আমরা স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫ বছর পাড়ি দিয়েছি, কিন্তু জনকল্যাণ বা সেবার মান যতটুকু হওয়ার কথা–ততটুকু কি অর্জন করতে পেরেছি? নাকি জনগণের জনদুর্ভোগ তৈরী করছি। সূক্ষ্মভাবে তাকালে সকল সেক্টরে একই অবস্থা। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সেবার মান এবং জনগণের আস্থা–সবকিছুই আস্থাহীনতার সংস্কৃতি গ্রাস করেছে। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পূর্বের স্বীয়মর্যাদা বজায় রাখতে পারছে না। অথচ স্বনামধণ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জনকল্যাণ বা সেবার মান আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আরো উন্নত হওয়ায় কথা থাকলেও বাস্তবে উল্টো। প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন সেবা, কার্যক্রম, আধুনিক প্রকল্প–কাজের মাধ্যমে অনন্য উচ্চতায় যাওয়ার কথা ছিল এবং যাওয়া অসম্ভবও না। কারণ আমাদের দক্ষ জনশক্তি আছে। সবাই পরিশ্রম করতে অভ্যস্থ কিন্তু আমরা পারছি না আমাদের প্রচলিত সিস্টেমের কারণে। আমরা সকলে কাজ বা বড় কোনো সমস্যা আসলে তখন তা সমাধান করি নিজস্ব উপায়ে। অথচ উক্ত সমস্যাগুলো সামনে আসলে তা সমাধানের পথ যেনো সিস্টেমে থাকে তার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা বা পথ তৈরি করি না। আমাদের সংস্থাগুলোর অনেক নিয়ম মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে আছে যা সময়ের সাথে প্রযোজ্য নয় বা যায় না। কিন্তু প্রতিবারই আমরা অনেক সময় ব্যয় করে শুধু ঐ সমস্যাগুলো সমাধান করি অথবা কারো রেফারেন্স থাকলে তা দ্রুত সম্পন্ন করি। অথচ কেউ নিজের জায়গা থেকে যে কোন কাজের পদ্ধতি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী যুক্তিভিত্তিক টেকসই সমাধান এর জন্য খুব কম সময় ব্যয় করি। উন্নত বিশ্বে যে কোন পলিসি অথবা কাজ সম্পাদনের ধরন একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর আপডেট হয়। পলিসি যখন তৈরী হয় তখনই ঐ পলিসি কত সময় পর আবার রিভ্িউ হবে তা উল্লেখ থাকে কিন্তু আমাদের পলিসিগুলো যুগ যুগ ধরে চলে। কোন একটা বড় ঘটনা বা ব্যত্যয় না ঘটা পর্যন্ত আমরা সিস্টেম নিয়ে মাথা ঘামায় না। বর্তমান আধুনিক বিশ্ব গতিশীলতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের যুগ। আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা অত্যান্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। তাই আমাদের প্রত্যাশা আমাদের দাপ্তরিক প্রধানরা মেধা ও পরিশ্রম কাজে লাগিয়ে মানুয়ের কষ্ট, ভোগান্তি কমিয়ে সেবার মান কীভাবে বাড়ানো যায় তার পথ সুগম করবে। আমি অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে যে সেবার মান প্রত্যাশা করি তা যদি নিজের প্রতিষ্ঠানেও নিশ্চিত করতে পারি তাহলে সকলেই এগিয়ে যাব। কোন একটা সেক্টরকে অবহেলায় বা পেছনে রেখে ভালো সেবা পাবো এটা আশা করা যায় না। বর্তমানে আমাদের সমাজে কেউ যখন কোন একটা দাপ্তরিক বা প্রশাসনিক কাজে সহযোগিতা করে তাকে ভালো মানুষ মনে করি। কিন্তু অনেক সময় ভালো মানুষ যাকে বলছি, সে হয়তো কোন সিস্টেম ভেঙে কাজ করে দিচ্ছে কারণ প্রচলিত সিস্টেম সময়ের সাথে যাচ্ছে না অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ। উন্নত দেশে কাজ করে দেওয়ার ফলে বা কোন কাজে সাহায্য করলে ভালো মানুষ বলা হয় না। কাজ করে দেওয়া চাকরির অংশ, এটা হয় দায়িত্বশীলতা। আমাদের দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে যে নতুন সমস্যা বা নতুন ধরনের কাজ আসে তা নোট করে রাখলে বছর শেষে নির্দিষ্ট সভায় এ সকল ব্যাতিক্রম কাজগুলো উপস্থাপন এবং সমাধান বের করতে পারলে সিস্টেম অনেকাংশে উন্নত করা যায়। দুইটা ছোট উদাহরণ দিই:
১. আমরা যে কাগজ সত্যায়ন করি সেটা বর্তমান সময়ে কতটুকু দরকার বা দরকার থাকলেও ঢালাও ভাবে দরকারে আছে কিনা? অনেক সময় আমরা দেখি কোন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন লোক নিয়োগের জন্য আবদেন পড়ে কয়েক হাজার। চাকরির শর্তাবলী অনুযায়ী কাগজপত্র সত্যায়ন করার বাধ্যবাধকতা থাকে। সত্যায়ন করতে গেলে প্রার্থীদের অনেক সময় নষ্ট হয় এবং অনেক মেধাবী প্রার্থী সত্যায়নকে ঝামেলা মনে করে শেষ পর্যন্ত আবেদন করতে পারে না অথবা নিজেই সীল বানিয়ে সত্যায়ন করে দেয়। সেহেতু যে সব ক্ষেত্রে সত্যায়ন না চাইলেও হয় বা যাকে চূড়ান্ত নির্বাচিত করা হবে, পরবর্তীতে তার মূল সনদ দেখলে হয়। এতে প্রার্থীদের হয়রানি অনেকাংশে লাঘব হবে।
২. বৈশ্বিক অগ্রগতির সাথে সাথে বর্তমানে দেশেও স্বামী/স্ত্রী দুজনই কর্মক্ষেত্রে কাজের সাথে সম্পৃক্ত। আমাদের স্কুল/কলেজ গুলোতে ছাত্র/ছাত্রীদের ক্লাস ভেদে ছুটির সময় এক এক রকম হয়। তাছাড়া সরকারি ছুটির ক্ষেত্রেও স্কুল এবং কলেজে ভেদে ভিন্ন রকম এতে বাচ্চাদের ম্যানেজ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে এবং এর প্রভাব বাচ্চাদের মন মানসিকতা ও মা–বাবার কর্মক্ষেত্রের সবদিকে প্রভাব ফেলছে। উন্নত দেশে ফ্লেক্সিবল ওয়াকিং আওয়ার (প্রয়োজন অনুসারে ১/২ ঘণ্টা আগে পড়ে নিয়ে যাওয়া) ছুটির সময় সবার একই সময়ে হয় ফলশ্রুতিতে বাচ্চাদের আনা নেওয়া অসুবিধা হয় না।
এরকম আরোও হাজারো ক্ষেত্র আছে যে যেখানে আমরা সিস্টেম উন্নত করতে পারি। সময়ের সাথে যুগোপযোগী সিস্টেমে মানুষ কে মানসম্মত সেবা দেয়, স্বস্তি দেয় এবং সর্বেপরি মযার্দাপূর্ণ জীবন দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা সিস্টেম উন্নত করার পর ও একটা প্রতিবন্ধকতা ইচ্ছা করে দিয়ে রাখি, যাতে উপরী আয় বন্ধ না হয়। আমাদের বেশির ভাগ অফিসে বকশীস কিংবা চা নাস্তা খাওয়ার পয়সা, যে নামেই বলুন না কেন, বকশিস দিলে চোখের পলকে কাজ আগাবে। অথবা উচ্চপদস্থ কারো রেফারেন্স থাকলে বা আত্মীয়/স্বজন হলে পয়সা ছাড়া ও কাজ করে দিবে। এতে আমরা নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছি না। কারণ কাজ তো থেমে নেই, সিস্টেম ভেঙে হচ্ছে। আসুন সকলে মিলে জনকল্যাণমূলক ভালো সিষ্টেম তৈরী করি। সিস্টেম ভেঙে কোন কাজ করে নিজেকে ভালো মানুষ মনে না করি। সাথে সকল প্রতিষ্ঠানসমূহ যেন জন মানুষের প্রতিষ্ঠান হয়। নাগরিক সেবা যেন সবাই পায় সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করি। তাহলে আমাদের ক্ষণস্থায়ী জন্ম সার্থক হবে এবং দেশ সমৃদ্ধ হবে।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, পেট্রোলিয়াম এবং মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।












