চুলার রান্না হচ্ছে না, গ্যাস নেই। ঘরে বাতি জ্বলে না, বিদ্যুৎ নেই। কারখানার চাকা বন্ধ, চাকরি হারাচ্ছে চাকরিজীবীরা। কঠিন এক বিভীষিকাময় পরিবেশে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্বহীন হ–য–ব–র–ল অবস্থার মাঝে হাবুডাবু খাচ্ছে জনগণ।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনৈতিক সংকট ক্রমশ বাড়ছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম আইন সংশোধন, মুদ্রানীতি ঘোষণা, বন্দর বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অনেকটা একক সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। শ্রমিক অসন্তোষ চরমে ওঠে। দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগে ধস নামে। শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়ে। দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিচার শেষ হওয়ার আগেই বড় মাপের শতাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। লোকসানে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এতে বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকে। রাজস্ব আদায় কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকে সাধারণ মানুষ। শ্রমশক্তি রপ্তানিতে নানামুখী আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সুফল পাওয়া যায়নি। সরকারের আয় বাড়াতে শতাধিক পণ্য ও সেবা খাতে নতুন করে ভ্যাট আরোপ হয়।
অর্থনীতির বিশ্লেষক ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সময় আর্থিক খাতে অস্থিরতা চলে। বিমান বন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে। এতে বিশ্ববাণিজ্যে ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে দেশের ব্যবসা–বাণিজ্য।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল শক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ গত এক দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে নাজুক ও সংকটাপন্ন সময় পার করছে। উচ্চ সুদের ধাক্কা, জ্বালানিসংকট, ডলার সংকটজনিত কাঁচামাল আমদানির বাধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মতো অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ চাঙা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে কেবল সুদের হার কমিয়ে উদ্যোক্তাদের ভয় কাটানো যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রথম ‘মনস্তাত্ত্বিক আস্থা’, তারপর রয়েছে এর স্থায়িত্ব।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মে মাসে নামতে নামতে দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪.৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং বিগত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩.৪৯ শতাংশে। বহুমুখী এই অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘চতুর্মুখী আক্রমণের’ মুখে পড়ে দেশের শিল্প উৎপাদনন, কর্মসংস্থান ও সার্বিক প্রবৃদ্ধির গতি এখন মারাত্মকভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া বিনিয়োগে স্থবিরতা কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি, বরং এটি একাধিক সংকটের একটি সম্মিলিত ফল।
ব্যবসা–বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘স্থায়িত্ব’ ও ‘আস্থা’। নীতিগত অস্পষ্টতা থাকলে দেশি–বিদেশি কোনো উদ্যোক্তাই দীর্ঘমেয়াদি মূলধন খাটাতে চান না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন কর ও নীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ঘন ঘন পরিবর্তন ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বেসরকারি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল সুদের হার বা ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট নীতি–কাঠামো, রাজস্ব ব্যবহার সহজীকরণ এবং ব্যবসায়ী সমাজের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।
এক কথায় বলতে গেলে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমার জন্য উচ্চ সুদ বা ডলার সংকট হলো বর্তমানের বাহ্যিক লক্ষণ, আর নীতিগত অনিশ্বয়তা ও মনস্তাত্ত্বিক আস্থার অভাব হলো গভীরে থাকা মূল্য সমস্যা। ডলারসংকট আমদানিকে রুদ্ধ করেছে, উচ্চ সুদ ঋণের পথ কঠিন করেছে, নীতিগত অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের নতুন ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত রাখছে। এই বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও ধীর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বর্তমানে সুসংহত অবস্থানে রয়েছে অতিক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাত। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং শ্রমশক্তির ৮৫% কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে শিল্পায়ন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে এই খাতের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন তিন কোটির বেশি মানুষ। দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখছে।
অথচ দেশের লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যবসা শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যে অনেকে মূলধন হারিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা মিলে এসএমই খাতকে চাপে ফেলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের সুদ বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, কর ও প্রশাসনিক জটিলতা, বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি সব মিলিয়ে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, লাঘামহীন মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ–জ্বালানির চড়া দাম এবং ব্যবসার সার্বিক মন্দাভাবের কারণে চরম আয়সংকটে পড়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। আর এই খাতের বিপর্যয়সরাসরি আঘাত হেনেছে ব্যাংক খাতে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার বড় ধরনের বিপদসংকেত তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বাজারে ছোট উদ্যোক্তাদের পণ্য ও সেবার চাহিদা কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। একইসঙ্গে কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ ব্যবসার পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ব্যবসার কাঙ্ক্ষিত আয় না থাকা এবং পরিবার পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে একদিকে যেমন প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি চালানো তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকও স্বীকার করেছে এসএমই কার্যক্রমের মন্থর গতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কমে যাওয়াই এই ছোট ঋণে খেলাপির ধস নামার প্রধান কারণ।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে দেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্যাসের তীব্রসংকট। গত মাসের ২১ তারিখ থেকে এটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা যাচ্ছে না। গ্যাসসংকটের কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে, আবার কিছু কারখানায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন স্থগিত রাখার ঘটনাও ঘটছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সময়মতো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক মহা সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বলা যায়, এই সংকট অর্থনীতিকে স্থবির করে রাখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকটের ফলে যে সময়েরও অপচয় হচ্ছে, সেটি সরাসরি জাতীয় উৎপাদশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহের কারণে কর্মঘন্টা হারিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে ১.৩ থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, গ্যাস সংকট সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পেট্রোবাংলার বরাত দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। আর স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ হয় ৩০০ কোটি ঘনফুট। আবার চাহিদার অধিকাংশ পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে আমদানীকৃত এলএনজির সরবরাহ এবং দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর পেছনে দায়ী অর্থ এবং গ্যাস খাতের অনুসন্ধান ও উত্তোলন ব্যবস্থায় ঘাটতি। এ অবস্থার আশু সমাধান না করা গেলে দেশের অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়বে। সুতরাং সময় থাকতেই সাধু সাবধান।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।








