কথার চেয়ে কাজ বড়। কথা বলা সহজ কাজ করা কঠিন। কথায় আছে বলা সহজ করা কঠিন। আসলে যতো সহজে বলা যায় অতো সহজে করা যায় না। এজন্য বলার লোকের অভাব হয় না। করার লোকের অভাব হয়। অনেকে অনেক কিছু বলে থাকে। জানা–অজানা, বাস্তব–অবাস্তব অনেক কিছু। বলতে বলতে শেষ হয় না। নানারকম চমক দিয়ে বলে। যুক্তি দিয়ে বলে। উদাহরণ টেনে বলে। বলার মাঝে থাকতে চায়। বলার মাঝে আনন্দ পায়। নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। এ বলার সাথে কাজের কোন সম্পর্ক নেই। শুধু বলার জন্য বলা। কেউ শুনে বা না শুনে এতে কিছু যায় আসে না। বলতে বলতে এক ধরনের পরিচিতি পেতে চায়। কেউ কেউ আবার পেয়েও যায়। অনেকে এ বলার মধ্যে ব্যস্ত থাকে। কাজ থেকে অনেক দূরে থেকে যায়। কাজ না করে কথার মধ্য দিয়ে নিজের জায়গা করে নিতে চায়। অর্থাৎ কথায় বড় হতে চায়। তবে কথায় যতো সহজে বড় হওয়া যায় কাজে অতো সহজে বড় হাওয়া যায় না।
আমরা ছোটবেলায় পড়েছি কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হবার কথা। এ বিষয়ে কুসুমকুমারী দাশের বিখ্যাত কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতো। পঞ্চাশের দশক থেকে এ কবিতাটি পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত। এখনো স্কুলের পাঠ্য হিসেবে কবিতাটি পড়ানো হয়। কবিতাটির প্রথম দুই চয়ন বড়ই চমৎকার। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’? কবিতাটি চল্লিশের শেষ দশকে লেখা। সেই সময়ে কবি এরকম একটি ছেলের খোঁজ পায়নি। যেই ছেলেটির আশা কবিতায় ব্যক্ত করা হয়েছে। কবিতাটি পড়লে সব ছাত্রদের মাঝে স্বপ্ন জাগে। ‘আদর্শ ছেলে’ হবার স্বপ্ন। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেয় না। স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিলে দেশে আদর্শ ছেলেয় ভরে যেতো। দীর্ঘ কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও সেই আদর্শ ছেলের খোঁজ পাওয়া ভার। শতাব্দী কাল পরও সেই আদর্শ ছেলেটির জন্য আকাঙ্খা থেকে যায়। সেই ছেলেটি কবে আসবে সেই অপেক্ষায় থাকে।
আদর্শ ছেলে খুঁজে পাওয়া না গেলেও আদর্শে পেশাজীবির অভাব নেই। আদর্শ ডাক্তার, আদর্শ ইঞ্জিনিয়ার, আদর্শ আমলা, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ আইনজীবী, আদর্শ চাকুরিজীবী, আদর্শ ব্যবসায়ী, আদর্শ রাজনীতিবিদ এসবের মোটেই অভাব নেই। সমাজে অহরহ যত্রতত্র পাওয়া যায়। সাইনোবোর্ডে আদর্শের ছড়াছড়ি। আদর্শের রাজনীতি তাও যেন চোখে পড়ার মতো। চাঁদাবাজের মাঝেও আদর্শ চাঁদাবাজ আছে। তবে মানুষের মাঝে আদর্শ মানুষ পাওয়া যায় না। আদর্শ মানুষের কোন সাইন বোর্ডও দেখা যায় না। চারিদিকে এতো মানুষের ভীড়ে আদর্শ মানুষ হারিয়ে যায়। আসলে মানুষ মানুষই। মানুষকে আদর্শ দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। যেভাবে ছেলেকে আদর্শ ছেলে বলে সম্বোধন করা হয়। কারণ ছেলের মাঝে অনেক সম্ভাবনা, অসীম সম্ভাবনা। ভবিষ্যতের স্বপ্ন তার মাঝে। এজন্য ছেলেকে আদর্শ ছেলে হয়ে গড়ে ওঠতে হয়। ছেলে আদর্শবান না হলে সে মানুষ হয়ে গড়ে ওঠতে পারে না। যার মাঝে আদর্শ নেই সে মানুষ হতে পারে না।
কবিতার পরের শক্তিমালায় কবি বলেছে ‘মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন, “মানুষ হইতে হবে”– এই তার পণ’। মানুষ হওয়ার কোন বিকল্প নেই। এজন্য কবি জোর দিয়ে বলেছে ‘মানুষ হইতে হবে’। এটাই তার পণ। এখানে কোন দ্বৈততা নেই, কোন সংশয় নেই, কোন আপোষ নেই। ছেলেরাইতো মুখে হাসি নিয়ে বুকে বল নিয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে তেজদ্বিপ্ত দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবে। যে কোন মূল্যে মানুষ হতে হবে। মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার মধ্যেই আদর্শ ছেলের স্বার্থকতা। সেই মনোবল, সেই দৃঢ়তা এখন ছেলেদের মাঝে কোথায়? কবিতা পড়ে, পক্তিমালা মুখস্ত করে পরীক্ষায় লিখে দিয়ে আসে। কিন্তু কবিতাকে কেউ আত্বস্ত করে না, ধারণ করে না। নিজেকে কবিতার মাঝে দেখে না, খুঁজে পায় না। কবির স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন করে নিতে পারে না। এজন্য মানুষ হওয়ার যে পণ তা শুধু কবিতায় লিপিবদ্ধ থাকে। ছেলেদের পণ হয়ে ধরা দেয় না। তাই এতো মানুষের ভীড়ে আর মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের মতো মানুষ।
কথা কম বলা লোকের সংখ্যা সীমিত। বেশিরভাগ লোক কথা বেশি বলে। তারা যে আবার কাজ করে না তা নয়। কাজও করে আবার কথাও বেশি বলে এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কাজ করে কথা কম বলে এদের সংখ্যা সীমিত। আবার তেমন কাজ করে না কিন্তু কথা বেশি বলে এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এ যুগে কাজ না করে চলতে পারে না। কোন না কোন কাজ করতে হয়। কাজ না করলে আয় রোজগার থাকে না। আয় রোজগার ছাড়া কেউ চলতে পারে না। কিন্তু কথা বলা নিয়ে সমস্যা। কথা কম কাজ বেশি। এটা বেশির ভাগ মানুষ মানতে চায় না। অফিস আদালতে কর্মক্ষেত্রে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বলে। কথা বলার ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকের পরিমিতিবোধ নেই বললে চলে। রাস্তা ঘাটে মার্কেটে সর্বত্র মানুষ কথা বলে। এমনকি কলকারখানায় কাজের সময় কথা বলে। কাজ করতে করতেও কথা বলে। কথা না বলার সহজ কোন পদ্ধতি জানা নেই। কেউ কেউ বলে, কথা না বললে পেটের ভাত হজম হয় না। খাবার খেলে হজম হতে হয়। তা না হলে সমস্যা। এজন্য কাজ করে বা কথা বলে হজম করতে হয়।
কাজে কেউ কেউ অনেক দূর এগিয়ে যায়। এদেরকে সহজে পেছনে ফেলা যায় না। কাজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায়। এরা কাজকে প্রাধান্য দেয়। অন্য কিছুকে নয়। আবার কথায় যারা পটু তাদেরকেও সহজে কেউ হারাতে পারে না। কথার মারপ্যাঁচে এরা নিজেদের জায়গাটা ধরে রাখে। অনেকে বলে কথায় ছিড়ে ভিজবে না। কিন্তু এদের কথায় অনেকে গলে যায়। কথা দিয়ে এরা স্বার্থসিদ্ধি করে ফেলে। তারা এমন সব পন্থা অবলম্বন করে অন্যরা তাদের কথার ফাঁদে পড়ে যায়। একবার পড়লে আর সহজে ওঠা যায় না। যারা পড়ে যায় তারা ভাবতেও পারে না যে ফাঁদে পা দিয়েছে। উঠারও আর চেষ্টা করে না। কথার মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকে। মানুষ হবার যে চেষ্টা তা আর করতে পারে না। এজন্য গড়ে ওঠার জন্য ছেলেবেলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেবেলায় পারিবারিক শিক্ষা এবং স্কুলের শিক্ষা এর সাথে ওদপ্রোতোভাবে জড়িত। শুধু কবিতা পড়লে মানসিকতা তৈরি হয় না। এর জন্য পরিবেশ প্রয়োজন। মানুষ হবার পণ ছেলেবেলায় নিতে হয়। পরে আর তা হয় না। ছেলেবেলার উদ্যোম ও মনোবল পরে আর থাকে না। তাই মানুষ হবার চেষ্টা আগে থেকে করতে হবে। তারপর কাজে বড় হওয়া যাবে।
লেখক: কথাসহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী











