দেশের উন্নয়নে জরুরি ‘দেশপ্রেম ও সচেতনতা’

কুমুদিনী কলি | শনিবার , ৬ জুন, ২০২৬ at ১০:১০ পূর্বাহ্ণ

যে জাতি দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে, সে জাতি সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারে। তাকে দমিয়ে রাখার সাধ্য থাকে না। প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজ অবস্থান থেকে কতটুকু আবেগ, ভালোবাসা ধরে রাখে নিজ মাতৃভূমির জন্য, সেটা প্রকাশ পায় তার কাজের মধ্য দিয়ে। আর সেসব কাজের ফলাফল হলো একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন।

দেশপ্রেমের প্রকৃত নমুনা তাই দেখতে পাওয়া যায়, একটি দেশের সার্বিক উন্নতিতে। সার্বিক উন্নতি বলতে ধারাবাহিকভাবে শহরায়ণ বা নগরায়ণ বুঝালেও এই শহর বা গ্রাম অথবা শহরতলী প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের একটি প্রবহমানতা ধরে রাখার প্রচেষ্টাকেও বুঝায়। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় শহরায়ন বা নগরায়ণের ফলে বিশাল বিশাল আবাসিক এলাকা অথবা উঁচু তলার দালান গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত, যেগুলোর কোনোটারই হয়তো সুস্পষ্ট ডিজাইন নেই অথবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সঠিক পরিকল্পনা নেই।

এসব বিশাল বিশাল বিল্ডিংগুলোর সমস্ত বর্জ্য গিয়ে কোনো না কোনোভাবে খালে পতিত হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে খাল ভরাট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর যত্রতত্র ময়লা ফেলার হিড়িক তো আছেই। আমরা সাধারণ জনগণ এই কিছু বিষয়ে বেশ অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছি। নিজের বসতবাড়ি বা নিজের ফ্ল্যাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে ময়লা ফেলছি যেখানে সেখানে। এর ভয়াবহতা ঠিক কতটুকু তা বুঝতে পারা যায় বর্ষা মৌসুমে।

সামান্যতম বৃষ্টি হলেই নগরীর জলবদ্ধতা যেনো এক আতংকের নাম। সামপ্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো এই জলাবদ্ধতা। এর দায়ভার যতটা প্রশাসনের তার চেয়ে বেশি সাধারণ জনগণের দৈনিক জীবনাচরণের।

প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার কোনো তৎপরতা সহজে চোখে পড়ে না। পাড়ার গলির মুখে অথবা বিল্ডিংয়ের সামনে তৈরী হয় অঘোষিত ডাস্টবিন। একটি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে আমাদের বড্ড বেশি অলসতা। বড় বড় আবাসিকের ফ্ল্যাট থেকেও জানালা দিয়ে অথবা এদিক সেদিক দিয়ে টুকটাক ময়লা ঘরের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে দেখা যায় হরহামেশাই।

নিজেদের জীবনাচরণ যদি সুশৃঙ্খল হয়, তবে তার প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ঘরের বাইরে হরহামেশাই ময়লা ছুঁড়ে ফেলার বদভ্যাস, ডাস্টবিন ব্যবহার না করার বদভ্যাস অথবা যথাস্থানে ময়লা না ফেলার বদভ্যাস সবটুকুর মিলিত অভ্যেস তৈরী হয় পরিবার থেকেই। পরিবার থেকে যেসব বদভ্যাস তৈরী হয় তার সবটা মিলেই তৈরী হয় জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা।

এবার প্রশাসনের দিকে নজর দেয়া যাক। নির্দিষ্ট সময়ের ময়লা নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ময়লা সংগ্রহ করতে আসায় তাদের বড় আলসেমি। ডাস্টবিনের ময়লা ডাস্টবিনের এলাকা ছাড়িয়ে রাস্তায় পর্যন্ত গড়াগড়ি খায়।

দুর্গন্ধ থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। পুরো এলাকা জুড়ে ময়লার ছড়াছড়ি। এই হলো শহরের বেশিরভাগ এলাকার বাস্তব চিত্র। ডাস্টবিনের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে একদল আবার ময়লা ফেলার জন্য বেছে নিচ্ছে বাসা সংলগ্ন খাল বা নর্দমা। যার ফলাফলও সেই জলাবদ্ধতা।

বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও যদি শুধুমাত্র এই দুই শ্রেণির দায়িত্বশীলতা আর সচেতনতা থাকতো তাহলে জলাবদ্ধতার অর্ধেক সমস্যা মিটে যেতো। খাল খনন বা খাল সংলগ্ন এলাকার নানাবিধ সমস্যার জন্য প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত যে সব ব্যবস্থা বর্তমানে নেয়া হয়েছে, তাতে জনগণের ভূমিকা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি।

সামপ্রতিক সময়ে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পরবর্তী সময়ে সরকার অধিভুক্ত সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ কর্তৃক গৃহীত যে সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার ফলশ্রুতিতে নগরীর বেশিরভাগ খালের খনন কাজ ও ময়লা আবর্জনার স্তূপ পরিষ্কার করার কাজ বেশিরভাগ সম্পন্ন হয়েছে। কোরবানির ঈদ ও আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এসব ব্যবস্থা কার্যকরী করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সর্বসাধারণের চেষ্টা করা উচিত, সরকারের এই গঠনমূলক সিদ্ধান্তের সাথে সহমত পোষণ করে তাদের কাজের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা। প্রতিটি ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করলে এসব সমস্যার সমাধান করা কোনো দুরূহ কাজ হতে পারে না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার অভ্যেস তৈরী করা এর প্রথম ধাপ। খালে ময়লা ফেলা বা যত্রতত্র ময়লা ফেলা নিয়ে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং উল্লেখ্য যে এসব ব্যবস্থা কার্যকর না করলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রতিবারের মতো হাস্যকর একটি নিয়ম হয়েই রয়ে যাবে।

কাজের কাজ কিছুই হবে না। কোরবানের ঈদ পরবর্তী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক পরিচালনায় সিটি কর্পোরেশনের সাথে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন নগরী আশা করা যায়। কিন্তু ঈদ পরবর্তী আনন্দ উদযাপন আমাদের এতটাই অলস করে রাখে, আমরা ভুলে যাই আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য।

নিজ নগরীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজ সচতনতা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কাজের প্রতি উদাসীনতা পরিহার করতে হবে আর সর্বসাধারণকে হতে হবে সচেতন।

কলকারখানাগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও এখানে উল্লেখযোগ্য। কারণ নগরীর বাইরে বেশিরভাগ কারখানা তৈরী করা হলেও নগরীর ভেতরেও কিছু কিছু কারখানা অবস্থিত। এসব কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, ময়লাআবর্জনা প্রভৃতি সুষ্ঠু ভাবে নিষ্কাশনের বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জলাবদ্ধতা নিরসনের সাথে অনেকগুলো বিষয় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলোর কোনোটিকে বাদ দিয়ে জলাবদ্ধতার মতো বড় একটি সমস্যাকে একেবারে নিরসন করা পুরোপুরি অসম্ভব। সর্বসাধারণের সচেতনতা ও আন্তরিক দেশপ্রেম এক্ষেত্রে বিশাল একটি হাতিয়ার। প্রত্যেকে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ শহরের জন্য, নিজ দেশের জন্য সচেতন হয়ে নিজ আবাসভূমি পরিষ্কারের মতো নিজে উদ্যোগী হলে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ কাজে লাগবে। শহর তথা দেশও পরিচ্ছন্ন থাকবে। শহরের, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হবে না।

নিজ মাতৃভূমিকে মায়ের মতো ভালোবেসে একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না, মাকে যেমন আমরা ভালোবাসি, তেমনি দেশটাকেও ভালোবাসলাম। দেশের গায়ে কোনো আঁচ লাগতে দিলাম না। তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে আগলে রাখলাম। নিজের আবাসভূমির জন্য সঞ্চিত ভালোবাসাটুকু ছড়িয়ে দিই সারাদেশের জন্য। দিনশেষে দেশটাতো আমাদেরই। এই দেশ আমাদের পরম সম্পদ, তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদেরই দায়িত্ব। একটু ভালোবাসা, যত্ন, সচেতনতা, এগিয়ে চলার নব উদ্যোমে হয়তো আমাদের দেশটাও পাল্টে যেতে পারে। এত সুন্দর দেশ আমাদের, একটু যত্নে নিজের প্রিয় মাতৃভূমিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে উপহার দেয়ার প্রচেষ্টাটুকু অন্তত থাকুক।

পরবর্তী প্রজন্ম বহির্বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে যেনো আমার প্রিয় মায়ের মতো মাতৃভূমিকে এগিয়ে রাখতে পারি। এত নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ আমাদের দেশ, সেই সুন্দরের সৌন্দর্য অটুট রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানুষ হওয়া শুধু উচ্চতর ডিগ্রি বা শিক্ষার ওপর নির্ভর করে না
পরবর্তী নিবন্ধসাধক কবি রকীব শাহের মরমী জগত