ভালোবাসার তুল্য শুধু ভালোবাসাই

রাশেদ রউফ | মঙ্গলবার , ১১ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আমাকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেনআমার ব্যক্তিগত জীবন আর সাহিত্য জীবন প্রায় অভিন্ন। নানা সময়ে লেখায় কিংবা সাক্ষাৎকারে আমি বলেছি, ঘুমানোর সময়টা বাদ দিলে বলা যায় দিনের প্রায় পুরোটা সময় আমার চলে পড়ালেখা ও লেখালেখিতে। আমার সাংবাদিকতা, আমার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, প্রকাশনা ও সাহিত্যআড্ডাসবই এই লেখালেখির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার লেখালেখির প্রধান চর্চিত মাধ্যম হলো শিশুসাহিত্য। যদিও ছড়া ও কিশোরকবিতার বাইরে কিশোর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করেছি, শিশুসাহিত্যের ওপর গবেষণাও করেছি। লিখেছি বড়দের কবিতাও। জীবনী নিয়েও কাজ করেছি। বলা যায়, চট্টগ্রামে অবস্থান করে বাংলাদেশের সাহিত্যে সামান্য কাজ করার চেষ্টা। অনেকে জানেন, কিশোরকবিতায় আমার মনোযোগ একটু বেশি। কিশোরকবিতা রচনা করে, কিশোরকবিতা সংকলন সম্পাদনা করে এবং কিশোরকবিতার সম্মেলন বা পাঠচক্রের আয়োজন করে আমরা একটা আন্দোলন পরিচালনা করেছি এবং করছি। আমার বন্ধুদের নিয়ে এই শাখায় আরো অনেক কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে আমার।

তবে আমি মনে করি, আমার পরিচয়আমি একজন কর্মী। একজন সাহিত্যকর্মী, একজন সংস্কৃতিকর্মী, একজন সংবাদকর্মী। আরো সীমিত করে বললে বলা যায়, আমি শিশুসাহিত্যের একজন কর্মী। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, জসীমউদদীন প্রমুখের কবিতা পড়তে পড়তে নিজের ভিতর কিশোরকবিতার আবেশ কখন তৈরি হয়েছে, নিজেই যেন জানি না।

বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো নির্মল রসপুষ্ট কিশোরকবিতার উৎসমুখ রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ‘বীর পুরুষ’, ‘আমাদের ছোট নদী’, ‘তালগাছ’, যতীন্দ্র মোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’, বুদ্ধদেব বসুর ‘নদীস্বপ্ন’ এবং নরেশ গুহর ‘রুমির ইচ্ছে’সহ ছোটোদের অনেকগুলো কবিতা আমাদের ভালো লাগার উঠোন জুড়ে আছে। পরবর্তী সময়ে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুজন বড়ুয়া, আখতার হুসেন প্রমুখের কবিতা আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। আমি নিজেও চর্চায় যুক্ত হই।

১৯৯৫ বছর থেকে ২০২১ টানা পঁচিশ বছরে প্রচুর ‘অন্ত্যমিল’ প্রকাশিত হয়েছে আজাদীর আজমিশালীতে। এখনো এই ছড়াকলাম চালু আছে। পাতাটির নতুন নাম ‘খোলা হাওয়া’। ২০১৫ সালে এখান থেকে বাছাই করা কিছু লেখা নিয়ে একটা গ্রন্থ প্রকাশের তাগাদা দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, কীর্তিমান কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক ড. ময়ুখ চৌধুরী। বস্তুত ২০১৬ সালে আদিগন্ত প্রকাশন থেকে আমার প্রকাশিত ‘অন্ত্যমিলসমগ্র:১’ তাঁরই উৎসাহের ফসল।

এই ছড়াকলামে সামপ্রতিক বিষয়, মানে একেবারে তরতাজা ঘটনার চিত্রায়ন ঘটে। আজ যা ঘটেছে, তার ওপরই লেখা হয়ে থাকে এই ‘সমকালীন ছড়া’। বক্তব্যের তাৎক্ষণিকতা অনেক সময় লেখার শিল্পগুণকে নষ্ট করে ফেলে। সামপ্রতিক ঘটনার ওপর নির্মিত বলে ছড়াগুলোর স্থায়িত্ব সম্বন্ধেও সন্দেহ জাগতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কালের চাকা ঘোরার সাথে সাথে এসব ছড়ার অধিকাংশই স্থান পাবে ডাস্টবিনে। তবে আমি মনে করি, সাময়িকতার আমেজ কেটে গেলেও ঘটনার পরম্পরা কালের ইতিহাস হিসেবে নির্ণিত হবে। মনে রাখতে হবে ‘সাময়িকতার দিকে ছড়ার স্বাভাবিক উন্মুখতা দুর্নিবার’। চলমান ঘটনার ওপর নির্মিত ছড়া বা কবিতাকে বুদ্ধদেব বসু ‘পদ্যসাংবাদিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে তাকে তিনি সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেউ যদি একে কবিতা বলতে না চান, নাই বললেন, না হয় এ পদ্যসাংবাদিকতাই হলো, কিন্তু সাংবাদিকতাশুধু পদ্যে নয়, গদ্যেও কখনো কখনো সাহিত্যের এবং স্থায়ী সাহিত্যের আসন পেয়েছে, ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিরল নয়। মূল্যটা যেখানে মতেরসেখানেই অচিরতার আশঙ্কা, কিন্তু মূল্যটা যেখানে রূপের সেখানে অনেকটা নির্ভর হওয়া যায়।’

আমি জানি না, আমার লেখাগুলি সময়ের বিবেচনায় কতোটা উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। সময়ের সাথে সাথে লেখাগুলিও যে হারিয়ে যেতে পারেনষ্ট হয়ে যেতে পারে তার আবেদনসেই শংকা ছিলো শুরু থেকেই। তাই লেখা লিখেই দায়িত্ব শেষ করেছিলাম। খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় নি বলে পত্রিকার কাটিংও সংগ্রহে রাখি নি প্রথম প্রথম। মনে করেছিলাম সংবাদের মতোই আজ যা সঙ, তা কাল বাদ বা বাতিল বিবরণী হয়ে যাবে। কিন্তু দিন যতই যায়, আমার ছড়াকলামের পাঠক বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে এর গুরুত্ব। কেননা, আমি আমার ছড়াগুলিতে মত আর রূপের সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করেছি। মেদহীন অঙ্গের মাধ্যমে এবং উগ্রতাহীন ব্যঙ্গের মাধ্যমে আমি ডিঙোতে চেয়েছি সাময়িকতার সংকীর্ণতা। পাঠকের মন জয় করাই শুধু আমার লক্ষ্য নয়, সাহিত্যসেবাও আমার ব্রত। অন্ত্যমিলের কবি হিসেবে সবাই আমাকে চেনে। কোথাও গেলে আমার নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অন্ত্যমিলের রাশেদ রউফ হিসেবে আলাদা মর্যাদা পাই।

আমার শিশুসাহিত্যে বিশেষত কিশোরকবিতায় মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও দেশপ্রেম প্রাধান্য পেয়েছে। নিসর্গ ও প্রকৃতিকেও তুলে ধরার চেষ্টা করে গেছি আমি। আসলে দেশপ্রেম না থাকলে কেউ লেখক হতে পারবে না। আর প্রকৃতি এমন এক অনুষঙ্গ, যা পুরনো হবে না, ফুরোবে না। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে না গেলে অনুভূতি তেমন স্নিগ্ধ হবে না। সাহিত্যের নানা রচনার দিকে তাকালে আমরা দেখবোসব লেখকই প্রকৃতির বন্দনা করেছেন। এক অর্থে সকল কবিই প্রকৃতির কবি।

নীরবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছি আমার লেখালেখি, সাংবাদিকতা, প্রকাশনা ও সাংগঠনিক কাজে। তারজন্য পাঠকের ভালোবাসাও পেয়েছি, পেয়েছি সম্মান। এই জীবনে যতো পুরস্কার আমি পেয়েছি, সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার হলো মানুষের ভালোবাসা। অনেক লেখক আমাকে বই উৎসর্গ করেছেন, সেটাও আমি মনে করিআমার বড় প্রাপ্তি। যদিও জানি, পুরস্কারের জন্য কেউ লেখালেখি করে না, পুরস্কার পেয়ে গেলে উৎসাহিত হন সবাই। আমিও ঠিক তেমন। লেখালেখিটাই মুখ্য। আমি বিশ্বাস করি, যশখ্যাতিমোহ’র দিকে না তাকিয়ে নিষ্ঠার সাথে কাজের সাথে লেগে থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই।

গত ৬,৭ ও ৮ আগস্ট শেষ হলো চট্টগ্রাম একাডেমির ২৫ বছর পূর্তি উৎসব। বিশাল একটি যজ্ঞ। তিন দিনের এই উৎসবে ছড়া কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, সংগীত, অন্যান্য আয়োজন ছাড়াও ছিলো ৩টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। এগুলো হলো : ‘চট্টগ্রামের কবিতায় ছন্দনৈপুণ্য ও নিরীক্ষা’, ‘চট্টগ্রামের কথাসাহিত্যে বৈচিত্র্য’ ও ‘চট্টগ্রামের শিশুসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ’। এছাড়াও ছিলো দুই গুণী ব্যক্তিত্বের সম্মাননা। তাঁরা হলেন, ক্যাপ্টেন (অব.) উস্তাদ আজিজুল ইসলাম ও খালেদা আউয়াল। উৎসবে আমি আমার বন্ধুদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। বন্ধুরা মনপ্রাণ উজাড় করে কাজ করেছে, উৎসবে উপস্থিত থেকে প্রাণিত করেছে, সহায়তা দিয়েছে। এ সহযোগিতা অতুলনীয়। ভালোবাসার তুল্য শুধু ভালোবাসাই। আমি যে তাদের ভালোবাসি, সেই ভালোবাসার মূল্য তাদের ভালোবাসার চেয়ে কম। সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ফেলো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঝুঁকিতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি : উত্তরণে চাই কার্যকর পদক্ষেপ
পরবর্তী নিবন্ধবীর মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন দাশগুপ্ত আর নেই