
সমাজে প্রচলিত ছোট্ট একটি বিষয় নিয়েও চমৎকার একটি গল্প তৈরি করা যায়– গল্পকার ইফতেখার মারুফের গল্প পড়লেই তা পাঠকবোদ্ধারা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন। ইফতেখার মারুফ একজন জাত গল্পকার। তাঁর গল্পের মধ্যে চমৎকার যে হাস্যরস থাকে তা পাঠক পড়েই তাঁর গল্পের প্রতি স্বাভাবিক ভাবেই অনুরক্ত হয়ে উঠেন। ইফতেখার মারুফ দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছেন এবং এ জনপদে তিনি একজন সুপরিচিত লেখক। লেখালেখির নানা মাধ্যমের মধ্যে তিনি গল্পের মাঠে একজন সুনিপুণ যোদ্ধা। ইতিমধ্যে তাঁর অনেক গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে এবং তা পাঠকমহলে বেশ প্রশংসাও কুড়িয়েছে। শিশুতোষ গল্পের ক্ষেত্রে তাঁর গল্প অনেকটা বক্তব্যধর্মী বটেই, তবে শিশুকিশোরদের হাসির বা বিনোদনের যে ক্ষেত্র তিনি তৈরি করেন তা শিশুকিশোরসহ সকলের মনকে ছুঁয়ে যায়। গল্পের বইয়ের নামকরণের ক্ষেত্রেও তাঁর এক ধরনের স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে কথায় কথায় বলে থাকেন,‘নামে কিবা আসে যায়।’ আসলে বর্তমানে নামেও অনেক কিছু আসে যায়। এ কথাটা পুরো সত্য না হলেও কিছুটা সত্য বটে। তাঁর শিশুতোষ গল্পের বইয়ের নাম শুনেই পাঠকরা কিছুটা ভাবতে শুরু করেন। বই পড়ার আগে বই সম্পর্কে পাঠককে এই যে ভাবনার জগতে নিয়ে আসা এটা লেখকের এক ধরনের মুন্সীয়ানা। ইফতেখার মারুফের ‘বঙ্কুচোরা ভাইরাল’ গল্পটি নামের কারণে হোক কিংবা বর্তমানে বহুল প্রচলিত শব্দের কারণে হোক তা পাঠককে অন্তত পড়তে ভাবায়। বইটিতে মোট পাঁচটি গল্প আছে। দুটি গল্প বেশ হাস্যরসাত্মক। আর তিনটি গল্পের মধ্যেও চমৎকার বক্তব্য আছে। বলা যায় চমৎকার শিশুতোষ গল্পের বই ‘বঙ্কুচোরা ভাইরাল’। গল্পের বইটিতে প্রথম গল্প ‘রিন্টুর ঈদ যাত্রা’। গল্পের শুরুতেই গল্পকার রিন্টুর ঈদ যাত্রার ভাবনায় রিন্টুর শৈশবের স্মৃতিকে যেভাবে রোমন্থন করেছেন তা যেন গ্রামে বড় হয়ে ওঠা সকলের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। সাঁতার শেখা সকলেরই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। গল্পের ছলে এ বিষয়টাকে গল্পকার রিন্টুকে কল্পনাশ্রয়ী করে যেভাবে বর্ণনা করলেন তা সবার জন্য শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণামূলক। বইটির দ্বিতীয় গল্প ‘বঙ্কুচোরা ভাইরাল’। বইয়ের নামে গল্পের শিরোনাম দেয়া গল্পটি বেশ সুন্দর ও হাস্যরসে ভরপুর। আমরা জানি ৯৯৯ এ কল দেয়া মানে কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া। একজন চোর জনরোষ থেকে বাঁচতে কীভাবে ৯৯৯ এ কল দিয়ে লাইভ সমপ্রচারের কারণে ভাইরাল হয়েছিল তা গল্পকার গল্পে তুলে এনেছেন। বঙ্কুচোরাকে পুলিশ উদ্ধার করে জেলে নিলেও তার কোনো দুঃখবোধ নেই, কারণ সারা বিশ্বে সে ভাইরাল হয়েছে শুনে তার যেন আনন্দের সীমা নেই। এক ধরনের রসময় ভাষায় গল্পের এগিয়ে যাওয়া পাঠকদের ভালো লাগবেই। ‘মুরসালিন আবার স্কুলে যাবে’ গল্পটি চমৎকার একটি শিশুতোষ গল্প। করোনাকালীন সময়ের বাস্তবতা গল্পে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা প্রত্যেকই এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। বছরের পর বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। স্কুলে যাবার যে আনন্দ সে আনন্দে ভাটা পড়েছিল করোনার কারণে। মুরসালিনের মন প্রতিনিয়ত স্কুল ভাবনায় তাড়িত হতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনন্দকে মুরসালিন স্বপ্নে অনুভব করে, সে অনুভব কিন্তু নিছক স্বপ্ন নয়–তা জীবনের বাস্তবতা। আর স্কুল খোলার প্রশ্নে তার অনুসন্ধিৎসু মনের যে জিজ্ঞাসা তা তার মায়ের উত্তরেই যেন দীর্ঘদিনের বন্দী দশা থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। ‘লাল সবুজের পতাকা’ একটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিশোর গল্প। একজন কিশোর কীভাবে নানা ঘটনা প্রবাহে মুক্তিযুদ্ধের অংশ হয়ে গেলো তারই এক চমৎকার চিত্রায়ন। গল্পের চরিত্র সোলেমান ও তার নানির সাথে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের যে নির্ভরযাগ্য সোর্সে পরিণত হয়েছিলো– তার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। শেষমেষ পাকহানাদের কাছে তার ধরা পড়া ও জীবন উৎসর্গের বর্ণনা বড়ই করুণ। তার সবুজ শার্টের ওপর লাল রক্তের ছটা যেন বাংলাদেশেরই পতাকা। এভাবে গল্পের পরিসমাপ্তি। বইয়ের সর্বশেষ গল্প ‘ডটকম– ডটবেশি’। চমৎকার একটি রম্য গল্প। প্রযু্কি্তর এযুগে কিছু শব্দ আমরা হরহামেশাই ব্যবহার করি এবং এ শব্দগুলো যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেরই অংশ। ডটকম– এরকমই একটি শব্দ। এই শব্দ নিয়েই চমৎকার একটি রম্য গল্প যে হতে পারে ‘ডটকম–ডটবেশি’ গল্পটি না পড়লে বুঝা যাবে না। নাতি কেন ‘চৌধুরী ডটকম’ দোকান দিলো, দাদুকেও তাই ‘ডটবেশি’ নামে দোকান দিতেই হবে। এখানে কমের সাথে বেশি শব্দের প্রয়োগ টেনে দোকান দেবার যে প্রতিযোগিতা সেটা রম্যভাবে গল্পকার উপস্থাপন করেছেন। কম শব্দটা যে কমার্স বা বাণিজ্যের সংক্ষিপ্ত রূপ তা হয়তো কম শিক্ষিত দাদুকে বোঝানো যায় না। তেমনি বি.কম ও এম.কম শব্দ নিয়ে দাদুর ভাবনা এমনই। কম কেন হবে বেশি হতে পারেন না? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খায় দাদুর মনে। কোনো কোনো মানুষের মধ্যে সাধারণ এমন একটি শব্দ নিয়ে নানা কৌতূহলী ভাবনা যে হাস্যরসের সৃষ্টি করে তা এ গল্প পড়লেই পাঠক বুঝতে পারবেন। নামের বিচিত্র বৈচিত্র্যের কারণে যে ব্যবসা–বাণিজ্যও বেড়ে যায় তা গল্পে গল্পকার দারুণভাবে তুলে এনেছেন। শিশুকিশোরসহ সকলেই এ ধরনের গল্প পাঠে আনন্দ পাবেন নিঃসন্দেহে। গল্প পাঠে নানা শিক্ষণীয় বক্তব্যের পাশাপাশি যদি বিনোদনের প্লটও তৈরি করা যায় তাহলে তো কথাই নেই। গল্পকার ইফতেখার মারুফের গল্পের মধ্যে আমরা অনেক সময় সে ছায়া দেখতে পাই। এ জন্য শিশুকিশোরদের কাছে তাঁর গল্পের আবেদন একটু অন্য রকম। লেখালেখির জীবনে ইফতেখার মারুফের বেশ কয়েকটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির জন্য বেশ কয়েকটি সম্মাননাও তিনি লাভ করেছেন। ‘বঙ্কুচোরা ভাইরাল’ গল্পের বইটিতে পাঁচটি গল্পের প্রত্যেকটিই চমৎকার বক্তব্যধর্মী এবং দুটো গল্পে আছে বিনোদনেরও খোরাক। শৈলী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ আর গল্প সংশ্লিষ্ট ভেতরের চমৎকার ইলাস্ট্রেশন করেছেন চিত্রশিল্পী নাটু বিকাশ বড়ুয়া। ২২০ টাকা মূল্যমানের বইটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, কলেজ শিক্ষক।










