সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সেই প্রথম থেকে প্রতিটি অভিভাবক খুব চিন্তিত থাকেন। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ কল্পনা করে তারা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। অনাগত সন্তানটি কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলবে সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনার কোন শেষ থাকে না। একটি সন্তান জন্ম হওয়ার আগে থেকেই সে অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্যস্ত সময় কাটান। প্রথমত একটি সুস্থ বাচ্চার জন্য প্রতিটি অভিভাবক মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে থাকেন। কারণ পরিবেশগত কারণে একটা সুস্থ বাচ্চা জন্মগ্রহণ করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য যে যার অবস্থান থেকে চেষ্টা চালিয়ে যায়। সন্তানটি যখন আস্তে আস্তে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় তখনই তার শুরু হয় মেধাবিকাশ। পারিবারিক ও পরিবেশগত প্রভাবে কার্যকরী শিক্ষাগত মেধা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একটি শিশু তার জীবনের শুরুতে পরিবেশগত অবস্থান থেকে অনেক কিছু শিখে থাকে। মা বাবা ভাই বোন আত্মীয়–স্বজন পাড়া–প্রতিবেশীর কাছ থেকে তার শিক্ষাগত জীবন শুরু হয়। মেধাবিকাশে একটি শিশুর পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। শিশুটি তার অবস্থান থেকেই সবকিছু বিচার করা শুরু করে। তাই পারিবারিক শিক্ষাটা প্রতিটি মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবারের প্রতিটি মানুষের চালচলন ও আচার ব্যবহারে সবকিছুই শিশুটির উপর প্রভাব বিস্তার করে।
জ্ঞান ও নৈতিকতা শিক্ষার দক্ষতা বৃদ্ধিতে পারিবারিক শিক্ষায় মুল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে তার নিজের আচার–আচরণ কথাবার্তায় অনেক বেশি সংযমী হতে হয়। পরিবারের সদস্য যত বেশি সহনশীল ও পরোপকারী মনভাব প্রকাশ করে সে পরিবারের সন্তান ততই সহনশীল হয়ে থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা পরিবার থেকেই শিখে থাকে। পারিবারিক নিয়ম শৃঙ্খলা শিশুকে ভবিষ্যৎ জীবনে নিয়ম শৃঙ্খলা শিখাতে সাহায্য করে। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে অনেক বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। ঘুম থেকে উঠে ঘুম যাওয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা বজায় রাখা দরকার। পরিবারে বড়দের দ্বারা প্রতিটি শিশুর আদব কায়দা নিয়ম–কানুন অনেক বেশি প্রভাবিত হয়।
সততা আন্তরিকতা পরিশ্রম হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক গুণাবলী। আর এই গুণাবলীগুলো একজন শিক্ষার্থী পরিবার থেকে অর্জন করে থাকে। একটি শিশুর শিক্ষা জীবন শুরু হয় সাধারণত আশেপাশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সকলের আচার–আচরণ ও ব্যবহারের উপরে একজন শিক্ষার্থীর আচার–আচরণ নির্ভর করে। একজন শিশু শিক্ষার্থীকে পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পাশাপাশি শারীরিক ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়। একজন শিশু শিক্ষার্থী শৈশবে সততা আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের বিষয়গুলো পারিবারিক পাশাপাশি শিক্ষায় প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষা শুরু করে। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে তখন থেকেই বুঝতে পারে পরিবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আরও একটি অন্য পরিবেশে এসেছে। প্রতিটি অভিভাবক তার অবস্থান থেকে শিশুটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে থাকে। আমাদের দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিশুদের ভর্তি করিয়ে থাকে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ জনপদে শিশু শিক্ষার্থীরা শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ পায় না। অভিভাবকের সামাজিক অর্থনৈতিক ও অবস্থান থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে থাকে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান । এভাবে প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। যে যার অবস্থান থেকে তাদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যান্য গুণাবলী গুলো চর্চা করতে থাকে। সব ধরনের চর্চা ও অর্জনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি সুন্দর জীবন অর্জন করা।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি সহ শিক্ষা কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। একজন শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সহ শিক্ষা কার্যক্রম আবশ্যক। প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝে কিছু কিছু প্রতিভা আছে যেগুলো অন্যের সাহায্য ছাড়া প্রকাশ করতে পারে না। তাই সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। একজন শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও। একজন শিশু শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্যের চেয়েও শিক্ষককের মতামতকে বেশি মূল্য দিয়ে থাকে। আত্মীয়তার সম্পর্কের বিষয়গুলো শিশু শিক্ষার্থীর মাঝে সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করে। ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশীলন শিক্ষার্থীদের নৈতিক গুণাবলী বিকশিত করে। একজন পরিপূর্ণ সফল ও আলোকিত মানুষ হওয়ার পিছনে সততা; আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নাই। রুটিন মাফিক জীবন যাত্রা শিক্ষার্থীকে পরিশ্রমী করে তোলে। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা এবং রাত্রে সঠিক সময় ঘুমাতে যাওয়া একজন শিক্ষার্থীর সফলতার চাবিকাঠি। শুধুমাত্র পুঁথিগত জ্ঞান অর্জন সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের উপরেই শিক্ষার্থীর জীবন নির্ভর করে না। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ভালো ভালো পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে একসময় জীবনের সফলতায় এগিয়ে যেতে পারে না। সত্যিকার অর্থে একজন সফল আলোকিত মানুষকে অবশ্যই জ্ঞানী হতে হবে। শিক্ষাগত অর্জনের পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাগুলো চর্চা করে যেতে হবে। শুধুমাত্র আমার আমিতে সীমাবদ্ধ না হয়ে আমাদের বিশাল জগতে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে। পরীক্ষার ভালো ফলাফল দিয়ে শুধুমাত্র ভালো জীবিকার নিশ্চিত করা যায় হয়তো কিন্তু ভালো মানুষ হতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আহবান রইল –মানবিক ও জ্ঞানী হও। আলোকিত মানুষের সাহচর্যে এসে আলোকিত মানুষ হও।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, কলেজ শিক্ষক











