সরদার ফজলুল করিম

গণতান্ত্রিক চর্চায় যাঁর দর্শন সবসময় প্রাসঙ্গিক

আবু রায়হান | শুক্রবার , ১৯ জুন, ২০২৬ at ৯:০০ পূর্বাহ্ণ

তাঁর নাম সরদার ফজলুল করিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের মেধাবী ছাত্র থেকে শিক্ষক, আবার রাজনীতির রাজপথ থেকে কারাগারের অন্ধকারপ্রতিটি ধাপে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক আধুনিক সক্রেটিস হিসেবে। তাঁর জীবন কেবল একটি জীবনী নয়, বলা যায় এটি গত শতাব্দীর বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

সরদার ফজলুল করিমের গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অসামান্য সরলতা, যা গভীর দার্শনিক চিন্তার ভার বহন করতে সক্ষম। তিনি বিশ্বাস করতেন, দার্শনিক পরিভাষা মানেই দুর্বোধ্য কোনো গোলকধাঁধা নয়। তাঁর গদ্যের গতি অত্যন্ত ধীরস্থির এবং পরিমিত, কিন্তু প্রতিটি বাক্যে থাকে চিন্তার এক তীক্ষ্মতা। তিনি অলঙ্কাার বা বাহুল্য শব্দের আড়ম্বরকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতেন। তাঁর ভাষারীতিতে এক ধরনের আভিজাত্য থাকলেও তা কখনোই সাধারণ পাঠকের থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। তিনি যখন লিখতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন পাঠকের সাথে সামনাসামনি বসে কথোপকথন চালাচ্ছেন। এই কথোপকথনমূলক গদ্য তাঁর লেখার গতিকে দিয়েছে এক অনন্য প্রাণশক্তি। তথ্যের গভীরতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর গদ্য কখনোই ভারী বা ক্লান্তিকর হয়ে উঠত না; বরং তা নদীর স্রোতের মতো সাবলীলভাবে পাঠককে জটিল দর্শনের গভীরে নিয়ে যেত।

তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য ছিল জ্ঞানের গণতান্ত্রিকায়ন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, দর্শনচর্চা কেবল উচ্চবর্গের পাঠাগার বা প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলে তা সাধারণ মানুষের মুক্তি ঘটাতে পারে না। তাই তিনি প্লেটোর রিপাবলিক, ডায়ালগস এবং অ্যারিস্টটলের পলিটিকসএর মতো মৌলিক ধ্রুপদী গ্রন্থগুলোকে বাংলা ভাষায় নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর অনুবাদগুলো কেবল ভাষান্তর ছিল না, বরং তা ছিল মূল দর্শনের দার্শনিক প্রেক্ষিতকে বাঙালির নিজস্ব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপনের এক সৃজনশীল প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষায় দর্শনের মৌলিক পরিভাষার সংকট নিরসনে তাঁর সংকলিত দর্শনকোষ এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো তথ্য বা সংজ্ঞার ক্ষেত্রে তিনি কখনোই মনগড়া কিছু লিখতেন না; প্রতিটি পরিভাষার পেছনে তিনি দীর্ঘ বছরের গবেষণা ও ভাষাগত বিশ্লেষণ যুক্ত করেছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ছিল মার্কসবাদ, কিন্তু তিনি কখনোই একে কোনো অন্ধ মতবাদ হিসেবে দেখেননি। তাঁর লেখায় মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও গ্রিক যুক্তিবাদী চেতনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। কারাবন্দি থাকাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তাঁর এই সেই কারাগার বাংলা আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যের এক অনন্য নজির। এই গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক চরিত্র এবং বন্দিশালায় একজন বুদ্ধিজীবীর অস্তিত্ববাদী লড়াইকে অত্যন্ত পরিমিত ও স্বচ্ছ গদ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। একইভাবে, তাঁর নানান প্রসঙ্গ গ্রন্থে সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে লেখা প্রবন্ধসমূহ সমকালীন বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য থাকলেও প্রতিটির কেন্দ্রে ছিল যৌক্তিকতা ও মানবিকতা।

সরদার ফজলুল করিমের জীবনের অন্যতম বড় অধ্যায় হলো তাঁর কারাগার জীবন। পাকিস্তান আমলে দীর্ঘ প্রায় দশটি বছর তাঁকে জেলখানায় কাটাতে হয়েছিল। জেলখানার সেই চার দেয়ালের মাঝে তিনি যে দিনলিপি বা প্রবন্ধগুলো লিখেছেন, তাতে কোনো অভিযোগের সুর ছিল না, ছিল এক ধরণের দার্শনিক নির্লিপ্ততা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, চার দেয়ালের মাঝেও মানুষ মুক্ত হতে পারে যদি তার চিন্তার দিগন্ত বিস্তৃত হয়। কারাবন্দি অবস্থায় তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতাকে যেমন দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন সাধারণ মানুষের সংগ্রামের অদম্য শক্তি। তাঁর লেখার গতির মধ্যে যে প্রশান্তি ও ধীরস্থির ভঙ্গি দেখা যায়, তা সম্ভবত তিনি সেই দীর্ঘ জেলজীবন থেকেই আয়ত্ত করেছিলেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি বহু প্রজন্মকে মুক্তচিন্তা ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের পাঠ দিয়েছেন। তাঁর ক্লাসরুমের পরিবেশ কখনোই একঘেয়ে লেকচার বা মুখস্থ বিদ্যার জায়গা ছিল না; বরং তা ছিল এক অবারিত তর্কের ক্ষেত্র। তিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন ‘কেন’ প্রশ্নটি করার সাহস। তাঁর কাছে দর্শনের অর্থ ছিল জীবনকে নতুন করে দেখা। ছাত্ররা তাঁর কাছে আসত কেবল পাসের আশায় নয়, বরং চিন্তা করার খোরাক পেতে। এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতিই ছিল তাঁর শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি।

বর্তমান এআইএর যুগে, যখন তথ্যের বিস্ফোরণে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন সরদার ফজলুল করিমের প্রাসঙ্গিকতা অনেক গুণ বেড়েছে। তাঁর লেখাগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে তথ্যের ভিড়ে নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করতে হয়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, আধুনিক মানুষ হওয়ার শর্ত কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং যুক্তি দিয়ে জগতকে ব্যাখ্যা করা। তাঁর প্রতিটি বই যেন একএকটি মানচিত্র, যা আমাদের অন্ধকারের হাত থেকে বেরিয়ে এসে আলোর পথে চলতে সাহায্য করে।

সরদার ফজলুল করিম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পদবিতে নিজেকে আটকে রাখেননি। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মনের ভেতরে একটি যুক্তিবাদী ঘর তৈরি করতে। তিনি চেয়েছিলেন, যেন বাঙালি জাতি নিজস্ব মেধা ও যুক্তি দিয়ে জগতকে চিনতে পারে। ২০১৪ সালে তিনি যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তিনি কেবল একটি দেহ নিয়ে যাননি, রেখে গেছেন আমাদের জন্য চিন্তার এক বিশাল উত্তরাধিকার। আজ যখন তাঁর বইগুলো আমরা পড়ি, তখন শুনতে পাই সেই ধীরস্থির কণ্ঠস্বর, যেখানে সক্রেটিসের যুক্তি, মার্কসের সমাজতত্ত্ব আর বাঙালির মানবিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। যতক্ষণ একটি মানুষও সত্যের সন্ধানে থাকবে, সরদার ফজলুল করিম ততক্ষণ বেঁচে থাকবেন সেই মানুষেরই চিন্তার মাঝে। তাঁর গদ্যের গতি, ভাষার স্বচ্ছতা এবং দর্শনের গভীরতা আজও নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায়। ২০১৪ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের এই প্রথিতযশা দার্শনিকের জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর জাগতিক প্রস্থান হলেও, বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি ও দর্শন চর্চায় সরদার ফজলুল করিমের মৌলিক কাজ ও চিন্তাধারা সবসময় প্রাসঙ্গিক থাকবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদ্য লোনলি ভয়েস : আধুনিক ছোটগল্পের শিল্পতত্ত্ব ও একাকীত্বের আখ্যান
পরবর্তী নিবন্ধকাপ্তাইয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক কর্মশালা