জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দামও রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। তার ফলে উৎপাদন, বিপণন থেকে শুরু করে জনজীবনের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে। আবাসিক, বাণিজ্যিক, কৃষি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্পসহ সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম গত বুধবার বাড়ানো হয়েছে। একদিকে তীব্র মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণে ইতোমধ্যেই সংকটে জর্জরিত শিল্প খাত। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনে বাড়তি চাপের বিপরীতে সরকারের অতিরিক্ত আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এতে বিদ্যুতের ৫৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি নেমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটিতে। ঘোষণা অনুসারে, দিনে শুধু প্রয়োজনীয় সময়ে একটি লাইট–ফ্যান ব্যবহারকারী গ্রাহককেও আগামী মাসে ৪০ টাকার মতো বেশি বিল দিতে হবে। বাসাবাড়ির অন্য গ্রাহকের খরচ ব্যবহার অনুযায়ী মাসে ৭০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকের খরচ আরও বেশি বাড়বে।
যদিও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু ইরান–যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সরকার ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির কয়েক দফা দাম বৃদ্ধি করা হয়। এপ্রিলে এলপিজি, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। এবার বিদ্যুতের দামও রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হলো।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামাল দিতে বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক চাপ।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম–দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেগুলো বন্ধের দাবি করা হলেও, এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো। এর প্রভাব সবখানেই পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রাস পাবে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাজেটের আগে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারী। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর দুটি উপায়। একটি হলো মূল্যবৃদ্ধি, অন্যটি ব্যয় কমানো। বিদ্যুৎ উৎপাদনে উচ্চ ব্যয়ের কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ। এটি কমাতে গেলে চুক্তিতে পরিবর্তন লাগবে। সেটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। তিনি বলেন, এখনো বিদ্যুতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। ভর্তুকি কমানোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি আসলে যথেষ্ট হবে না। ফলে খরচ কমানোর চেষ্টাগুলো চালিয়ে যেতে হবে। সমাধান হলো বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রেখে মুষুাস্ফীতিকে অন্যভাবে মোকাবিলা করা। বাজার ব্যবস্থাপনা, মুদ্রানীতি, বিনিময় হার, ব্যাংকিং খাতের দুর্দশা কাটানো–এই বড় বিষয়গুলো যদি ঠিক রাখা যায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা যায়। তখন মানুষকে বাজারে গিয়ে দেখতে হবে না যে ১০০ টাকার পণ্য রাতারাতি ১৫০ টাকা হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম–দুর্নীতি রোধ, অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানো, সিস্টেম লস দূর করা এবং গ্রাম ও শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈষম্য দূরীকরণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকার এসব উদ্যোগ না নিতে পারলে বিদ্যুৎ বিলের এই বাড়তি বোঝা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলবে।







