসরাইল’স সিকিউরিটি’ নাম দিয়ে প্রতি বছরের ঐ সম্মেলনে প্রথমবারের মত ৪২ জন আমেরিকান কৌশল প্রণেতা যোগদান করেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গর্ডন ইংল্যান্ড, উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিকোলাস বার্নস, প্রিন্সটন ইউনির্ভাসিটির অধ্যাপক বার্নাড লেউইস। ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ এলমার্ট সহ মন্ত্রী সভার প্রায় অর্ধেক মন্ত্রী এই সম্মেলনে উপস্থিত হন। সম্মেলনে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

এই সম্মেলনে আমেরিকা এবং ইসরাইল দুটি দেশই একই যুক্তিতে উপনীত হয় – ইরান পারমানবিক শক্তিধর হলে মধ্যেপ্রাচ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়বে আর আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর চাপিয়ে দেওয়া কৌশল আর ধোপে টিকবে না। এখানে আমেরিকার নীতি নির্ধারক এবং কৌশল প্রণেতাদের সামনে আরো একটি বিষয় উঠে আসে তা হল ইরান পারমানবিক শক্তি সার্মথ্যের অধিকারী হলে মধ্যেপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও ভারসাম্যের কথা বলে পারমানবিক শক্তি অর্জনের পথে পা বাড়াবে। এ অবস্থায় মধ্যেপ্রাচ্য জুড়ে আমেরিকার বিদ্যমান প্রভাব প্রবলভাবে বিপর্যস্ত হবে। এর বাইরেও ইরান পারমাণবিক শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হলে মধ্যে প্রাচ্যে আমেরিকার তাবেদার সরকারগুলি অস্থিতিশীলতার মুখে পড়বে যা নিশ্চিত ভাবে আমেরিকার স্বার্থের প্রতিকূলে যাবে। এসব ভাবনা থেকে পাশ্চাত্য এবং ইসরাইলের কোন কোন কৌশল প্রণেতা ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জনের আগেই তার পারমানবিক স্থাপনা সমূহ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যুক্তি তুলে ধরেন।

ইতিমধ্যে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দীর্ঘ কূটনৈতিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ইরানের সাথে পারমানবিক বিষয় নিয়ে একটি সমাধানে পৌঁছেন যা ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করে।

২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’ এর মাধ্যমে ইরান পশ্চিমাদের সাথে একটি রফায় পৌঁছেছিল। কিন্ত্তু ইসরাইল চায়নি ইরান স্বসম্মানে স্বগৌরবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক। এ কারণেই ক্যাপিটাল হিলের ইহুদি লবী পি-৫ +১ অর্থাৎ জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য + জার্মানি কর্তৃক স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান থেকে আমেরিকাকে বেরিয়ে যেতে উস্কানি দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’ এ যে সমস্ত ধারা ছিল তা পাঠকের জন্য তুলে ধরছি:

ইরানের ইউরেনিয়াম মওজুদ ৯৮ র্পাসেন্ট কমিয়ে ৩০০ কে জি তে নামিয়ে আনতে হবে এবং পরর্বতী ১৫ বছর এ অবস্থায় স্থিত রাখতে হবে। এই স্থিত মওজুদ ইউরেনিয়াম এর মান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর সমদ্ধৃকরণ মান ৯০ এ নেওয়া যাবে না এবং তা ৩.৬৭ এ স্থিত রাখতে হবে।

‘নাথানজ’ পারমানবিক স্থাপনার ২০০০০ (বিশ হাজার) সেন্ট্রিফিউজ কমিয়ে, ৫০৬০ (পাঁচ হাজার ষাট) এ নামিয়ে আনতে হবে এটি ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে। ফ্রাডো পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রে ২০৩১ পর্যন্ত কোন প্রকার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ গবেষনা পরিচালনা করা যাবে না।

ইরান তার ‘আর্ক’ পারমানবিক স্থাপনা রি ডিজাইন করতে সম্মত হয়। এই রি ডিজাইন এর ফলে এখানে কোন প্রকার পারমানবিক অস্ত্র তৈরী করা যায় সেরকম প্লুটুনিয়াম উৎপাদন ব্যবস্থা থাকবে না। ইরান পারমানবিক জ্বালানী সমৃদ্ধকরণ উদ্দেশ্যে আর কোন স্থাপনা নির্মাণ করবে না। ইরান, আই এ ই এ (ইন্টারন্যশনাল এ্‌টমিক এনার্জি এজেন্সি) কর্তৃক তার পারমানবিক স্থাপনা পরিদর্শনের ইচ্ছে পোষণ করলে ২৪ (চব্বিশ) দিনের মাথায় তা করতে দিতে সম্মত হয়।

জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান এর বলে ইরান তার অবরুদ্ধ ১০০ (একশত) বিলিয়ন ডলারের ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী রপ্তানী এবং গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ পাবে।

১৬ জানুয়ারি ২০১৬ আই এ ই এ (ইন্টারন্যশনাল এ্‌টমিক এর্নাজি এজেন্সি) ইরান জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান এর সব ধারা পূরণ করেছে বলে নিশ্চিত করে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ চুক্তি অনুমোদন করে, ইতিপূর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা ১৮ অক্টোবর ২০১৫ ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’, এড্যাপশান ডে বা গ্রহণের দিন হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। আমেরিকার ইতিহাসের পাতায় সীমাহীন কলঙ্ক লেপন করে পরবর্তী আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম ‘জে সি পি ও এ’ থেকে তার দেশকে প্রত্যাহার করে নেয়। (চলবে)

লেখক : কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক; গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅভীক ওসমানের গণায়ন বৃত্তান্ত
পরবর্তী নিবন্ধফিরলেন সিঁথি, নাচলেন অলংকার