১১৫ দিন পর হরমুজ পার হলো বাংলার জয়যাত্রা

৩১ বাংলাদেশি নাবিকের প্রতীক্ষার অবসান, স্বস্তি নৌ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ বিএসসির ঊর্ধ্বতনরা লাইভ দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন

হাসান আকবর | বুধবার , ২৪ জুন, ২০২৬ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘ ১১৫ দিনের অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। সোমবার দিবাগত রাত সোয়া ৩টার দিকে জাহাজটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমানে স্পর্শকাতর ও বিপৎসংকুল এই নৌপথ পাড়ি দেয়। এর মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকের দীর্ঘ প্রতীক্ষারও অবসান ঘটে। হরমুজ পাড়ি দিতে পেরে জাহাজটির নাবিকেরা স্বস্তি প্রকাশের পাশাপাশি উচ্ছ্বসিত।

বিএসসি সূত্র জানিয়েছে, জাহাজটি হরমুজ প্রণালির ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা অতিক্রমের সময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক জাহাজটির অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদে যাত্রা নিশ্চিত করা হয়।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত না হলেও সীমিত পরিসরে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে জাহাজ চলাচল করছে। নানা পর্যায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই বাংলার জয়যাত্রা নিরাপদে প্রণালিটি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। জাহাজটির হরমুজ পাড়ি দেওয়া ছিল নাবিকদের জন্য এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। জাহাজটি মাস্টার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম গতকাল আজাদীর সাথে আলাপকালে সেই চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য ক্রুড নিয়ে সৌদি আরবে আটকে থাকা এমটি নরডিঙ পল্যাঙ নামের জাহাজটি হরমুজ পার হয়ে বাংলাদেশের দিকে রওনা হয়েছে বলে খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের এমডি স্যার (ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক) আমার সাথে ফোনে কথা বলেন। তিনি আমাকে হরমুজ পার হওয়ার বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দেন, সাহস দেন। আমাদের জাহাজটি পরিচালনা করছে সিঙ্গাপুরের দাবা প্রাইভেট লিমিটেড নামের কোম্পানি। জাহাজের ৩৭ হাজার টন সার রপ্তানি করেছে সৌদি আরব। সার যাওয়ার কথা দক্ষিণ আফ্রিকায়।

তিনি বলেন, এমডি স্যারের সাথে কথা বলার পর উনার নির্দেশনা অনুযায়ী আমি সিঙ্গাপুরের চার্টার প্রতিষ্ঠানকেও বিষয়টি জানাই। তারা আমাকে ফুজাইরা বন্দরের দিকে রওনা হওয়ার পরামর্শ এবং নির্দেশনা মেইলে পাঠায়। ইরানের কোস্ট গার্ডের সঙ্গেও যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। আমরা একইভাবে যোগাযোগ করি এবং তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করে রাত সোয়া ৩টা নাগাদ হরমুজ পাড়ি দিই। ইরানি কোস্ট গার্ড রেডিও কন্ট্রোলের মাধ্যমে যাতে কোনো মিলিটারি ভ্যাসেল বা সামরিক সরঞ্জামবাহী জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা না করে সেই নির্দেশ প্রদান করছিল। যদি চেষ্টা করে তাহলে লক্ষ্যবস্তু করে ধ্বংস করা হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল।

জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, আমরা যখন হরমুজ পার হচ্ছিলাম তখন খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। পানিতে কোথায় মাইন পাতা আছে, মাথার উপরে কোথায় ড্রোন সেট করা আছে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে এক ধরনের আতংক ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছি। এখন আমরা হুজাইরা বন্দরের দিকে রয়েছি। বিকাল ৪টার মধ্যে (মঙ্গলবার) আমরা হুজাইরা বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে যাব। ওখান থেকে পরে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের পথে যাত্রা করব।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, বাংলার জয়যাত্রা যখন হরমুজ প্রণালির ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা অতিক্রম করছিল, তখন নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানসহ মন্ত্রণালয় ও বিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক জাহাজের প্রতিমুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং লাইভ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি এখনো উন্মুক্ত না হলেও ইরানের অনুমতি নিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল হচ্ছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হরমুজ পাড়ি দিয়েছে বাংলার জয়যাত্রা।

তিনি বলেন, আমাদের নাবিকেরা জীবন বাজি রেখে হরমুজ পার হয়েছে। আমাদের এই নাবিকেরাই জাহাজটিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন নিয়ে যাবে। পরে ওখানে ওদের সাইন অফ করিয়ে অন্য নাবিক পাঠাব। তিনি নাবিকদের ধন্যবাদ দেন এবং দেশের জন্য সামনের দিনগুলোতেও এভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

গতকাল জাহাজের নাবিকেরা সকলে উচ্ছ্বসিত এবং আনন্দিত ছিলেন। তারা ১১৫ দিনের একটি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলেও জানান।

বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ বাংলার জয়যাত্রার এবারের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল ঘটনাবহুল। গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে এটি। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর পরদিন ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বাংলার জয়যাত্রা পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে।

জাহাজটির কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে অন্তত তিনবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় জাহাজটি পুনরায় যাত্রা করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবহন খাতে এ ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির সংবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থান করলেও জাহাজটি এবং এর সব নাবিক নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছেন। অনিশ্চয়তার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে বাংলার জয়যাত্রা দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বন্দরের দিকে এগিয়ে যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজলবায়ু কার্যক্রমকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখি
পরবর্তী নিবন্ধবিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড, ১১ মাসেই ছাড়াল চার বিলিয়ন ডলার