শাহাদাতে কারবালা ঈমানের পরীক্ষার চরম সাফল্য

ফখরুল ইসলাম নোমানী | বৃহস্পতিবার , ২৫ জুন, ২০২৬ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

আল্লাহর হাবিব আখেরি নবীর প্রিয় দৌহিত্র হজরত আলী (রা.) এর আদরের দুলাল, জান্নাতি রমণীদের সরদার নবীনন্দিনী হজরত ফাতিমার নন্দন, আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য, জান্নাতি যুবকদের সরদার, বিশ্ব মুসলিমের নয়নমণি হজরত হোসাইন (রা.) আশুরা দিবসে কারবালা প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে ইয়াজিদি বাহিনীর হাতে শাহাদাতবরণ করেন। এ নির্মম ঘটনা বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। আহলে বাইত হলো নবী পরিবারহজরত ফাতিমা (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত হাসান (রা.) ও হজরত হুসাইন (রা.) এই পরিবারের সদস্য। এঁদের মাধ্যমেই সংরক্ষিত হয়েছে নবীবংশ। নবীবংশেরই ৭০ জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শাহাদত বরণ করেছেন আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে। সৃষ্টির আদি থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আশুরার তাৎপর্য বিদ্যমান হিজরি সনের প্রচলন মহররম মাসকে অধিক স্মরণীয় করেছে। কারবালার করুণ ইতিহাস আশুরা ও মহররমের ইতিহাসে গৌরবের নতুন পালক যুক্ত করেছে এবং মহিমান্বিত ও অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। শাহাদাতে কারবালা কেবল ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নয় এটি চরম ও পরম ঈমানের পরীক্ষার একটি অনন্য মাইলফলক। হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর পরিবার ও মুষ্টিমেয় সঙ্গীদের নিয়ে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে প্রমাণ করেন যে ঈমান ও সত্যের পথে অবিচল থাকাই প্রকৃত সাফল্য।

প্রখ্যাত আলেম আল্লামা জালাল উদ্দিন সূয়ুতী (রা.) বর্ণনা করেন যে পবিত্র কোরআন ও নবী (সা.) এঁর হাদীস হতে এটা প্রমাণিত হয় যে আহলে বাইত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (রা.) এর মুয়াদ্দাত (আনুগত্যপূর্ণ ভালোবাসা) দ্বীনের ফরায়েজে গণ্য সুতরাং ইমাম শাফেয়ী (রা.) এটার সমর্থনে এরূপ সনদ দিয়েছেন যে ইয়া আহলে বাইতএ রাসূলআল্লাহ তাঁর নাজিল করা পবিত্র কোরআনে আপনাদের মুয়াদ্দাতকে ফরজ করেছেন যারা নামাজে আপনাদের উপর দরুদ পড়বে না তাদের নামাজই কবুল হবে না। আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নবীপ্রেম (এশকেরাসূল) ও আল্লাহ প্রেম (এশকেএলাহি) ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত মোমিনমুসলমান হতে পারে না। সহিহ বোখারি শরিফের এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে এক সাহাবি রাসূলুল্লাহকে (সা.) যখন বললেন আমি বেশি কিছু আমল করতে পারি না তবে আল্লাহতায়ালা ও তার রাসূলকে (সা.) ভালোবাসি তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন তুমি তার সঙ্গি হবে যাকে তুমি ভালোবাস। অর্থাৎ তুমি যেহেতু আল্লাহ ও তার রাসূলের ভালোবাসায় আমল করেছ সুতরাং তুমি আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে। আল্লাহতায়ালা তোমাকে জান্নাত দান করবেন। তিরমিজি শরিফের আরেক হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসল সে জান্নাতে আমার সঙ্গে অবস্থান করবে। বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায় এশকে রাসূল ও এশকে এলাহি অর্জন করতে হলে রাসূলের আনুগত্য করতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি কাজে রাসূলের নীতিমালা ও কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে। এ ছাড়া রাসূলের এশক ও মহব্বত অর্জিত হতে পারে না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস। কেননা তিনি তোমাদের তাঁর নেয়ামতগুলো খাওয়াচ্ছেন। আর আল্লাহর ভালোবাসায় তোমরা আমাকেও ভালোবাস এবং আমার ভালোবাসায় আমার আহলে বায়েতকেও ভালোবাস।

হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে গেলাম যা তোমরা শক্তভাবে ধারণ (অনুসরণ) করলে আমার পরে কখনও গোমরাহ হবে না। তার একটি অপরটির চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আল্লাহর কিতাব যা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত এবং আমার পরিবার অর্থাৎ আমার আহলে বায়েত। এ দুটি কখনও পৃথক হবে না কাওসার নামক ঝর্ণায় আমার সঙ্গে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত। অতএব তোমরা লক্ষ কর আমার পরে এতদুভয়ের সঙ্গে তোমরা কেমন আচরণ কর। তোমরা কোরআনকে যতটুকু মর্যাদা দাও তাদেরও ততটুকু মর্যাদা দিও এবং তৃষ্ণার্ত উট যেভাবে পানির ঝর্ণার দিকে ছুটে যায় হেদায়েতের তৃষ্ণা মিটানোর জন্য তোমরাও সেভাবে তাদের দিকে যেয়ো। নাহ্‌জ আল বালাঘামাওলা আলীর উপরোক্ত হাদিস থেকে স্পষ্ট আমাদের আল্লাহর কোরআন ও রাসূল (সা.) এর আহলাল বায়েত অর্থাৎ আওলাদে রাসূলদের দৃঢ়ভাবে ধারণ বা অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহর কোরআন ও আওলাদে রাসূল এ দুটোর একটিকে বাদ দিয়ে হাউজে কাওসারে রাসূল (সা.) এর কাছে যাওয়া যাবে না।

রাসূল (সা.) আত্মীয়অনাত্মীয় সব ধরনের সাহাবিদের কাছে মা ফাতেমা, হজরত আলী, ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইনের (রা.) সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সদ্ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই চাননি। মা ফাতেমা, হজরত আলী, ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইনের (রা.) বংশীয় ধারার আওলাদে রাসূলদের সঙ্গে মহাব্বতের আনুগত্যশীলতাই আল্লাহ ও রাসূলের মূল রিজিক পাওয়ার একমাত্র উপায়। যারা আওলাদে রাসূলের প্রতি আনুগত্যশীল তাদের প্রতি আল্লাহ ক্ষমাশীল অর্থাৎ তারা সব ধরনের রিজিক পাবে। বেহেশতিদের জন্য সব ধরনের উত্তম নিয়ামতপূর্ণ রিজিকের সমাহার রয়েছে। বেহেশতি মহিলাদের সর্দার মা ফাতেমাসহ আওলাদেরাসূলদের প্রতি আনুগত্যশীল মহিলারা বেহেশতি নিয়ামতপ্রাপ্ত হবে মা ফাতেমার নেতৃত্বে। বেহেশতি নিয়ামতপ্রাপ্ত যুবকদের সর্দার হচ্ছেন ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইন (রা.)। ইমাম হাসানইমাম হোসাইন (রা.) সহ আওলাদে রাসূলদের প্রতি আনুগত্যশীলরাই বেহেশতে নিয়ামতপ্রাপ্ত হবে। যার বণ্টন ব্যবস্থা ইমাম হাসানইমাম হোসাইনের ওপর থাকবে। আওলাদে রাসূলদের এ শ্রেষ্ঠত্ব কোনো মানুষজিনফেরেশতা প্রদত্ত নয় স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত। আহলে বাইত ও আওলাদে রাসূলদের কল্যাণ সাধন করা সমগ্র উম্মতের জন্য রাখা হয়েছে। যারা আল্লাহর পথ ধরে আওলাদে রাসূলের কল্যাণে ব্যয় করবে তার কল্যাণ বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন আল্লাহ। আল্লাহর এ প্রতিদান ইহকালপরকালে স্পষ্টভাবে পাওয়া যাবে।

মহররম মাসের ১০ তারিখকেই আশুরা বলা হয়। নি:সন্দেহে আশুরার দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার দিন। আশুরার দিনটি হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীসাথীদের জন্য বিজয়ের দিন হলেও দিনটি মুসলিম উম্মাহকে পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ দিনেই ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ও মর্মান্তিক কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা। এক কথায় এ দিনটি দ্বীন প্রতিষ্ঠায় হিজরত এবং হক তথা উত্তম প্রতিষ্ঠার জন্য এক সুমহান দিন। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহ এ দিনটিকে বিশেষ ইবাদাতবন্দেগি তথা রোজা পালনের দিন হিসেবে শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করে থাকে। এ দিনটিতে ইবাদাত বন্দেগির ফজিলত ও তাৎপর্য অনেক বেশি। আল্লাহর জমিনে দ্বীন তথা উত্তম প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অগ্রসেনানী হজরত হোসাইন (রা.) এ আত্মত্যাগ এক মহাঅনুপ্রেরণা। কারবালার এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মহিমাময় মহররম মাসের ঐতিহাসিক মহান আশুরার দিনে সংঘটিত হওয়ায় এতে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। এতে এই শাহাদতের মাহাত্ম্য যেমন বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি আশুরা ইতিহাসে নতুন পরিচিতি পেয়েছে। আজ আশুরা ও কারবালা বা কারবালা ও আশুরা সমার্থক একে অন্যের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শোহাদায়ে কারবালা দিবস মুসলিম বিশ্বের আন্তর্জাতিক শোক দিবস। কারবালার শিক্ষা হলো সর্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য প্রয়োজন নবীপ্রেম, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা, ধর্মনিষ্ঠা, আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালন, মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করা। ভোগ নয়, ত্যাগেই সুখের সন্ধান করা। যেদিন সমগ্র পৃথিবীতে পরিপূর্ণরূপে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে সত্য ও সুন্দরের জয় হবে সেদিনই কারবালার প্রায়শ্চিত্ত হবে। সার্থক হবে আহলে বাইতের আত্মদান। প্রতিটি মহররম ও প্রতিটি আশুরা আমাদের সত্য ও ন্যায়ের ওপর দৃঢ়পদ থাকার মাহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে দেয়। জীবনের ব্রত, ত্যাগের শিক্ষা, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করে ভয়কে জয় করে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহজ পথ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করাই কারবালার শিক্ষা। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে আওলাদে রাসূল ও আহলে বাইতকে ভালোবাসার তাওফিক দান করুন। পবিত্র মহররম মাস ও আশুরার দিনে (১০ মহররমের আগে বা পরে এক দিনসহ) আমরা রোজা রেখে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ লাভ করার সুযোগ গ্রহণ করি। মহররম ও আশুরা থেকে আমাদের অফুরন্ত ফজিলত দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ‘বঙ্কুচোরা ভাইরাল’ : হাস্যরসের চমৎকার শিশুতোষ গল্পের বই
পরবর্তী নিবন্ধআগামীকাল পবিত্র আশুরা : বিশ্বমানব সভ্যতার ইতিহাসে মর্মান্তিক ঘটনা