সমকালের দর্পণ

আমেরিকা-চীন ‘থুসিডাইডিস ট্রাপ’ এ! এবং ন্যাংটা রাজা (২)

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ৯ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

গত লেখায় শিরোনামের বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে চীনের উত্থান প্রসঙ্গ আলোচনা করেছি। আজ একই প্রসঙ্গে আমেরিকার বিষয় আলোকপাত করে ন্যাংটা রাজার গল্পটি পাঠকদের শুনানোর প্রয়াস পাব।

পশ্চিমা তথা আমেরিকার চীন সম্বন্ধে ন্যারেটিভ হল চীনে সেন্সরশীপ বলবৎ যার কারণে বাক স্বাধীনতা রহিত। সাধারণ চীনারা তাদের অভাব অভিযোগ অকপটে প্রকাশ করতে পারে না। পশ্চিমাদের এই ধারণার বিপরীতে চীন তার সাধারণ জনগণের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন তথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান সকল ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর বাইরে চীনারা কখনো তাদের বাক স্বাধীনতা রহিত থাকার বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেছে তেমন খুব একটা নজীর নেই।

পশ্চিমাদের চীনাদের নিয়ে আরো একটি মারাত্মক ন্যারেটিভ রয়েছে, এটি হল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি চীনাদের উপর নিপীড়ন নির্যাতনের নীতি অবলম্বন করে তাদের শাসন কায়েম রেখেছে। পশ্চিমাদের এ অভিযোগ যুক্তিতে টিকে না। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নেতৃত্বের দূরদর্শীতায় বিগত দশকের পর দশক চীনাদের এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এনে দিয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চীনের যে বিকাশ ঘটেছে তা শুধু অভাবনীয় নয় তা অভূতপূর্ব অবিশ্বাস্য। এ প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত কূটনীতিক এক সময়ের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি কিশোর মাহবুবানী উইকেন্ড উইথ ব্লুমবার্গ এর মিশেল হাসানের সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন “প্রতিবছর প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন চীনা নাগরিক দেশের বাইরে কর্মে/ভ্রমণে যান, এদের মধ্যে দেশে প্রত্যার্বতন না করা বা অন্যকোনও দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা বা ডিফেকশান’এর মাত্রা শূন্য। এটি প্রমাণ করে চীনারা তাদের দেশের শাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল এবং অনুগত।

এ যাবত পশ্চিমা তথা আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে উইগুর মুসলিমদের উপর নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লংঘনের তীব্র অভিযোগের একটি তীর তাক করা ছিল। গাজার গণহত্যা যাতে শুধু ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলী হামলায় ৬০০০০ (ষাট হাজার) শিশু মা বাবা হারা হয়েছে। আমেরিকার মানবতাবাদী সিনেটর বার্নি স্যার্ন্ডাসের অভিমত ‘লজ্জাজনক সত্যিটি হল গাজায় যা কিছু ঘটেছে তার সব কিছুর সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে আমেরিকা’। এর বাইরে ফিলিস্তিনীদের যাবতীয় মানবাধিকার লংঘন, সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং সর্বশেষ ইরান সকল ক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বে হত্যা ধ্বংস ইত্যাদি কারণে উইগুর মুসলিমদের ব্যাপারে আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান ধোপে টেকে না। এ ক্ষেত্রে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগের অস্ত্রটি একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাপী সচেতন মানুষরা এখন উপহাসচ্ছলে বলেন, ‘আমেরিকা লাভস চাইনীজ মুসলিম বাট নট দি মুসলিম অব দি ওয়ার্ল্ড’। অর্থাৎ আমেরিকা চীনের মুসলমানদের ভালোবাসেন তবে পৃথিবীর অন্য মুসলমানদের নয়। আমেরিকার ইরান আক্রমণও থুসিডাইডিস ট্রাপ এর ফলশ্রুতি। ইরানের উত্থান মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থ বিঘ্নিত হবে এ ভয়ের ফলশ্রুতি বর্তমানের আমেরিকার ইরান যুদ্ধ। বাস্তবতা হল চীন কখনো আমেরিকার শাসন ব্যবস্থা, সরকার পদ্ধতি ইত্যাদি ব্যাপারে নাক গলায়নি বা হস্তক্ষেপ করেনি। অথচ আমেরিকা চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেমন মানবাধিকার লংঘন, সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ ইত্যাদি অজুহাতে সেদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে আসছে।

এই একই বাস্তবতা ইরানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। ইরানের রিজিম চেন্‌জ তথা সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সেদেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা, আন্তর্জাতিক সমস্ত রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে ইরানের স্কুল কলেজ সরকারি বেসরকারি স্থাপনায় নির্বিচার হামলা আমেরিকার ‘থুসিডাইডিস ট্রাপ’ তথা তার বর্তমান পরাশক্তির অবস্থান থেকে ছিটকে পড়ার ভয় তাড়িত বা আতংক জনিত। একই ভয়ের তাড়না বা আতংক জনিত কারণে আমেরিকা তাইওয়ানে চীনের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলে তা হবে বিশ্বের জন্য মারাত্মক এক বির্পযয়। দুটি দেশ চীন আমেরিকাকে সে বিপর্যয়কর অবস্থার দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট হল ‘থুসিডাইডিস ট্রাপ’।

মজার বিষয় হল পশ্চিমা বিশ্ব তথা আমেরিকা ক্রমান্বয়ে বিশ্ব ব্যবস্থায় তার পরাশক্তির অবস্থান হারাচ্ছে। এ বিষয়টি বহিঃবিশ্বে আমেরিকার নীতির ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও সমভাবে দৃশ্যমান। আমেরিকার ফাদার অব দি নেশান জর্জ ওয়াশিংটন ১৭৮৮ সালে ফ্রান্সিস আড্রিয়ান ভ্যান ডার ক্যাম্পকে উদ্দেশ্য করে এক পত্রে উল্লেখ করেছিলেন “America as a welcoming heaven for oppressed and persecuted of all nations” অর্থাৎ আমেরিকা পৃথিবীর সকল জাতিসত্তার নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের আশ্রয়স্থল হবে। বাস্তবে এখন আমেরিকা সারা পৃথিবীর মানুষের নিপীড়ন নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাস্তবতাটুকু আমেরিকান নীতিনির্ধারক তথা নীতি কৌশল প্রণেতাদের আরো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে গেলে আমেরিকান প্রচণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্টের সামনে তার আশেপাশের লোকজন হয়ত তুলে ধরছেন না। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ১৮৩৭ সালে প্রকাশিত প্রখ্যাত ডেনিস রুপ কথা লেখক হ্যানস ক্রিস্টেন এ্যান্ডাসন’এর ‘The King has no clothes’ গল্পটির কথা মনে পড়ে গেল। গল্পটি এরকম। মহামান্য রাজা সরকারি কোষাগার ব্যবহার করে ইচ্ছেমত বিলাসী জীবন যাপন করেন। প্রজাদের সুখ দুঃখ, অভাব অভিযোগ শুনার তার কোন অবকাশ বা আগ্রহই নাই। রাজার খেয়াল খুশি সব সময় যখন যা মনে লয়অভিনব সব। রাজার এই খাম খেয়ালী, এই বিলাসিতার কথা অবগত হয়ে দূরের দুই চালাক লোক একদিন রাজ দরবারে হাজির। উদ্দেশ্য রাজার জন্য তারা অভিনব কিছু করবেন। রাজা মহাশয়ের কাছে তাদের আগমনের খবর জানানো হয়। রাজা ঐ দুজনকে ডেকে পাঠান।

আলোচনান্তে রাজা জানতে পারেন এ দুজন রাজার জন্য এমন এক পোশাক বানাবেন যা অপদার্থ, অকর্মণ্য আর বোকা ছাড়া সবাই দেখতে পাবেন। এও কি সম্ভব! দুই চালাক উত্তর দেন, সম্ভব। রাজা মহাখুশি একদিকে অভিনব পোশাক অন্যদিকে তার আশেপাশের অপদার্থ, অকর্মণ্য আর বোকারাও চিহ্নিত হবেন। রাজার আদেশে দুইজন কাপড় বুনা শুরু করেন। উৎসুক বশংবদ পারিষদবর্গ কাপড় বুনা দেখতে হাজির হন। অপদার্থ, অকর্মণ্য আর বোকা সাব্যস্ত হতে কে চায় বলুন? একথা মনে রেখে সবাই বলতে থাকেন আহা কী অপূর্ব বুনন, কী চমৎকার রঙ!

দরবারে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যায়, রাজার জন্য এক অভিনব পোশাক তৈরী হচ্ছে! যেমন রঙের বাহার তেমনি মোলায়েম। পোশাক তৈরী শেষ। এবার সেই পোশাক রাজাকে পরানো হবে। নতুন পোশাক পরানোর জন্য রাজার গায়ের সব বসন একে একে খুলে ফেলা হয়। দুই চালাক নানা কসরত দেখিয়ে শেষে বলল, রাজার পোশাক পরানো শেষ। সভাসদ সবাই উচ্চসিত, উল্লাস মুখর, নানা তোষামোদদমূলক মন্তব্যে রাজাকে সম্বোধন করে চলেছেন। রাজা বারবার নিজের গায়ের অভিনব সেই পরিধেয় দেখতে গিয়ে কিছুই দেখেন না। কিন্ত্তু এ কথা ত আর বলা যাবে না, তাহলে রাজা নিজেই ত অপদার্থ, অকর্মণ্য আর বোকা সাব্যস্ত হয়ে যাবেন।

নিজেকে জাহির করার জন্য অবশেষে সেই অভিনব পোশাক পরে রাজা জনসমক্ষে হাজির হন। রাজার পরা পোশাক না দেখলে, কী সাব্যস্ত হবেন তা সবাই ইতিমধ্যে জেনেছেন। সেই আশঙ্কায় উপস্থিত সবাই রাজার পোশাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এরই মাঝে সবাইকে হতভম্ব করে এক ছোট্ট ছেলে বলে বসে ‘রাজা ন্যাংটা’! এরপর শুরু হয় মুখ চাওয়া চাওয়ি। এ ওর দিকে দেখে আর ও ওর দিকে দেখে। অবশেষে লজ্জায় সবার মুখ ঢাকাঢাকি! ছোট্ট ছেলেটির মুখে উচ্চারিত সত্য এমনই কঠিন, সে সত্যের মুখে লজ্জায় সবাইকে মুখ ঢাকতে হয়। ছোট্ট ছেলেটির আগে, সত্য উচ্চারণে রাজার বিরাগভাজন হবেন সেই ভয়ে অথবা সত্য উচ্চারণে অপদার্থ, অকর্মণ্য আর বোকা হিসেবে চিহ্নিত হবেন এই আশঙ্কায় কেউ সত্য উচ্চারণে সাহসী হননি। অথচ বাস্তবে রাজা ছিলেন ন্যাংটা।

পশ্চিমাদের এখন সময় সত্য উন্মোচন আর সত্যের মুখামুখি হওয়ার। তাদের রাজা এখন ‘ন্যাংটা’ কথাটি কাউকে না কাউকে উচ্চারণ করতে হবে। না হয় চীন এক সময় ছোট্ট ছেলেটি হয়ে সে কাজটি করবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রতিশোধ ক্ষণিকের তৃপ্তি দেয় আর ক্ষমা দেয় দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি
পরবর্তী নিবন্ধশিশু কিশোরদের মেধা বিকাশ, জ্ঞানচর্চা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব জাগ্রত করতে হবে